ইথিওপিয়ার
জলাতঙ্ক আতঙ্কে বাসিন্দাদের পোষা কুকুর হত্যার নির্দেশ

কুকুর হত্যা না করলে গ্রেপ্তারের পাশাপাশি ৫০ হাজার বির জরিমানা করারও হুমকি- রয়টার্স
ইথিওপিয়ার একটি শহরে জলাতঙ্কে তিন শিশুর মৃত্যুর পর শত শত মানুষকে নিজেদের পোষা কুকুর হত্যা করতে বাধ্য করা হয়েছে। এক প্রতিবেদনে এমনটাই জানিয়েছে বিবিসি।
বিবিসিকে স্থানীয় বাসিন্দারা জানিয়েছেন, মধ্যাঞ্চলের হোসানা শহরের প্রভাবশালী কমিউনিটি গ্রুপগুলো বাসিন্দাদের নির্দেশ দেয়, কুকুর হত্যা না করলে তাদের জরিমানা করা হবে এবং গ্রেপ্তারও করা হতে পারে। এমনকি জলাতঙ্কের টিকা দেওয়া কুকুরগুলোকেও হত্যা করতে বলা হয়।
স্থানীয় মেয়র স্যামুয়েল শিগুটে বলেছেন, কুকুরের কামড়ে তিন শিশুর মৃত্যু এবং আরও ৮০ জন হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পর কমিউনিটি গ্রুপগুলো এই নির্দেশ জারি করে।
প্রত্যক্ষদর্শীরা বিবিসিকে জানিয়েছেন, নির্দেশ জারির পর অনিচ্ছা সত্ত্বেও কেউ কেউ নিজেদের কুকুরকে গাছে ঝুলিয়ে বা পিটিয়ে হত্যা করেন। আবার কেউ কুকুরগুলো অন্যদের হাতে তুলে দেন, যাতে তারা সেগুলো হত্যা করে।
বিবিসি এমন কিছু ছবি দেখেছে, যা প্রকাশের জন্য অত্যন্ত মর্মান্তিক। ছবিগুলোতে গাছে ঝুলন্ত কুকুরের মৃতদেহ দেখা গেছে। আরেকটি ছবিতে একটি মাঠে গলায় দড়ি বাঁধা অবস্থায় কয়েকটি মৃত কুকুর পড়ে থাকতে দেখা যায়।
এই নির্দেশ দেওয়া কমিউনিটি সংগঠনগুলো স্থানীয় সরকারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট হলেও মেয়র স্যামুয়েল কুকুর হত্যা ঘটনাকে ‘অবৈধ’ বলে উল্লেখ করেছেন। তিনি বিবিসিকে বললেন, তার প্রশাসন এ ধরনের কোনো নির্দেশ দেয়নি।
নিরাপত্তার কারণে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক বাসিন্দা জানান, তাকে নিজের কুকুর হত্যা করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু তিনি তা করতে পারেননি।
তিনি বললেন, ‘আমি নিজে তাকে হত্যা না করে ওদের হাতে তুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিই, যাতে আমাকে সেটা দেখতে না হয়। বসতি থেকে কিছুটা দূরে নিয়ে গিয়ে ওরা তাকে হত্যা করে।’
তিনি আরও বললেন, ‘পাঁচ বছর ধরে আমার সঙ্গে থাকা এবং আমাদের পরিবারের গর্ব ছিল যে কুকুরটি, তাকে হারিয়ে আমি খুবই মর্মাহত।’ তিনি জানান, জলাতঙ্কের টিকাও দেওয়া হয়েছিল তার কুকুরটিকে।
মেয়র স্যামুয়েল জানান, হোসানার প্রায় ১০ হাজার কুকুরের মধ্যে প্রায় ৭০ শতাংশই পাহারার কাজে ব্যবহৃত হয় এবং সেগুলোকে দেওয়া হয়েছিল জলাতঙ্কের টিকা।
স্থানীয় পশুচিকিৎসক আলাাজার আয়েলে জানান, এই ঘটনাগুলো ‘গভীরভাবে ব্যথিত’ করেছে তাকে।
তিনি বললেন, ‘মাত্র কয়েক দিনের মধ্যে হত্যা করা হয়েছে আনুমানিক ৪০০ থেকে ৪৫০টি কুকুর।’
তিনি আরও বলছিলেন, ‘মানুষ কুকুরগুলোকে টেনে বের করে ভয়াবহ উপায়ে হত্যা করেছে। এটি নৈতিকতা, ধর্ম, সংস্কৃতি এবং আইনের দৃষ্টিতে গ্রহণযোগ্য নয়। ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে, কুকুর হত্যা করার সময় মালিকেরা কান্না করছেন।’
জলাতঙ্ক একটি মারাত্মক রোগ। সাধারণত আক্রান্ত প্রাণী, বিশেষ করে কুকুরের কামড় বা আঁচড়ের মাধ্যমে মানুষ এতে সংক্রমিত হয়।
মানুষের শরীরে উপসর্গ দেখা দেওয়ার পর এই রোগ প্রায় সব ক্ষেত্রেই প্রাণঘাতী। তবে উপসর্গ শুরুর আগেই চিকিৎসা নিলে রোগ প্রতিরোধ করা সম্ভব।
অন্যদিকে, জলাতঙ্কে আক্রান্ত টিকা না দেওয়া কুকুরের কোনো কার্যকর চিকিৎসা নেই। তাই বিশ্বের বিভিন্ন দেশে জলাতঙ্কে আক্রান্ত বলে নিশ্চিত হওয়া কুকুরকে সাধারণত মেরে ফেলা হয়।
মেয়র স্যামুয়েলের দাবি, স্থানীয় পুলিশ ও নিরাপত্তা বাহিনী এক দিনের মধ্যেই কুকুর হত্যার এই অভিযান বন্ধ করে দেয়।
তবে রাজধানী আদ্দিস আবাবাভিত্তিক একটি প্রাণী অধিকার সংগঠনের প্রধান ফেভেন মেলেসে জানান, গণহারে কুকুর হত্যা বন্ধ হলেও এখনো ব্যক্তিগতভাবে লোকজন বাড়ি বাড়ি গিয়ে টিকা না দেওয়া কুকুর সরিয়ে ফেলতে চাপ দিচ্ছে। পশুচিকিৎসক আলাজারও জানান, কুকুর হত্যা এখনো চলছে।
এক বাসিন্দা বিবিসিকে জানান, কুকুর হত্যা না করলে গ্রেপ্তারের পাশাপাশি ৫০ হাজার বির (প্রায় ৩০০ মার্কিন ডলার) জরিমানা করারও হুমকি দেওয়া হয়েছিল।
ইথিওপিয়ায় জনসমক্ষে প্রাণী হত্যা করা বা তাদের প্রতি নিষ্ঠুর ও অস্বাভাবিক আচরণ করা আইনত দণ্ডনীয়।
মেয়র স্যামুয়েল জানিয়েছেন, তিনি কুকুর হত্যার ঘটনাগুলোর তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন। অন্যদিকে ফেভেন মেলেসে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
তিনি বললেন, ‘স্থানীয় সরকারি সংস্থাগুলো বলছে, তারা এটি করেনি এবং এমন কোনো নির্দেশও দেয়নি। যদি সত্যিই তা-ই হয়, তাহলে দায়ীদের অবশ্যই আইনের আওতায় আনতে হবে।’






