৬৬ বছর ধরে উড়ছেন আকাশে, এখন যাচ্ছেন অবসরে

তরুণ বয়সে বিমানবালা হিসেবে জোয়ান প্রিন্স ক্র্যান্ডাল। ছবি: সংগৃহীত
আকাশপথে যাত্রীসেবার ইতিহাসে এক জীবন্ত কিংবদন্তির নাম জোয়ান প্রিন্স ক্র্যান্ডাল। ১৯৫৯ সালে প্রপেলারচালিত বিমানে কর্মজীবন শুরু করেন তিনি। এরপর থেকে টানা ৬৬ বছরেরও বেশি সময় ধরে আকাশে দায়িত্ব পালন করেছেন এই মার্কিন বিমানবালা। বিমান চলাচল খাতের অভূতপূর্ব প্রযুক্তিগত পরিবর্তন, নারীর অধিকার আন্দোলন এবং বাণিজ্যিক বিমান পরিবহনের বিবর্তনের সাক্ষী তিনি। বিশ্বের সবচেয়ে দীর্ঘসময় কর্মরত এই বিমানবালা এবার প্রস্তুতি নিচ্ছেন অবসরের।
বিমানবালা হিসেবে কাজ করার মধ্যে সবসময়ই এক ধরনের গ্ল্যামার খুঁজে পেয়েছেন ক্র্যান্ডাল। এই পেশা বিশ্বের নানা প্রান্তে ভ্রমণের সুযোগ দিয়েছে তাকে। পরিচয় করিয়েছে নতুন অভিজ্ঞতার সঙ্গেও। হাই হিল, ফ্যাশনেবল ইউনিফর্ম আর আভিজাত্যের সেই দিনগুলোর স্মৃতি এখনও গেঁথে আছে তার মনে।
আর সেই ভালোবাসাই তাকে আকাশে রেখেছে টানা ৬৬ বছরের বেশি সময় ধরে। তার বর্তমান প্রতিষ্ঠান ডেল্টা এয়ার লাইন্সের দাবি, তিনিই সম্ভবত বিশ্বের সবচেয়ে দীর্ঘসময় কর্মরত বিমানবালা।
সিএনএনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ক্র্যান্ডাল বলেছেন, ‘আমার পুরো কর্মজীবনটাই যেন বিমানবালা থেকে ফ্লাইট অ্যাটেনডেন্ট হয়ে ওঠার ইতিহাস।’
১৯৫৯ সালে প্যাসিফিক এয়ারলাইন্সে কর্মজীবন শুরু করেন তিনি। তখনকার দিনে প্রপেলারচালিত মার্টিন ৪০৪, ফেয়ারচাইল্ড এফ-২৭ কিংবা ডগলাস ডিসি-৩ বিমানে কাজ করতেন তিনি। তার প্রথম কর্মস্থল ছিল ২৪ যাত্রীবাহী একটি ডিসি-৩ বিমান।
তার ভাষ্য, ‘তখন তরুণ ও আকর্ষণীয় চেহারার নারীদের খুঁজত বিমান সংস্থাগুলো।’
তবে সময়ের সঙ্গে বিমান শিল্প যেমন বদলেছে, তেমনি বদলেছে বিমানবালাদের ভূমিকা। একসময় যেখানে ফ্যাশন ও সেবাদান ছিল প্রধান বিষয়, এখন নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও তাদের অন্যতম বড় দায়িত্ব। জরুরি পরিস্থিতিতে যাত্রীদের সরিয়ে নেওয়া, দুর্ঘটনায় সহায়তা করা কিংবা সংকট মোকাবিলা করা এখন তাদের দৈনন্দিন কাজের অংশ।
প্যাসিফিক এয়ারলাইন্সের পর তিনি কাজ করেছেন এয়ার ওয়েস্ট, হিউজেস এয়ারওয়েস্ট, রিপাবলিক এয়ারওয়েজ, নর্থওয়েস্ট এবং শেষ পর্যন্ত ডেল্টা এয়ার লাইন্সে। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের একীভূত হওয়ার মধ্যেও তার আকাশযাত্রা থেমে থাকেনি।
তবে মোটেও সহজ ছিল না তার কর্মজীবনের শুরুটা। ১৯৫০ ও ৬০-এর দশকে কর্মজীবী নারীদের নানা বৈষম্যের মুখোমুখি হতে হতো। অনেক বিমান সংস্থায় ওজন ও বাহ্যিক সৌন্দর্য নিয়েও ছিল কঠোর নিয়ম। বিয়ে করলে চাকরি ছাড়তে হতো, এমনকি নিয়মও ছিল ৩২ বছর বয়সে বাধ্যতামূলক অবসর নেওয়ার।
ক্র্যান্ডাল বলেছেন, ‘এসব নিয়ম কল্পনাও করা যায় না আজকের দিনে।’
