স্কালোনির ট্যাকটিক্যাল ফ্লুইডিটি বনাম রাংনিকের গেগেনপ্রেসিং

আর্জেন্টিনা বনাম অস্ট্রিয়া ম্যাচ শুধু লিওনেল মেসির রেকর্ড গড়ার মঞ্চই নয়, হতে যাচ্ছে দুটো বিপরীত ফুটবল-দর্শনেরও দ্বৈরথ। একদিকে লিওনেল স্কালোনি, যার হাতে আছে বিশ্বের সেরা ফুটবলার এবং তাকে ঘিরে থাকা এমন এক দল ফুটবলার, যাদের আর্জেন্টিনার কোচ ব্যবহার করতে পারেন বহুমাত্রিক বৈচিত্র্যে। অন্যদিকে রালফ রাংনিক, যাকে মনে করা হয় আধুনিক জার্মান ফুটবলের গডফাদার। ইয়ুর্গেন ক্লপ, থমাস টুখেলরা যে গেগেনপ্রেসিং কৌশলে ইউরোপের ক্লাব ফুটবলে সাফল্য পেয়েছেন, তার তাত্ত্বিক গুরু মনে করা হয় রাংনিককেই। জার্মান ক্লাব ফুটবলে দীর্ঘদিন কোচিং করানো রাংনিক বছর চারেক ধরে অস্ট্রিয়ার কোচের দায়িত্বে এবং এবারই প্রথম তার বিশ্বকাপে পা রাখা। আর্জেন্টিনা বনাম অস্ট্রিয়া ম্যাচে তাই যতটা মাঠের ২২ জোড়া পায়ের, ততটাই ডাগআউটের দুটো মাথারও।
গেগেনপ্রেসিং ব্যাপারটি সহজে বোঝাতে গেলে ঢাকার রাস্তায় পথচারীর পরিস্থিতি দিয়ে বোঝানোটাই হবে সবচেয়ে ভালো উদাহরণ! ধরুন, বাসের ভেতর বসে আছেন যানজটে আটকে, মোবাইল ফোনটা কানে। এমন সময় কেউ একজন ছোঁ মেরে ফোনটা কেড়ে নিয়ে দিল দৌড়। এখন আপনি চাইলে বাস থেকে নেমে তার পিছু ধাওয়া করতে পারেন অথবা থানায় গিয়ে সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করে আসতে পারেন। পিছু ধাওয়া করলেই যে ফোন উদ্ধার হয়ে যাবে, ব্যাপারটা এত সহজ নাও হতে পারে। আবার থানায় গিয়ে জিডি করলে পুলিশ যদি চোরাই ফোন ধরে, তাহলে ভাগ্য ভালো থাকলে ফোনটা পেয়েও যেতে পারেন। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, এর সঙ্গে ফুটবলের সম্পর্ক কোথাও? উত্তর হলো, ফোন হারানোর পর ছিনতাইকারীকে পাল্টা ধাওয়া করাটাই হচ্ছে গেগেনপ্রেসিং, যার মানেই হচ্ছে পাল্টা চাপ। এই পদ্ধতিতে বলের দখল পা থেকে প্রতিপক্ষের দিকে গেলেই শারীরিক ও মানসিক চাপ প্রয়োগ করে প্রতিপক্ষের পা থেকে বলের দখল ফের নিজেদের পায়ে নিয়ে আসা এবং প্রতিপক্ষকে সবসময় চাপের ওপর রাখা। এটাই হচ্ছে গেগেনপ্রেসিংয়ের মূলমন্ত্র। আরও অনেক খুঁটিনাটি আছে, সেসব কচকচানিতে না যাই। অনেক দল মাঠে যেটি করে, প্রতিপক্ষের পায়ে বল গেলে রক্ষণ জমাট করে, যেমনটা ফোন হারিয়ে জিডি করার মতো। পিছু ধাওয়া করেও ফোন ফেরত না পাওয়া যেতে পারে, আবার জিডি করেও অনেকে পেয়েছেন। তাই কোন পরিস্থিতিতে কোনটা করবেন, সেই সিদ্ধান্ত যেমন আপনার; তেমনি গেগেনপ্রেসিংয়ে কাজ হবে কী হবে— সেই সিদ্ধান্ত নেওয়াটাও কোচের কাজ। রাংনিক এই পদ্ধতি নিয়েছেন, কারণ তার হাতে যে দলটা আছে, সেই দলের বেশিরভাগ ফুটবলারই গেগেনপ্রেসিংয়ের সঙ্গে পরিচিত।
