‘স্বর্গের’ আশায় অনাহারে মৃত্যু ১৯০ শিশুর, কেনিয়ায় ধর্মীয় নেতার ভয়াবহ কাণ্ড

ধর্মীয় গোষ্ঠীর নেতা পল ম্যাকেঞ্জিকে ১৯ অক্টোবর দেশটির মোম্বাসা হাইকোর্টে রায় ঘোষণার শুনানিতে হাজির করা হয়— রয়টার্স
কেনিয়ার একটি আদালত সোমবার ধর্মীয় গোষ্ঠীর নেতা পল ম্যাকেঞ্জি ও তার প্রায় ৩০ সহযোগীকে হত্যার দায়ে দোষী সাব্যস্ত করেছেন। তাদের বিরুদ্ধে সাম্প্রতিক ইতিহাসে বিশ্বের অন্যতম ভয়াবহ ধর্মীয় গোষ্ঠী-সংশ্লিষ্ট বিপর্যয়ের ঘটনায় ১৯০ শিশু ও এক প্রাপ্তবয়স্কের মৃত্যুর অভিযোগ ছিল।
ম্যাকেঞ্জি ও তার সহযোগীদের আগামী ৬ নভেম্বর সাজা ঘোষণা করা হবে।
২০২৩ সালে পুলিশের কাছে গোপন তথ্য আসার পর তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। কয়েক সপ্তাহ পর কেনিয়ার দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের উপকূলের কাছে শাকাহোলা বনে অগভীর গণকবর থেকে মরদেহ উদ্ধার শুরু করেন তদন্তকারীরা।
প্রসিকিউটরদের অভিযোগ, ম্যাকেঞ্জি ও তার গুড নিউজ ইন্টারন্যাশনাল চার্চের মাধ্যমে একটি খ্রিষ্টান ধর্মীয় গোষ্ঠী পরিচালনা করতেন। পৃথিবী ধ্বংস হওয়ার আগে স্বর্গে যাওয়ার আশায় অনুসারীদের নিজেদের ও সন্তানদের অনাহারে মৃত্যুর নির্দেশ দিয়েছিলেন তিনি।
ম্যাকেঞ্জি হত্যার অভিযোগ অস্বীকার করে দাবি করেছিলেন, তিনি কাউকে অনাহারে থাকতে বাধ্য করেননি। তবে আদালত তার এ যুক্তি প্রত্যাখ্যান করেছেন।
শাকাহোলা বন থেকে এ পর্যন্ত মোট ৪০০টির বেশি মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। অনেক মরদেহ এতটাই পচে গিয়েছিল যে মাত্র ২৬টি শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে।
সোমবারের রায়ে ১৯১ জনের মৃত্যুর বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। অন্য মৃত্যুগুলোর তদন্ত এখনো চলছে।
রায় শুনতে আদালতে স্বজনেরা
আট ঘণ্টার বেশি সময় ধরে চলা শুনানিতে বিচারক ডায়ানা কাভেদজা মোচাচে বলেন, কিছু ক্ষেত্রে শিশুদের আলাদা করে রাখা হয়েছিল এবং তাদের মা-বাবার সামনেই খাবার দেওয়া বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল।
আদালতে ম্যাকেঞ্জি ডোরাকাটা পোলো শার্ট ও লাল ট্রাউজার পরে বসেছিলেন। তার পাশে ছিলেন স্ত্রী, যিনি এ মামলার অন্যতম আসামি। বিচারক তার নাম পড়ে শোনালে তিনি নীরবে দাঁড়িয়ে শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিলেন।
বনের ওই ঘটনায় নিহত ব্যক্তিদের কয়েকজনের স্বজন রায় শুনতে মোম্বাসা হাইকোর্টে জড়ো হন।
ধর্মীয় গোষ্ঠীটির কারণে পরিবারের আট সদস্যকে হারিয়েছেন ৬২ বছর বয়সী ফ্রান্সিস ওয়াঞ্জে। নিহতদের মধ্যে তার দুই নাতি-নাতনিও রয়েছে।
রায়ের আগে রয়টার্সকে তিনি বলেন, ‘পরিবার হিসেবে বিষয়টি আমাদের জন্য সত্যিই অত্যন্ত কষ্টের ছিল। মানসিকভাবে আমাদের অনেক দূর পর্যন্ত ভুগতে হয়েছে। আমি এই দিনটির জন্য অপেক্ষা করছিলাম।’
