ইউক্রেনের মাঠে মাঠে মৃত্যুফাঁদ
- রাশিয়ার ড্রোনে পোঁতা মাইন অপসারণই এখন বড় চ্যালেঞ্জ

ছবি: রয়টার্স
আগাছায় ভরা একটি মাঠে চার হাত-পায়ে ভর দিয়ে ঝুঁকে মাটি খুঁড়ছেন ওলেনা কাবানোভা। হাতে কোদাল নিয়ে স্থিরভাবে মাটি খুঁড়ে মাইন শনাক্তকারী যন্ত্রে সন্দেহজনক বস্তু ধরা পড়া জায়গাটির চারপাশে বর্গাকার করে মাটি সরাচ্ছেন ৫৮ বছর বয়সী এই নারী। চার বছর আগে পূর্ব ইউক্রেনের মাঠটি ছিল রুশ সেনাদের দখলে। এখন এলাকাটি আবার ইউক্রেনের নিয়ন্ত্রণে এলেও মাঠ জুড়ে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে স্থলমাইন। কাবানোভার মতো স্থানীয়রা আবার ব্যবহারযোগ্য করে তোলার চেষ্টা করছেন জমিটি।
ওলেনার এই সম্বলটুকুই শুধু নয়, রুশ বাহিনীর এ মরণফাঁদ ছড়িয়ে আছে ইউক্রেনের সীমান্তবর্তী অঞ্চলগুলোর সব মাঠেই। গতকাল বুধবার প্রকাশিত প্রতিবেদনে ব্রিটিশ দৈনিক দ্য গার্ডিয়ান জানিয়েছে, বর্তমান বিশ্বের সবচেয়ে বেশি মাইন পোঁতা আছে এই ইউক্রেনে। এসব মাইন অপসারণ একই সঙ্গে ব্যয়বহুল ও বিপজ্জনক। ঝুঁকিমুক্ত মাইন অপসারণে তাই প্রযুক্তির আশ্রয় নিচ্ছে ইউক্রেন। স্থলমাইন অপসারণের এ কাজ যৌথভাবে করছে ইউক্রেন সরকার ও যুক্তরাজ্যভিত্তিক এনজিও হালো ট্রাস্ট।
মাটিতে ছড়ানো এই মৃত্যুফাঁদ থেকে বাঁচতে তারা দ্বারস্থ হয়েছে নতুন প্রযুক্তির। ডিএমআর-৭ একটি রিমোটচালিত ছোট মোটরযান। এর মাধ্যমে নিরাপদ দূরত্ব থেকে যন্ত্র দিয়ে সরানো যাবে স্থলমাইন।
জাপানে উদ্ভাবিত ডিএমআর প্রযুক্তির সাহায্যে এর আগেও পৃথিবীর বহু দেশে মাইন সরানোর কাজ করেছে হালো ট্রাস্ট। তবে ইউক্রেন এক্ষেত্রে ব্যতিক্রম। এখানে স্থলমাইনের সংখ্যাও অত্যধিক। ড্রোনের সাহায্যে মাঠের আনাচে-কানাচে পোঁতা মাইনগুলো শনাক্ত করাই এখানে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। এই মৃত্যুফাঁদের খোঁজে বাধ্য হয়ে প্রযুক্তির দরজায় ধরনা দিয়েছে হালো ট্রাস্টও। পরীক্ষা চালাচ্ছে ডিএমআর-৭ মডেল নিয়ে। এই মডেলটি ছোট একটি ট্যাংকের মতো। দূর থেকে এর মাধ্যমে একেকটি মাইন সরাতে লাগবে মাত্র ৫ মিনিট। যন্ত্রটিতে সংযুক্ত পাইপ দিয়ে উচ্চচাপে সংকুচিত বাতাস ছুড়ে সরিয়ে দেওয়া যায় মাটির একটি অংশ। ফলে বিপজ্জনক জায়গায় গিয়ে প্রয়োজন পড়ে না কোদাল দিয়ে মাটি খোঁড়ার।
দেশটির এই মাইন পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন অনেকে। উদ্বেগ প্রকাশ করেছে ইউক্রেনে জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির (ইউএনডিপি) মাইন অপসারণ কার্যক্রমের ব্যবস্থাপক পল হেসলপও। তিনি বলেছেন, ব্যাপকভাবে বেড়েছে ড্রোনের মাধ্যমে নিক্ষেপ করা বিস্ফোরক অস্ত্রের ব্যবহার। পরিস্থিতির ব্যাপকতা ভিয়েতনামের হো চি মিন ট্রেইলে যুক্তরাষ্ট্রের ক্লাস্টার বোমা নিক্ষেপের সময়ের সঙ্গে তুলনা করেছেন তিনি। এ সম্পর্কে এক বক্তব্যে হালো ট্রাস্টের ইউনিট কমান্ডার আন্দা রিজা বলেছেন, ‘মাঠঘাট ঘুরে মাইন অপসারণের কাজটি বাস্তবে সহজ নয়। ব্যয়বহুল ও সময় সাপেক্ষ। তার ওপর আছে নিরাপত্তা শঙ্কাও। সেকারণে মাইন অপসারণে রিমোট কন্ট্রোল যান ব্যবহার করছি আমরা।’
ইউক্রেনের রাষ্ট্রীয় জরুরি সেবা বিভাগের যান্ত্রিক মাইন অপসারণ ইউনিটের প্রধান মিকিতা শুলঝেঙ্কো বলেছেন, তাদের কর্মীরা নজরদারির কাজে ড্রোন ব্যবহার করছেন। তবে ড্রোনে তোলা ছবি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) সাহায্যে বিশ্লেষণের প্রযুক্তি এখনো তাদের কাজে যুক্ত হয়নি। শিগগির এই প্রযুক্তি ব্যবহারের আশা প্রকাশ করেছেন তিনি।
মাইন শনাক্ত ও অপসারণের কাজে আরও কয়েকটি প্রযুক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে ইউক্রেনে। এর মধ্যে রয়েছে মাটির নিচের বস্তু শনাক্ত করার রাডার ও বিস্ফোরক পদার্থ শনাক্তকারী যন্ত্র। ড্রোন ও স্যাটেলাইটের ছবি বিশ্লেষণ করে আগে থেকেই চিহ্নিত করা সম্ভব হচ্ছে বিপজ্জনক এলাকা।
তবে নতুন প্রযুক্তি ব্যবহারে ঝুঁকিও রয়েছে। রাশিয়া ও ইউক্রেনের ড্রোন জ্যামিং প্রযুক্তির কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে মানবিক কাজে ব্যবহৃত ড্রোনও। পাশাপাশি সরকারি সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয়ের অভাব ও আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ধীর করে দিচ্ছে মাইন অপসারণের কাজকে।