অস্ট্রিয়ার দায়িত্ব নেওয়ার আগে রাংনিক লম্বা সময় কোচিং করিয়েছেন বুন্দেসলিগার দল রেডবুল লিপজিগে। সেই দলের নিকোলাস সাইওয়াল্ড ও জাভার স্লাগার আছেন অস্ট্রিয়া দলে; আছেন বায়ার্ন মিউনিখের যুব দল ও মূল দল মিলিয়ে দুই দশকের বেশি কাটিয়ে রিয়াল মাদ্রিদে যাওয়া ডেভিড আলাবা। এ ছাড়া দলটিতে বুন্দেসলিগার ফুটবলারই বেশি, যাদের খেলার গতি, দম ও শারীরিক সামর্থ্য আছে রাংনিকের কৌশলের সঙ্গে তাল মেলানোর। অন্যদিকে স্কালোনির আর্জেন্টিনার সামর্থ্য আছে কঠিন, তরল কিংবা বায়বীয় যেকোনো আকারই ধারণ করার। ৪-৪-২, ৪-৩-৩ কিংবা ৩-৫-২; একই ম্যাচে প্রতিপক্ষের ধরন অনুযায়ী কৌশল বদলে ফেলার সামর্থ্য রাখেন স্কালোনি। তার হাতে সেই বিকল্প আর তার বদলের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার মতো ফুটবলারও আছে। আর লিওনেল মেসির উপস্থিতি তো আছেই!
সহজ করে বোঝাতে চাইলে রাংনিকের গেগেনপ্রেসিং হলো হেভি মেটাল ফুটবল; এখানে গিটারের ঝংকারের মতো গতি আর উদ্দাম ড্রামের মতো প্রতিপক্ষকে তাড়িয়ে বেড়ানো আছে। অন্যদিকে স্কালোনি হলেন একদম ছোটবেলা থেকে সারগাম শিখে বড় হওয়া ধ্রুপদি শিল্পীর মতো। রবীন্দ্র-নজরুল থেকে আধুনিক সব ধরনের গানই তিনি গাইতে পারেন, আর তার সঙ্গে আছে বিশ্বের সবচেয়ে সেরা বাজিয়ে!
কী হতে পারে ডালাসের ৯০ মিনিটে? বছর দুই আগে কোপা আমেরিকা খেলতে এই মার্কিন মুল্লুকে এসেই কানাডার বিপক্ষে খেলেছিল আর্জেন্টিনা। সেই দলটার কোচ ছিলেন জেস অ্যালান মার্শ, এখনো এই ভদ্রলোক কানাডার কোচের দায়িত্বে। একটা সময় তিনি ছিলেন রেডবুল সলজবুর্গ ও পরে রেডবুল লিপজিগের কোচ। আলফানসো ডেভিসের গতি আর দীর্ঘকায় শক্তিশালী রক্ষণভাগের ফুটবলারদের দিয়ে মেসিকে রীতিমতো ঘিরে রেখেছিলেন মার্শ। তবে প্রথমার্ধে মেসিদের আটকে রাখলেও দ্বিতীয়ার্ধে আর পারেনি কানাডা। আসলে গেগেনপ্রেসিং এমন একটা কৌশল, যার জন্য সর্বোচ্চ পর্যায়ের ফিটনেস ও দমের প্রয়োজন। যেটি আসলে মানবিক সামর্থ্যের শীর্ষবিন্দুতে থাকা ফুটবলারদের পক্ষেই ৯০ মিনিট ধরে চালিয়ে যাওয়া সম্ভব।
অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে মেসির ভূমিকাটা হয়ে উঠতে পারে অনেকটা আর্জেন্টিনায় একটা সময় হুয়ান রোমান রিকেলমে যেভাবে খেলতেন, সেরকম। মাঝমাঠে থেকে বেশ কিছু অহেতুক পাসের বুননে, ছোট ছোট ‘রন্ডো’, অর্থাৎ নিজেদের ভেতর চোর-পুলিশ খেলার মাধ্যমে অস্ট্রিয়ার ফুটবলারদের ক্লান্ত করে তুলতে পারেন মেসি। তার সামনে বাধার দেয়াল হিসেবে রাংনিক হয়তো লম্বা-চওড়া কয়েকজন ডিফেন্ডার দাঁড় করাতে পারেন ঢাল