৪৫ বছর পর যমজ বোন জানলেন, তাদের বাবা আলাদা

মিশেল ও লাভিনিয়া
মিশেল আর লাভিনিয়া ওসবোর্ন নামের দুই যমজ বোন কাটিয়েছেন সারাজীবন এক অন্যরকম টানে। লাভিনিয়া ২০২২ সালের সেপ্টেম্বর মাসে পান হুট করে এক ডিএনএ পরীক্ষার ফল। ইমেইলটি পড়ার সময় তিনি বোধ করছিলেন বুকের ভেতর এক অজানা আতঙ্ক। তার সেই আশঙ্কাই সত্যি হয় যখন ল্যাবরেটরির রিপোর্টে উঠে আসে এক আজব তথ্য। যমজ হয়ে জন্মালেও এ দুই বোনের বাবা ছিলেন আসলে দুজন আলাদা মানুষ।
প্রকৃতির এক অদ্ভুত খেয়ালে তারা বড় হন একই মায়ের জরায়ুতে একসঙ্গেই। বিজ্ঞানের ভাষায় বিরল এ ঘটনাকে গবেষকরা ডাকেন ‘হেটারোপ্যারেন্টাল সুপারফেকান্ডেশন’ নামে। পৃথিবীতে এ পর্যন্ত এমন ঘটনা ঘটেছে মাত্র ২০টির মতো। লাভিনিয়া আর মিশেল হলেন ব্রিটেনের ইতিহাসে এমন প্রথম কোনো যমজ যাদের রক্তে বইছে আলাদা বাবার ডিএনএ।
নতুন এই সত্য লাভিনিয়ার মনে তৈরি করে এক বিশাল শূন্যতা। তাদের দুই বোনের শৈশব কেটেছিল চরম অবহেলা আর মানুষের বাড়িতে ঘুরে ঘুরে। মিশেলই ছিল লাভিনিয়ার কাছে পৃথিবীর একমাত্র ধ্রুবক আর আপন মানুষ।
বোনের পরিচয় বদলে যাওয়ায় লাভিনিয়া হারিয়ে ফেলেন নিজের মনের সবটুকু শান্তি। তবে মিশেল এ খবরটি গ্রহণ করেন অনেক শান্তভাবে।
তার কাছে সবকিছুই মনে হয় একদম পরিষ্কার আর যুক্তিযুক্ত। তাদের মা ১৯৭৬ সালে যখন যমজদের জন্ম দেন, তখন তিনি ছিলেন মাত্র ১৯ বছরের এক কিশোরী। মা ছোটবেলায় ভুগেছিলেন নিজের সৎ বাবার হাতে অকথ্য সব নির্যাতনে। শৈশব থেকেই মায়ের জীবনের অনেকটা সময় কাটে পালক পরিবার আর চিলড্রেন হোমে।
মা সন্তানদের কাছে সবসময় জেমস নামের এক ব্যক্তিকে বলতেন তাদের বাবা হিসেবে। তবে জেমস কখনোই ছিলেন না তাদের দুই বোনের এ ছোটবেলার সঙ্গী।
যমজদের বয়স যখন পাঁচ বছর, তখন মা চলে যান লন্ডনে উচ্চশিক্ষার জন্য। সন্তানদের তিনি রেখে যান নটিংহামে নিজের এক বন্ধুর মায়ের আশ্রয়ে। সেই দাদি ছিলেন বড্ড কড়া মেজাজের আর ভালোবাসার দিক থেকে একদম কৃপণ।
লাভিনিয়া নিজের চেহারায় জেমসের মিল দেখলেও মিশেলের মনে ছিল দানা বাঁধা এক গভীর সন্দেহ।
মিশেল আর লাভিনিয়া তখন একে অন্যকে জাপটে ধরে খুঁজতেন বেঁচে থাকার লড়াই। তারা মা আর দাদির অবহেলা সয়ে বড় হন একসঙ্গেই। তাদের কৈশোর যখন মাঝপথে, তখন জেমস ফিরে আসেন হঠাৎ করেই সবার জীবনে।
লাভিনিয়া নিজের চেহারায় জেমসের মিল দেখলেও মিশেলের মনে ছিল দানা বাঁধা এক গভীর সন্দেহ।
২০২১ সালের দিকে তাদের মায়ের মাথায় বাসা বাঁধে স্মৃতিভ্রংশ বা ডিমেনশিয়া নামের এক কঠিন রোগ। মিশেল তখন একটি ছবি দেখে নিশ্চিত হন যে জেমস কোনোভাবেই তার বাবা নন। তিনি এরপরই অনলাইনে অর্ডার করেন নিজের পরিচয় নিশ্চিত করতে একটি ডিএনএ পরীক্ষার কিট।
