বিশ্বের সর্বকনিষ্ঠ রাজা
উগান্ডার তুরো রাজ্যের রাজার আকস্মিক মৃত্যু
- তিন বছর বয়সে সিংহাসনে
- ৩৪-এই বিদায় বিশ্বের সর্বকনিষ্ঠ রাজা ওয়োর

বিশ্বের সর্বকনিষ্ঠ রাজা হিসেবে পরিচিত উগান্ডার তুরো রাজ্যের রাজা ওয়ো নিয়িম্বা কাবাম্বা ইগুরু রুকিদি
বয়স তখন মাত্র তিন। যে বয়সে অন্য শিশুরা খেলনা নিয়ে মেতে থাকে, সেই বয়সেই মাথায় উঠেছিল রাজমুকুট। তারপর প্রায় গোটা জীবনটাই কেটেছে সিংহাসনে। বিশ্বের সর্বকনিষ্ঠ রাজা হিসেবে পরিচিত উগান্ডার তুরো রাজ্যের রাজা ওয়ো নিয়িম্বা কাবাম্বা ইগুরু রুকিদি চতুর্থ মারা গেছেন। বয়স হয়েছিল ৩৪ বছর। বৃহস্পতিবার স্থানীয় সময় রাত প্রায় ১০টায় তার মৃত্যু হয়। শুক্রবার তার মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়তেই উগান্ডাজুড়ে নেমে এসেছে শোক।
তুরো রাজ্যের প্রধানমন্ত্রী ক্যালভিন আর্মস্ট্রং রওমিরে আকিকি বৃহস্পতিবার গভীর রাতে রাজার মৃত্যুর খবর আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করেন। তিনি একে রাজপরিবার, তুরোর জনগণ এবং গোটা উগান্ডার জন্য ‘অপরিমেয় ক্ষতি’ বলে বর্ণনা করেছেন। রাজ্যের মানুষকে শান্ত ও ঐক্যবদ্ধ থাকারও আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
রাজা ওয়োর মৃত্যুর সুনির্দিষ্ট কারণ এখনও প্রকাশ করেনি তুরো রাজপরিবার। তবে মৃত্যুর খবর ঘোষণার আগে উগান্ডা সরকারের এক মন্ত্রী জানিয়েছিলেন, রাজা গুরুতর অসুস্থ ছিলেন এবং যুক্তরাষ্ট্রে চিকিৎসা নিচ্ছিলেন। কয়েকটি স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে ক্যানসারের কথা বলা হলেও রাজপরিবার তা আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করেনি। ফলে তার মৃত্যুর কারণ এখনও অপ্রকাশিতই রয়েছে।
রাজা ওয়োর জন্ম ১৬ এপ্রিল ১৯৯২। বাবা রাজা প্যাট্রিক ডেভিড ম্যাথিউ কাবোয়ো অলিমি তৃতীয়ের মৃত্যুর পর মাত্র তিন বছর বয়সে, ১২ সেপ্টেম্বর ১৯৯৫, তুরোর সিংহাসনে বসেন তিনি। সেই সময় বিশ্বের সর্বকনিষ্ঠ ক্ষমতাসীন রাজা হিসেবে তাঁর নাম ওঠে গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসে।
এত ছোট একটি শিশুর পক্ষে রাজ্যের দায়িত্ব সামলানো সম্ভব ছিল না। তাই তার মা কুইন মাদার বেস্ট কেমিগিসা, রাজপরিবারের প্রবীণ সদস্য এবং অভিভাবক পরিষদ রাজ্যের কাজ পরিচালনায় সহায়তা করত। ১৮ বছর বয়সে পৌঁছানোর পর ২০১০ সালে পূর্ণ রাজকীয় দায়িত্ব গ্রহণ করেন ওয়ো। সে বছর প্রাপ্তবয়স্ক রাজা হিসেবে তার আনুষ্ঠানিক অভিষেকও হয়।
রাজা, কিন্তু রাজনৈতিক শাসক নন
‘রাজা’ শব্দটি শুনে উগান্ডার রাষ্ট্রক্ষমতা তার হাতে ছিল বলে মনে হতে পারে। বাস্তবতা অবশ্য ভিন্ন। উগান্ডা একটি প্রজাতন্ত্র এবং দেশটির রাষ্ট্র পরিচালিত হয় নির্বাচিত সরকারের মাধ্যমে। তবে দেশটিতে তুরোসহ কয়েকটি ঐতিহ্যবাহী রাজ্য এখনও রয়েছে। তাদের সরাসরি রাজনৈতিক ক্ষমতা নেই, কিন্তু নিজ নিজ জনগোষ্ঠীর সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও সামাজিক জীবনে তাদের প্রভাব যথেষ্ট।
