‘হরমুজ-পরবর্তী’ বিশ্বে নতুন সুযোগ আফ্রিকার সামনে

নাইজেরিয়ার লাগোসের লাগোস লেগুনে নোঙর করা একটি তেলবাহী ট্যাংকার জাহাজ। ফাইল ছবি/ রয়টার্স
বিশ্ব জ্বালানি বাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়ার প্রভাব পড়েছে আফ্রিকার অর্থনীতিতেও। অথচ এই মহাদেশের হাতে রয়েছে বিপুল জ্বালানি ও গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক সম্পদের বিশাল ভান্ডার। চার বছর আগে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের সময়ও একই ধরনের সংকটের মুখে পড়েছিল আফ্রিকার দেশগুলো।
ইরান যুদ্ধের কারণে এখন বিশ্ব ঢুকছে একটি নতুন সময়ে। একে বলা যেতে পারে ‘হরমুজ-পরবর্তী যুগ’। এটি এমন এক সময়, যখন বিশ্বব্যবস্থা আর একটি মাত্র গুরুত্বপূর্ণ প্রণালির ওপর নির্ভরশীল থাকবে না।
এই পরিবর্তন আফ্রিকার জন্য বড় সুযোগ তৈরি করতে পারে। এত দিন মহাদেশটি মূলত বিশ্বের কাছে কাঁচামাল সরবরাহ করেছে। বড় কৌশলগত সিদ্ধান্তগুলো নেওয়া হয়েছে অন্য কোথাও। এবার আফ্রিকা চাইলে নিজের ভূরাজনৈতিক অবস্থান নিজেই তৈরি করতে পারে।
সমুদ্রকে ভয় পাওয়ার মানসিকতা বদলাতে হবে
আফ্রিকার সামনে প্রথম বড় চ্যালেঞ্জ মানসিকতার পরিবর্তন। দীর্ঘদিন ধরে আফ্রিকার দেশগুলো সমুদ্রকে মূলত নিজেদের সীমান্ত হিসেবে দেখেছে। অর্থনীতি, রাজনীতি ও সামরিক শক্তি বাড়ানোর ক্ষেত্র হিসেবে সমুদ্রকে গুরুত্ব দেওয়া হয়নি।
আফ্রিকার নিরাপত্তা ভাবনায় স্থলভাগই ছিল প্রধান। স্বাধীনতার লড়াই, গৃহযুদ্ধ, বিদ্রোহ, অভ্যুত্থান ও সীমান্ত বিরোধ—এসব নিয়েই বেশি মনোযোগ ছিল তাদের।
ফলে সমুদ্র, নৌ শক্তি, সমুদ্রভিত্তিক অর্থনীতি ও গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ নিয়ে আফ্রিকায় পরিকল্পনা তুলনামূলকভাবে কম হয়েছে।
এই মানসিকতাকে বলা হয়, ‘থ্যালাসোফোবিয়া’ বা সমুদ্রভীতি। আফ্রিকাকে এই মানসিকতা থেকে বের হতে হবে।
তবে শুধু মানসিকতার পরিবর্তনই যথেষ্ট নয়। একসঙ্গে কাজ করার ক্ষেত্রেও আফ্রিকার বড় সমস্যা রয়েছে।
প্রথম সমস্যা হলো সার্বভৌমত্ব। ঔপনিবেশিক আমলে তৈরি সীমান্তগুলো স্বাধীনতার পর আফ্রিকার রাষ্ট্রগুলোর কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। ফলে একটি যৌথ সামুদ্রিক কৌশল নিতে গেলে দেশগুলোকে নিজেদের কিছু ক্ষমতা ভাগ করে নিতে হবে।
এর মধ্যে রয়েছে সমুদ্রসীমা নিয়ন্ত্রণ, সামরিক অভিযান পরিচালনা, যৌথ কমান্ড এবং গুরুত্বপূর্ণ গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়।