তার মতে, সে সময় এই পেশাকে দুই বছরের চাকরি হিসেবে দেখতেন অনেক তরুণী। কিন্তু অনেকেই, তার মতো, বিমান চলাচলের প্রতি ভালোবাসায় দীর্ঘ সময় থেকে গেছেন এই পেশায়।
বিমানবালা পেশার সূচনা ১৯৩০-এর দশকে। তখন মূলত নার্সদের যাত্রীসেবার জন্য নিয়োগ দেওয়া হতো। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে একজন বিমানবালার গড় বার্ষিক আয় প্রায় ৭০ হাজার ৯৮০ ডলার।
ক্র্যান্ডালের কর্মজীবনে সবচেয়ে বড় পরিবর্তনগুলোর একটি ছিল প্রযুক্তিগত অগ্রগতি। প্রপেলারচালিত বিমানের জায়গা নেয় আধুনিক জেট বিমান।
তিনি স্মৃতিচারণ করে বলেছেন, ‘উঁচুতে, দ্রুত, আরও মসৃণ, আরও বেশি আসন।’ নতুন জেট বিমানের আগমন এখনও তার চোখে ভাসে।
আরেকটি বড় পরিবর্তন আসে ১৯৬৪ সালের যুক্তরাষ্ট্রের সিভিল রাইটস অ্যাক্টের মাধ্যমে। নারীদের জন্য কর্মক্ষেত্রে বৈষম্য কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে এই আইন।
ক্র্যান্ডাল বলেছেন, ‘এই আইন বদলে দিয়েছে আমাদের জীবন। বিশেষ করে বিমানবালাদের জন্য এটি ছিল বড় পরিবর্তন।’ এর ফলে বিয়ে বা সন্তান জন্মদানের কারণে চাকরি হারানোর ভয় ছাড়াই কাজ চালিয়ে যেতে পারেন নারীরা।
দীর্ঘ ৬৬ বছর পর এখন অবসরের প্রস্তুতি নিচ্ছেন ক্র্যান্ডাল। সম্প্রতি ডেল্টার প্রশিক্ষণ কেন্দ্র থেকে উত্তীর্ণ হওয়া নতুন বিমানবালা অ্যালিস ব্রুসার্ডের সঙ্গে দেখা হয় তার। ব্রুসার্ড বলেছেন, যাত্রী ও সহকর্মীদের সঙ্গে আবেগপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলার সুযোগই এই পেশার প্রতি আকৃষ্ট করেছে তাকে।
এই অনুভূতিটাই ছয় দশকের বেশি সময় ধরে আকাশে বেঁধে রেখেছে ক্র্যান্ডালকে। তার কর্মজীবনে চাঁদে পৌঁছেছে মানুষ। বোয়িং ৭৪৭ এসেছে, বিমান প্রযুক্তিতে ঘটেছে অভাবনীয় অগ্রগতি।
তিনি বলেছেন, ‘একটি দীর্ঘ রূপালি নলের ভেতরে বসে আরও দ্রুত ও আরও উঁচুতে উড়ে যাওয়ার অভিজ্ঞতা ছিল অসাধারণ। এটি ছিল এক অনন্য শিক্ষা।’
তবে তার মতে, যাত্রীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং পৃথিবীর সঙ্গে তাদের সংযুক্ত করার মূল দায়িত্বটি কখনও বদলায়নি।
বর্তমানে প্রায়ই ফ্লাইট পার্সার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন তিনি। যা কেবিন ক্রুদের মধ্যে সর্বোচ্চ পদ।
অবসরের পর একটি বই লেখার পরিকল্পনা রয়েছে তার। পাশাপাশি ভ্রমণও চালিয়ে যেতে চান। প্যারিস, মুম্বাই ও হংকং রয়েছে তার প্রিয় গন্তব্যগুলোর মধ্যে।
ক্র্যান্ডাল বলেছেন, ‘আমি নিজেকে ভাগ্যবান মনে করি। আমি এখনও সুস্থ আছি এবং এই জীবন এখনও উপভোগ করছি।’
তবে এবার আর যাত্রীদের পানীয় পরিবেশন বা নিরাপত্তা নির্দেশনা দিতে হবে না। অবসরের পর তিনি শুধু একজন ভ্রমণপিপাসু মানুষ হিসেবে পৃথিবীকে নতুন করে আবিষ্কার করবেন।
সূত্র: সিএনএন