২০১৭ সাল থেকেই ম্যাকেঞ্জি কর্তৃপক্ষের নজরদারিতে ছিলেন। ওই বছর পুলিশ তার প্রতিষ্ঠানে তল্লাশি চালিয়েছিল। এরপরও কীভাবে তিনি কার্যক্রম চালিয়ে যেতে পেরেছিলেন, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, ২০১৯ সালে কর্তৃপক্ষ ম্যাকেঞ্জির গির্জা বন্ধ করে দেয়। এরপর তিনি শাকাহোলা বনে চলে যান।
এ ঘটনায় গির্জা ও অন্যান্য ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের ওপর কঠোর নজরদারির দাবিও উঠেছে। কেনিয়ায় জনজীবনে ধর্মীয় বিশ্বাসের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।
কেনিয়ার প্রেসিডেন্ট উইলিয়াম রুটো ২০২৩ সালে বলেছিলেন, সরকারি সংস্থাগুলোর এই মৃত্যুগুলো ঠেকাতে পারার কথা ছিল। প্রেসিডেন্ট হিসেবে তিনি এ ঘটনার দায়ও স্বীকার করেন।
প্রথমে শিশুদের অনাহারে রাখা হয়েছিল
ধর্মীয় গোষ্ঠীটির কার্যক্রম সম্পর্কে সরাসরি জানেন—এমন ব্যক্তিরা রয়টার্সকে বলেছেন, ম্যাকেঞ্জি তিন ধাপে ব্যাপক অনাহারের পরিকল্পনা করেছিলেন। প্রথমে শিশুদের, এরপর নারী ও তরুণদের এবং সবশেষে বাকি পুরুষদের অনাহারে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেওয়ার পরিকল্পনা ছিল তার।
সাবেক ট্যাক্সিচালক ম্যাকেঞ্জি অনুসারীদের সন্তানদের স্কুলে পাঠাতে এবং অসুস্থ হলে হাসপাতালে নিতে নিষেধ করেছিলেন। এসব প্রতিষ্ঠানকে তিনি শয়তানের প্রতিষ্ঠান বলে আখ্যা দিতেন বলে ২০২৩ সালে রয়টার্সকে জানিয়েছিলেন তার কয়েকজন অনুসারী।
গোষ্ঠীটির সদস্যরা পলিথিনের চাদর ও খড় দিয়ে তৈরি অস্থায়ী ঘরে বসবাস করতেন। ম্যাকেঞ্জি এলাকাগুলোকে বাইবেলে উল্লেখিত বিভিন্ন নাম দিয়েছিলেন, যেমন জেরুজালেম ও জুদিয়া।
২০২৩ সালের মার্চের মাঝামাঝি এ গোষ্ঠীর অনুসারীদের দুর্দশার বিষয়টি সামনে আসে। স্থানীয় এক ব্যক্তি পুলিশকে জানান, ম্যাকেঞ্জির নির্দেশে তার ভাই ও ভাইয়ের স্ত্রী বনে নিজেদের সন্তানদের অনাহারে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিয়েছেন।
ম্যাকেঞ্জিকে গ্রেপ্তার করা হলেও পরে জামিনে মুক্তি দেওয়া হয়। এরপর স্বজনদের দাবি, অনুসারীদের কাছে পৃথিবী ধ্বংসের যে তারিখ তিনি জানিয়েছিলেন, তা এগিয়ে আনেন তিনি।
২০২৩ সালের এপ্রিলে পুলিশ তাকে আবার গ্রেপ্তার করে। এরপর বনে আরও পরিকল্পিতভাবে তল্লাশি শুরু হয় এবং গণকবর খুঁড়ে মরদেহ উদ্ধার করা হতে থাকে।
বনে মৃত্যুর ঘটনায় ম্যাকেঞ্জির বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবাদ-সংশ্লিষ্ট অভিযোগসহ আরও কয়েকটি মামলা রয়েছে। এসব অভিযোগও তিনি অস্বীকার করেছেন।
প্রসিকিউটরদের অভিযোগ, আটক থাকা অবস্থায়ও তিনি শাকাহোলা থেকে প্রায় ৩০ কিলোমিটার দূরের কোয়া বিনজারো গ্রামে ৫২ জনের মৃত্যুর নির্দেশ দিয়েছিলেন। ওই মামলায় ম্যাকেঞ্জি নিজেকে নির্দোষ দাবি করেছেন।