পশ্চিম উগান্ডায় কঙ্গো গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্রের সীমান্তের কাছে অবস্থিত তুরো রাজ্য। ঊনবিংশ শতকের গোড়ায় প্রতিষ্ঠিত এই রাজ্যের ১৩তম রাজা ছিলেন ওয়ো। বিবিসি-র তথ্য অনুযায়ী, তাঁর রাজ্যের আওতায় ২০ লাখের বেশি মানুষ রয়েছেন।
শিশু রাজা হিসেবে আন্তর্জাতিক পরিচিতি পেলেও বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শিক্ষা, তরুণদের ক্ষমতায়ন, স্বাস্থ্য ও পরিবেশ রক্ষার মতো বিভিন্ন বিষয়ে সক্রিয় হন ওয়ো। এইচআইভি/এইডস সম্পর্কে সচেতনতা তৈরির পাশাপাশি তরুণদের শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও দক্ষতা অর্জনে উৎসাহ দেওয়ার জন্যও পরিচিত ছিলেন তিনি।
ব্রিটেনের সঙ্গেও তার ছিল বিশেষ সম্পর্ক। শৈশবের কিছু সময় লন্ডনে পড়াশোনা করার পর উগান্ডায় ফিরে যান। পরে আবার যুক্তরাজ্যে উচ্চশিক্ষার জন্য আসেন এবং ইউনিভার্সিটি অব উইনচেস্টার থেকে ব্যবসা ব্যবস্থাপনায় স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন।
বিয়ে করেননি, কিন্তু রেখে গেছেন উত্তরাধিকারী
রাজা ওয়োর ব্যক্তিগত জীবন বরাবরই ছিল অনেকটা আড়ালে। মৃত্যুর সময় পর্যন্ত তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে বিবাহিত ছিলেন না। দীর্ঘদিন ধরেই তাকে বিয়ে করার জন্য রাজপরিবার ও ধর্মীয় নেতাদের পক্ষ থেকে আহ্বান জানানো হয়েছিল।
কিন্তু তার মৃত্যুর ঘোষণায় সামনে এসেছে এতদিন অজানা একটি তথ্য। প্রধানমন্ত্রী রওমিরে জানিয়েছেন, রাজা একজন পুত্র উত্তরাধিকারী রেখে গেছেন। তবে সেই রাজপুত্রের পরিচয় এখনও প্রকাশ করা হয়নি। তুরোর রীতি ও প্রথা মেনে উপযুক্ত সময়ে তার পরিচয় আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হবে। প্রধানমন্ত্রী আশ্বস্ত করেছেন, রাজার মৃত্যু হলেও ‘রাজমুকুটের ধারাবাহিকতা নিশ্চিত’।
রাজার আকস্মিক মৃত্যুতে শোক ছড়িয়ে পড়েছে উগান্ডায়। দেশটির জনপ্রিয় সংগীতশিল্পী থেকে বিরোধী রাজনীতিক হয়ে ওঠা ববি ওয়াইনও গভীর শোক জানিয়েছেন। উগান্ডার বৃহত্তম ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠান বুগান্ডা রাজ্যও তুরোর মানুষের প্রতি সমবেদনা জানিয়েছে এবং ওয়োকে দেশের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব হিসেবে স্মরণ করেছে।
তিন বছর বয়সে রাজা, ১৮-তে নিজের হাতে রাজ্যের দায়িত্ব, আর ৩৪ বছরেই জীবনের ইতি। প্রায় ৩১ বছরের রাজত্বে ওয়োর বয়সের চেয়ে সিংহাসনের বাইরের জীবন ছিল মাত্র তিন বছরের। বিশ্বের ‘শিশু রাজা’ হিসেবে শুরু হওয়া সেই ব্যতিক্রমী অধ্যায় এবার থামল অকালে।