দ্বিতীয় সমস্যা হলো দেশগুলোর স্বার্থ এক নয়।
পশ্চিম আফ্রিকার গিনি উপসাগরে জলদস্যুতা ও তেল চুরি বড় সমস্যা। পশ্চিম ভারত মহাসাগরে অবৈধ মাছ ধরা ও পাচার বড় উদ্বেগ। ভূমধ্যসাগরে আবার অভিবাসন বড় বিষয়।
তাই পুরো আফ্রিকার জন্য একটি অভিন্ন সামুদ্রিক নীতি তৈরি করা সহজ নয়।
তৃতীয় সমস্যা অর্থ ও সক্ষমতার। নৌবাহিনী, উপকূলরক্ষী বা কোস্টগার্ড, নজরদারি ব্যবস্থা, গোয়েন্দা সক্ষমতা ও সরবরাহব্যবস্থা তৈরি করতে বিপুল অর্থ লাগে। অনেক আফ্রিকান দেশের একার পক্ষে এই খরচ বহন করা কঠিন।
ফলে সবাই অপেক্ষা করে অন্য কেউ আগে এগিয়ে আসবে।
আরেকটি বড় সমস্যা হলো বিদেশি শক্তির ওপর নির্ভরতা। আফ্রিকার জলসীমায় দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন দেশের নৌবাহিনী মোতায়েন রয়েছে। সামরিক ঘাঁটি ও আন্তর্জাতিক মিশনের মাধ্যমেও নিরাপত্তা দেওয়া হচ্ছে।
এতে আফ্রিকার নিজেদের সামুদ্রিক সক্ষমতা তৈরির প্রয়োজনীয়তা কমে গেছে।
এ ছাড়া অনেক আফ্রিকান রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক গোষ্ঠী আঞ্চলিক সহযোগিতার চেয়ে বাইরের শক্তির সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক থেকে বেশি সুবিধা পায়। ফলে নিজেদের মধ্যে সমন্বয়ের বদলে বাইরের শক্তির ওপর নির্ভরতা বাড়ে।
এর সঙ্গে যোগ হয়েছে অভ্যন্তরীণ বিদ্রোহ, সীমান্ত বিরোধ ও নিরাপত্তা সংকট। এসব কারণে সমুদ্র সবসময়ই অগ্রাধিকারের তালিকায় পিছিয়ে থাকে।
কেন আফ্রিকার ভূরাজনৈতিক সচেতনতা দরকার
আফ্রিকায় সমুদ্রের গুরুত্ব বোঝা যায় মূলত তখনই, যখন কোনো আন্তর্জাতিক সংকট তৈরি হয়।
হরমুজে সংকট দেখা দিলে আফ্রিকার দেশগুলো বুঝতে পারে, বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ নৌপথের ওপর তাদের কতটা নির্ভরতা রয়েছে।
অথচ আফ্রিকার হাতে রয়েছে তেল, প্রাকৃতিক গ্যাস ও জ্বালানি পরিবর্তনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ নানা খনিজ। আটলান্টিক মহাসাগর, ভারত মহাসাগর ও ভূমধ্যসাগরের মাঝামাঝি অবস্থানও মহাদেশটির বড় শক্তি।
কিন্তু এসব সম্পদ এখনো আফ্রিকাকে যথেষ্ট ভূরাজনৈতিক ক্ষমতা এনে দিতে পারেনি।
এ অবস্থা বদলাতে হলে আফ্রিকাকে নিজেদের অগ্রাধিকার ঠিক করতে হবে। সামুদ্রিক নিরাপত্তা, বন্দর ও নৌপথ, জ্বালানি, শিল্প, বাণিজ্য, পররাষ্ট্রনীতি এবং কৌশলগত স্বাধীনতা—সবকিছুকে একই পরিকল্পনার মধ্যে আনতে হবে।
এখানেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে ‘হরমুজ-পরবর্তী যুগ’ ধারণাটি।
