অবশেষে গানারদের বসন্ত

সংগৃহীত ছবি
আপনি তখন স্কুলে। সন্ধ্যাবেলা পড়াশুনার পাট চুকিয়ে বসলেন ১৪ ইঞ্চি টিভির সামনে। হালকা ঝিরঝির করতে থাকা খেলার চ্যানেলে দেখলেন লাল সাদা জার্সির শিরোপা উদযাপন। উদযাপনের কেন্দ্রে আছেন লাল টাই, কালো সুট পরা সাদা চুলের এক ভদ্রলোক। পরের দিন সকালে খবরের কাগজে জানলেন, ‘ইনভিন্সিবল’ আর্সেনাল কোন ম্যাচ না হেরেই জিতেছে প্রিমিয়ার লিগ! কোন এক অজানা কারণে প্রেমে পড়ে গেলেন নর্থ লন্ডনের ক্লাবটির।
‘প্রেমের মরা জলে ডোবে না’। প্রেম করবেন, কষ্ট পাবেন না, তা কী হয়? প্রতি মৌসুমেই শিরোপার আশায় বুক বাঁধেন। কিন্তু ভালোবাসার সেই ক্লাবটি দিয়ে যায় শুধুই বেদনা। মৌসুমের পর মৌসুম যায়, শিরোপা আর আসে না।
স্কুলের পাট চুকিয়ে আপনি উঠলেন কলেজে। কলেজ পেরিয়ে প্রবেশ করলেন বিশ্ববিদ্যালয় যুগেও। আর্সেনাল ততক্ষণে শিরোপা লড়াই থেকে চলে গেছে আরও দূরে। মৌসুম শেষে কোনমতে ৩ কিংবা ৪ নম্বর পজিশনে থাকাই যেন তাদের নিয়তি। প্রতিপক্ষের সমর্থকরা মজা করে বলে, পুরো মৌসুম শীর্ষে থাকলেও আর্সেনালের জায়গা সেই ৪ নম্বরেই!
একপেশে ভালোবাসা কি বেশিদিন টিকে? একের পর এক অপ্রাপ্তি আপনার ধৈর্যের পরীক্ষা নেয়। সুদূর লন্ডনে তখন ‘ওয়েঙ্গার আউট’ আন্দোলন পৌঁছেছে তার চূড়ান্তে। ‘আর্সেনাল মানেই আর্সেন ওয়েঙ্গার’, লাখো সমর্থকের সেই আবেগ তখন পরিণত হয়েছে তীব্র ক্ষোভে। যে ওয়েঙ্গারেই আর্সেনাল তার সাফল্যের চূড়ায় পৌঁছেছিল, সেই ওয়েঙ্গারেই ক্লাব দেখেছে তার সবচেয়ে খারাপ সময়।
বিশ্ববিদ্যালয়ের পাট চুকিয়ে আপনি ঢুকলেন স্বপ্নের চাকরিজীবনে। আপনার চাকরি শুরু, ওয়েঙ্গারের চাকরি শেষ। ২০১৭-১৮ মৌসুম শেষে ক্লাবকে বিদায় বললেন ওয়েঙ্গার। থামল ২২ বছরের পথচলা। চোখের জল, হতাশা, রাজ্যের স্মৃতি নিয়ে প্রিয় ক্লাবকে বিদায় জানালেন দলটির ইতিহাসের সফলতম কোচ। ওয়েঙ্গার গেলেও ফিরল না আর্সেনালের ভাগ্য।
ক্লাবের ঘরের ছেলে মিকেল আর্তেতা এলেন দায়িত্বে। নতুন আশায় বুক বাঁধল সমর্থকরা। আশা জাগল আপনার মনেও। কিন্তু স্বপ্ন দেখলেই কি হয়? আর্তেতার প্রথম কয়েক মৌসুম তো একেবারে যাচ্ছেতাই গেল। লিভারপুল-সিটির সাফল্যের চাপে তখন পিষ্ট গানার্স। চাকরি, সংসারে ব্যস্ত আপনি ধীরে ধীরে খেলা দেখাও কমিয়ে দিলেন। নিজের অজান্তেই মাঝে মধ্যে একটু খোঁজ নেন, কেমন করছে প্রিয় ক্লাব?