যেদিন তাদের মা মারা যান, ঠিক সেদিনই মিশেল হাতে পান তার জীবনের সবচেয়ে বড় সত্য। জেমসের ডিএনএর সঙ্গে মিশেলের বিন্দুমাত্র মিল পাননি ল্যাবরেটরির ডাক্তাররা। মিশেল অনেক খোঁজাখুঁজি করে বের করেন অ্যালেক্স নামের এক ব্যক্তিকে নিজের আসল জন্মদাতা হিসেবে।
সেই লোকটির জীবন ছিল মাদকের নেশায় একদম ছারখার আর ঘরবাড়িহীন। মিশেল নতুন এক বোন অলিভাইনকে খুঁজে পেলেও লাভিনিয়া তার মাঝে দেখেননি কোনো রক্তের টান।
লাভিনিয়া নিজের মনের খটকা দূর করতে নিজেও করান ডিএনএ পরীক্ষা। তিনি জানতেন যে ফল আসবে মিশেলের মতোই একদম একই রকম। কিন্তু যখন রিপোর্টটি হাতে আসে, তখন তিনি দেখেন নিজের অজান্তেই ঘটে গেছে এক জাদুকরী ঘটনা।
মিশেল আর তিনি যমজ হলেও আদতে ছিলেন তারা দুজন সৎ বোন। এই কঠিন সত্য মেনে নিতে লাভিনিয়ার কষ্ট হয় অনেক বেশি। তিনি শুরুতে প্রচণ্ড রেগে যান মিশেলের ওপর এমন অদ্ভুত এক ঝামেলার জন্য। এরপর বেরিয়ে আসে আরও এক নতুন রহস্য যে জেমস লাভিনিয়ারও বাবা ছিলেন না কোনোদিন। মিশেল হাল না ছেড়ে খুঁজে বের করেন আর্থার নামের এক ব্যক্তিকে লাভিনিয়ার জন্মদাতা হিসেবে।
আর্থারকে খুঁজে পেয়ে লাভিনিয়া যান তার সঙ্গে দেখা করতে পশ্চিম লন্ডনে। সেই লোকটি ছিলেন মেজাজে অনেক হাসিখুশি আর একদম লাভিনিয়ার মতোই প্রাণবন্ত। প্রথম দেখাতেই লাভিনিয়া অনুভব করেন আর্থারের প্রতি এক গভীর মায়ার টান।
বাবা আর মেয়ে এখন দেখা করেন মাসে কয়েকবার আর কাটান দারুণ সবসময়। মিশেলকেও আর্থার দিয়েছেন অনুমতি তাকে বাবা বলে ডাকার জন্য। আর্থার বর্ণনা করেন যমজদের মায়ের সেই দুঃসময়ের কথা যখন তিনি ভয়ে কাঁপছিলেন। মা সেদিন আর্থারের কাছে গিয়েছিলেন কেবল আশ্রয়ের খোঁজে একদম বিপর্যস্ত অবস্থায়। মা বেঁচে নেই বলে এই রহস্যের আসল চাবিকাঠি এখন হারিয়ে গেছে চিরতরে।
মিশেল নিজের আসল বাবা অ্যালেক্সের সঙ্গেও দেখা করেন অনেক চড়াই-উৎরাই পেরিয়ে। অ্যালেক্স ছিলেন সেসময় নেশায় একদম বুঁদ আর নিজের হুঁশহীন অবস্থায়। চেহারার মিল একদম নিখুঁত থাকলেও মিশেল তাকে নিজের জীবনে রাখতে চাননি আর।
তিনি স্রেফ নিজের শেকড়কে জানতে চেয়েছিলেন একবার নিজের চোখের সামনে। তাদের মা এ রহস্য সম্পর্কে কতটুকু জানতেন তা এখন এক মস্ত বড় ধাঁধা। লাভিনিয়া মনে করেন, মা হয়তো মনে মনে জানতেন সবকিছুই কিন্তু স্বীকার করতে ভয় পেতেন। মিশেলও একমত হন যে মা সত্যকে আড়াল করতে চেয়েছিলেন সারাজীবন।
ডিএনএ পরীক্ষা তাদের জীবনকে হয়তো বদলে দিয়েছে অনেকখানি কিন্তু তাদের বন্ধন আছে আগের মতোই অটুট।






