ব্রাজিলের নেইমারনির্ভরতা আর দীর্ঘ আক্ষেপের গল্প

লম্বা সময় ধরে নেইমারের ওপর নির্ভরশীল ছিল ব্রাজিল।
মাঠে শুয়ে যন্ত্রণায় গড়াগড়ি, হতাশ চাহনি আর চোখ থেকে গড়িয়ে পড়া অশ্রু— ব্রাজিলের সুপারস্টার নেইমারের ক্যারিয়ারের গল্পটা এমনই। চোটাঘাতে জর্জরিত হয়ে নিজের অসাধারণ প্রতিভাকে সেরা উচ্চতায় নিয়ে যেতে পারেননি। রিভালদোর সমান ৮টি বিশ্বকাপ গোল থাকলেও কিংবা রোমারিও-গারিঞ্চাদের ছাড়িয়ে গেলেও, নেইমারের নামের পাশে কোনো সোনালি ট্রফি নেই।
২০০২ সালের পর থেকে বিশ্বকাপ জিততে পারেনি ব্রাজিল। ২৪ বছরের ট্রফিখরা আর নেইমারের বিষাদ এখন যেন একে অপরের পরিপূরক। ব্রাজিল দলের দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে কার্লো আনচেলত্তি তাকে স্কোয়াডেই নেননি। বরং তাকে শতভাগ ফিট হওয়ার শর্ত দিয়েছেন। কিন্তু নেইমারের ইনজুরি আর অসুস্থতা যেন থামছেই না। ২০২৬ বিশ্বকাপ সামনে রেখে প্রশ্ন উঠেছে, নেইমার কি কার্লো আনচেলত্তির দলে স্থান পাবেন, নাকি ২০ বছর ধরে তার ওপর অতিনির্ভরশীল ব্রাজিল এখন নতুন কোনো পথ খুঁজবে?
আবার অসুস্থ নেইমার
২৭ এপ্রিল ২০২৬
২০১০ সালে যখন নেইমার ব্রাজিলের বিখ্যাত হলুদ জার্সি গায়ে জড়ান, তখন দানি আলভেস, কাকা বা রোনালদিনহোর মতো বড় কোনো সুপারস্টার তার সামনে ছিলেন না। আদ্রিয়ানো কিংবা কাকার ফর্ম তখন পড়তির দিকে। ফলে পরিস্থিতির চাপে নেইমার একাই হয়ে ওঠেন দলের মধ্যমণি। ১৯৫৮ সালে পেলের পাশে ছিলেন গারিঞ্চা বা দিদি। ১৯৭০ সালে পেলের সঙ্গী ছিলেন জারজিনহো, রিভেইলিনোরা। আর ২০০২ সালে রোনালদো নাজারিও পেয়েছিলেন রিভালদো ও রোনালদিনহোকে। কিন্তু ২০১৪ থেকে ২০২২— এই দীর্ঘ সময় নেইমার একাই ব্রাজিলের বিশ্বকাপ জয়ের একমাত্র আশা হয়েছিলেন।
ঘরের মাঠে ২০১৪ বিশ্বকাপে নেইমারের ওপর চাপ ছিল হিমালয়সমান। কলম্বিয়ার হুয়ান জুনিগার সেই ভয়াবহ ট্যাকলে নেইমার যখন ছিটকে গেলেন, তখন পুরো ব্রাজিল স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল। নেইমারহীন ব্রাজিল সেমিফাইনালে জার্মানির কাছে ১-৭ গোলে বিধ্বস্ত হয়। সে রাতটিই ‘নেইমার-ডিপেন্ডেন্সিয়া’ বা নেইমারনির্ভরতাকে এক চিরস্থায়ী তকমা দিয়ে দেয়। ২০১৮ বিশ্বকাপে নেইমার গিয়েছিলেন বিশ্বের সবচেয়ে দামি খেলোয়াড় হিসেবে। কিন্তু মাঠের ফুটবলের চেয়ে তার নাটকীয় আচরণ আর ফাউলের শিকার হওয়ার পর মাটিতে গড়াগড়ি দেওয়া তাকে হাসির পাত্রে পরিণত করেছিল। বেলজিয়ামের কাছে হেরে বিদায় নেওয়ার পর নেইমার কোনো বীর হিসেবে নয়; বরং ট্রোল আর মিমের নায়ক হয়ে রাশিয়া ছাড়েন।
গত কাতার বিশ্বকাপে নেইমার যখন চোট পেয়ে মাঠ ছাড়েন, তখন ব্রাজিল আগের মতো আতঙ্কিত হয়ে পড়েনি। ভিনিসিয়ুস জুনিয়র, রদ্রিগো আর রিচার্লিসনরা তখন নিজেদের সামর্থ্য জানান দিচ্ছিলেন। দক্ষিণ কোরিয়ার বিপক্ষে ৪-১ গোলের জয়ে নেইমারকে দেখা গিয়েছিল একজন মেন্টর বা বড় ভাইয়ের ভূমিকায়। কিন্তু ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে সেই টাইব্রেকার ভাগ্য আবারও তাকে কান্নায় ভাসায়।
এখন প্রশ্ন হলো, ২০২৬ বিশ্বকাপে নেইমার কি আদৌ থাকবেন? বয়স আর চোটের কারণে তিনি আগের সেই নেইমার নেই। ভিনিসিয়ুস জুনিয়র এখন রিয়াল মাদ্রিদের হয়ে ইউরোপ শাসন করছেন, তরুণ এনড্রিকের মধ্যে আগামীর পেলের ছায়া দেখা যাচ্ছে। ব্রাজিল কি তবে নেইমারের ছায়া থেকে পুরোপুরি বেরিয়ে এসেছে? নেইমার কি পাবেন বিশ্বকাপ জিতে ক্যারিয়ারের অপূর্ণতা ঘোচানোর সুযোগ? উত্তরের জন্য আর কয়েকটি দিন অপেক্ষা করতেই হচ্ছে।