এর অর্থ হলো, ভবিষ্যতের বিশ্ব অর্থনীতি শুধু হরমুজ প্রণালির ওপর নির্ভর করবে না। হরমুজের পাশাপাশি বাব আল-মান্দেব, লোহিত সাগর, সুয়েজ খাল, মোজাম্বিক চ্যানেল, কেপ অব গুড হোপ ও পশ্চিম ভারত মহাসাগরের মতো নৌপথও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। ভবিষ্যতে আর্কটিক অঞ্চলও এই নেটওয়ার্কের অংশ হতে পারে।
এই নৌপথগুলোর অনেকগুলোই আফ্রিকার আশপাশে।
অর্থাৎ আফ্রিকা শুধু বিশ্বের বাণিজ্যপথের ওপর দিয়ে যাওয়া একটি মহাদেশ নয়। ভবিষ্যতে বিশ্ব অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ নৌপথগুলোর একটি কেন্দ্রও হতে পারে আফ্রিকা।
পরিকল্পনা আছে, বাস্তবায়ন নেই
আফ্রিকার এই বিষয়ে কোনো পরিকল্পনা নেই— ঠিক তা নয়।
আফ্রিকান ইউনিয়ন ২০১৪ সালে ২০৫০ আফ্রিকার সমন্বিত সামুদ্রিক কৌশল গ্রহণ করেছে। ২০১৬ সালে গ্রহণ করা হয়েছে আফ্রিকান সনদ অন মেরিটাইম সিকিউরিটি অ্যান্ড সেফটি।
কিন্তু সমস্যা হলো, কাগজে থাকা পরিকল্পনার বড় অংশ এখনো বাস্তবায়িত হয়নি।
সনদটিও কার্যকর হওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যক দেশের অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে।
অর্থাৎ আফ্রিকার সমস্যা পরিকল্পনার অভাব নয়। সমস্যা হলো পরিকল্পনাকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাব।
এই জায়গাটিই আফ্রিকার ‘সমুদ্রভীতি’র সবচেয়ে বড় প্রমাণ।
এখন কী করতে পারে আফ্রিকা
প্রথম কাজ হলো রাজনৈতিক নেতৃত্বের সমুদ্র নিয়ে চিন্তার ধরন বদলানো।
সমুদ্রকে শুধু সীমান্ত বা পণ্য রপ্তানির পথ হিসেবে দেখলে হবে না। এটিকে অর্থনীতি, নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক শক্তির অন্যতম ক্ষেত্র হিসেবে দেখতে হবে।
এর জন্য বাজেট, প্রতিষ্ঠান ও সামরিক কাঠামোতেও পরিবর্তন আনতে হবে।
এ ক্ষেত্রে পুরো আফ্রিকান ইউনিয়নের ওপর একা নির্ভর করা বাস্তবসম্মত নাও হতে পারে। বরং দক্ষিণ আফ্রিকা, নাইজেরিয়া, মিসর, মরক্কো, কেনিয়া, অ্যাঙ্গোলা ও সেনেগালের মতো সামুদ্রিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ দেশগুলোকে সামনে আসতে হবে।
তারা আঞ্চলিক জোট ও বিভিন্ন বিশেষ ব্যবস্থার মাধ্যমে অন্য দেশগুলোকে সঙ্গে নিতে পারে।
এর একটি উদাহরণ আফ্রিকাতেই রয়েছে। গিনি উপসাগরের দেশগুলো ইয়াউন্দে আর্কিটেকচার তৈরি করেছিল। এর মাধ্যমে তথ্য বিনিময় ও সমন্বয় বাড়ানো হয়। ফলে ওই অঞ্চলে জলদস্যুতাও কমেছে।
এই মডেল পশ্চিম ভারত মহাসাগর ও মোজাম্বিক চ্যানেলেও ব্যবহার করা যেতে পারে।