হিসেবে। কারণ, আলজেরিয়ার বিপক্ষে মেসি দূর থেকেই শট নিয়েছেন। এখন আর আগের মতো বল নিয়ে চকিত ড্রিবলিংয়ে বক্সের ভেতর ঢুকছেন না, যেমনটা দেখা গেছে বার্সেলোনাতে। তাই কেভিন ডানসোকে সবসময় মেসির দৃষ্টির সামনে আড়াল বনে থাকার কাজটা দিয়েই নামাতে পারেন কোচ। মেসির পাস দেওয়ার জায়গাটা বন্ধ করার দায়িত্ব পেতে পারেন সাইওয়াল্ড আর মেসিকে শারীরিক চাপ প্রয়োগ করে বল ট্যাকল করার দায়িত্বটা পেতে পারেন লাইমার। মেসির বিপক্ষে সাতবার খেলার অভিজ্ঞতা থেকে আলবার কাজ হতে পারে রক্ষণটা গুছিয়ে রেখে ‘ডিফেন্সিভ ব্লক’ সুসংহত রাখা। মেসির মাধ্যমে অন্যদিকে ব্যস্ততার সুযোগে আলভারেজ বা লাউতারো মার্তিনেজ উঠে এলে তাদের ঠেকানোর জন্য অফসাইড ফাঁদ তৈরি করা আর রক্ষণদুর্গের শেষ প্রহরী হিসেবে কাজ করা।
ফুটবলের তথ্য-উপাত্ত নিয়ে কাজ করা ‘অপটা’র সুপারকম্পিউটার জানিয়েছে, আর্জেন্টিনার জেতার হার ৬০ ভাগের বেশি! অবশ্য এই ভবিষ্যদ্বাণী করতে সুপারকম্পিউটার লাগে না, সাধারণ ‘কমনসেন্স’ থাকলেই যথেষ্ট। একটা দল ১৯৯৮ সালের পর এবারই প্রথম বিশ্বকাপ খেলছে, অন্য দলটা বিশ্বকাপের বর্তমান চ্যাম্পিয়ন আর সেই দলে খেলেন বিশ্বের সেরা খেলোয়াড়। এই ম্যাচটা আর্জেন্টিনাই হয়তো জিতবে, তবে সেটি আলজেরিয়ার বিপক্ষে পাওয়া জয়ের মতো অনায়াস হবে না; বরং অনেকটাই ঘাম ঝরিয়ে জিততে হবে। সেটি আন্দাজ করাটাও কঠিন নয়। কঠিন হচ্ছে কোন দল কীভাবে জিততে পারে, সেটিরই পূর্বাভাস মেলানো!
গেগেনপ্রেসিংয়ের অলিখিত নিয়ম হচ্ছে, পা থেকে বলের দখল চলে গেলে ৮ সেকেন্ডের ভেতর সেটি পুনরুদ্ধার করা আর বল পাওয়ার ১০ সেকেন্ডের মধ্যে প্রতিপক্ষের ডি-বক্সে আক্রমণ চালানো। যাকে বলে লাগাতার আক্রমণ! দলটি অস্ট্রিয়া বলেই কিছুটা ভীতি কাজ করছে। কারণ বাছাইপর্ব থেকেই তাদের গোল করার অভ্যাসটা আছে। শুরুতেই যদি একের পর এক আক্রমণের ঢেউ বইয়ে একাধিক গোল পেয়ে যায় অস্ট্রিয়া, তখন আর্জেন্টিনাকেও আর্গল খুলেই নামতে হবে। তখন কী হয়, সেটি দেখাটাই হবে রোমাঞ্চকর। অন্যদিকে প্রথমার্ধে যদি কোনো দলই গোল না পায়, তাহলে ধীরে ধীরে দম হারিয়ে ফেলা অস্ট্রিয়ার ফুটবলারদের হয়তো হালকা চালে হেঁটেই কাটিয়ে দিতে পারবেন মেসি। তারপর? বাম পায়ের কিক অথবা বিদ্যুৎ গতির ড্রিবল— মেসির যেটি ইচ্ছা। অবশ্য কোপা আমেরিকার রেকর্ড বলছে, এমন প্রতিপক্ষ মেসিকে এতটাই বোতলবন্দি করে রাখে যে তাতে আলভারেজ বা মার্তিনেজের সুবিধা হয়ে যায়। হয়তো এই সুযোগে তাদেরই কারও গোল বাড়বে বিশ্বকাপে। তবে সব কল্পনাই ম্লান করে দিতে পারেন মেসি, তার কোনো একটা জাদুকরী মুহূর্তই হয়তো ম্যাচ বদলে দিতে পারে।