২০২২-২৩ মৌসুমে হঠাৎ করেই অফিসে শুনলেন, এবার তো মনে হচ্ছে আর্সেনাল লিগ জিতেই যাবে! মনটা উসখুস করে উঠল। আবার কি এদের পেছনে সময় নষ্ট করা ঠিক হবে? নিজের মনের সঙ্গে যুদ্ধে হেরে গেলেন। রাতে বাড়ি ফিরে আবার বসলেন টিভির সামনে। আরে তাইতো, এবার তো লিগ শিরোপা এসেই যাবে! এবার আপনার সঙ্গে ছিল আপনার ছোট্ট সন্তানও। কিছু না বুঝলেও বাবা যে দল, সেও সেটাই। কিন্তু নাহ। নাটকীয়ভাবে সেবারও সাফল্য এলো না। আর্সেনাল হলো রানার্সআপ। পরের দুই মৌসুমেও দুইয়েই আটকে গেল আর্তেতার দল।
ম্যানচেস্টার সিটির দাপটে কি আর কখনো লিগ শিরোপা জেতা হবে? আপনি আবারও আশা ছেড়ে দিলেন। হাজার মাইল দূরে হয়তো আশা ছেড়ে দিয়েছে আর্সেনালের অনেক পাড় সমর্থকও।
সবাই হাল ছাড়লে কি আর চলে? আর্তেতা হার মানেননি। বারবারই বলেছেন, ভরসা রাখুন! দলের ফুটবলাররা সেই বাণীতেই রাখলেন ভরসা। এই মৌসুমের শুরু থেকেই অদম্য আর্সেনাল এগিয়ে চলল দুর্বার গতিতে।
কিন্তু মৌসুমের শেষভাগে এসে যা হয়ে আসছে ২২ বছর ধরে, সে কি এত সহজে পিছু ছাড়বে? এপ্রিলে এসে এলোমেলো হয়ে গেল সবকিছু। ৯ পয়েন্টে এগিয়ে থাকা আর্সেনাল একের পর এক হোঁচট খেয়ে তখন দিশেহারা। টানা জয়ে সিটিজেনরা তো খুনে মেজাজে।
পরিসংখ্যান এমন দাঁড়ালো, সিটি তাদের সব ম্যাচ জিতলেই হবে চ্যাম্পিয়ন। সবাই তখন আরেকবার আশাভঙ্গের নিয়তিটা মেনেই নিয়েছে।
আর্তেতা মানেননি, মানেননি রাইস-সাকারা। এপ্রিলে সিটির কাছে হারের পর রাইসের সেই কথাটাই যেন সবার কানে বাজছিল, ‘ইটস নট ডান!’ সত্যিই তো।
শেষ হওয়ার আগেই হার মানতে নারাজ এই আর্সেনাল। নাটকের শেষটা তখনো যে বাকি। নাটকীয়ভাবে পয়েন্ট হারাল সিটি, আর্সেনালের শিরোপা স্বপ্ন পেল নতুন প্রাণ। লিগ শিরোপা লড়াই গড়াবে শেষ ম্যাচে, এমনটাই প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছেন সবাই।
কিন্তু না। শেষ ম্যাচের আগেই যে অপেক্ষা ফুরলো। বোর্নমাউথের মাঠে ম্যানচেস্টার সিটি ১-১ গোলে ড্র করার পরই নিশ্চিত হয়ে যায় আর্সেনালের লিগ শিরোপা। ২২ বছর পর ইপিএল জয়ের আনন্দে পুরো নর্থ লন্ডন মাতোয়ারা।
হাজার মাইল দূরে বাংলাদেশে তখন শেষরাত। ২০০৪ সালের পর আবারও আপনার চোখে পানি। সন্তান নিয়ে সাত সকালে মেতে উঠলেন শিরোপা জয়ের আনন্দে। হঠাৎ আপনার মনে পড়ল সেই ভদ্রলোকের কথা। দলের এই সাফল্যে কেমন অনুভব করছেন ওয়েঙ্গার?
এত উল্লাস, এত আনন্দ, এত উচ্ছ্বাস। নর্থ লন্ডনে আনন্দে মাতোয়ারা লাখো সমর্থকের ভিড়ে আপনার মতো অনেকেই হয়তো খুঁজেছে সেই ওয়েঙ্গারকেই। ওয়েঙ্গার কি শেষ ম্যাচে মাঠে থাকবেন?
২২ বছর আগে যে স্বপ্ন তিনি দেখিয়ে গেছেন, সেই স্বপ্নপূরণের দিনে ট্রফিটা কি তার হাতে তুলে দেবেন আর্তেতা? স্কুল থেকে কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় থেকে চাকরি, বিয়ে থেকে সন্তান; আর্সেনালকে আপনি ছেড়ে যাননি। আর্সেনালও আপনাকে ছাড়ল কই? ২২ বসন্তের অপেক্ষা শেষে উৎসবের আনন্দে নর্থ লন্ডন ও ঢাকা মিলে গেল এক বিন্দুতে।