বাস্তবে আফ্রিকার সামনে কয়েকটি অগ্রাধিকার থাকা দরকার।
প্রথমত, যেসব সামুদ্রিক চুক্তি ও নীতি ইতিমধ্যে নেওয়া হয়েছে, সেগুলো অনুমোদন করে কার্যকর করতে হবে।
দ্বিতীয়ত, যৌথ নজরদারি ব্যবস্থা তৈরি করতে হবে। স্যাটেলাইট ও রাডারের তথ্য একসঙ্গে ব্যবহার করতে হবে। উপকূলরক্ষীদের মধ্যে সমন্বয় বাড়াতে হবে। প্রয়োজন হলে যৌথ টহল চালাতে হবে।
তৃতীয়ত, অর্থের ব্যবস্থা করতে হবে। আফ্রিকার নিজস্ব অর্থায়নে একটি সামুদ্রিক নিরাপত্তা তহবিল গঠন করা যেতে পারে। এতে বাইরের দাতাদের ওপর নির্ভরতা কমবে।
চতুর্থত, সমুদ্রনীতি ও আফ্রিকার মুক্ত বাণিজ্যব্যবস্থাকে একসঙ্গে এগিয়ে নিতে হবে। বন্দর ও নৌপথকে মহাদেশের অভ্যন্তরীণ বাণিজ্যের মূল অবকাঠামো হিসেবে গড়ে তুলতে হবে।
পঞ্চমত, জ্বালানি নিরাপত্তা বাড়াতে হবে। আফ্রিকার যেসব দেশ অপরিশোধিত তেল রপ্তানি করে, তাদের নিজেদের পরিশোধন সক্ষমতা বাড়ানো জরুরি। একই সঙ্গে কৌশলগত জ্বালানি মজুতও গড়ে তুলতে হবে। এতে কোনো গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ বন্ধ হয়ে গেলে সংকট কম হবে।
ষষ্ঠত, সমুদ্রভিত্তিক দক্ষতা ও শিল্প গড়ে তুলতে হবে। নৌ প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান, সমুদ্র জরিপ, জাহাজ মেরামত ও নির্মাণশিল্প, নিজস্ব জাহাজ নিবন্ধন ব্যবস্থা এবং সামুদ্রিক বীমা খাত তৈরি করতে হবে।
এতে আফ্রিকার বাইরে চলে যাওয়া বিপুল অর্থ ও অর্থনৈতিক সুবিধার একটি অংশ মহাদেশের ভেতরেই রাখা সম্ভব হবে।
সংকট নয়, সুযোগ
আফ্রিকার সামনে এখন বড় একটি প্রশ্ন।
হরমুজের মতো গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে সংকট যত বাড়ছে, বিশ্ব অর্থনীতিতে বিকল্প নৌপথের গুরুত্বও তত বাড়ছে। আর সেই নৌপথগুলোর একটি বড় অংশ আফ্রিকার আশপাশে।
তাই ‘হরমুজ-পরবর্তী যুগ’ আফ্রিকার জন্য শুধু ঝুঁকি নয়, বড় সুযোগও হতে পারে।
ভূগোল ও সম্পদের কারণে বিশ্ব রাজনীতিতে আফ্রিকার জায়গা এমনিতেই রয়েছে। কিন্তু এত দিন সেই অবস্থানকে রাজনৈতিক ও কৌশলগত শক্তিতে রূপ দিতে পারেনি মহাদেশটি।
এখন সুযোগ হলো, শুধু অন্যদের সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় না থেকে নিজের সিদ্ধান্ত নিজেই নেওয়া। প্রশ্ন আর আফ্রিকা বিশ্ব রাজনীতিতে জায়গা পাবে কি না—এটি নয়। প্রশ্ন হলো, সেই জায়গায় আফ্রিকা নিজের ভাগ্য নিজে ঠিক করবে, নাকি অন্যদের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করেই থাকবে।
রাফায়েল শিখানির আলজাজিরায় দেওয়া মতামত থেকে অনূদিত ...






