কৃষকের আর্তনাদ
না কাটলে ডুবছে, কাটলে পচছে

ছবি: আগামীর সময়
টানা বৃষ্টি, ঝড়ো হাওয়া ও বজ্রপাতের আতঙ্কের মধ্যেই সুনামগঞ্জের হাওরাঞ্চলে ফসল রক্ষায় মরিয়া হয়ে ওঠেছেন কৃষকরা। হাঁটু থেকে বুকসমান পানিতে নেমে ধান কাটার চেষ্টা করলেও রোদের অভাবে খলায় রাখা ধান পঁচে নষ্ট হচ্ছে। আবার না কাটলে পানিতে তলিয়ে যাচ্ছে পাকা ফসল—দুই দিকেই চরম বিপাকে পড়েছেন কৃষকরা।
জেলার বিভিন্ন হাওরে দেখা গেছে একই চিত্র। বিশেষ করে মধ্যনগর ও শাল্লা উপজেলায় জলাবদ্ধতায় ক্ষতি হয়েছে সবচেয়ে বেশি। ইতোমধ্যে মধ্যনগরে বাঁধ ভেঙে ইকরাছই হাওরের পাকা ধান তলিয়ে গেছে পানিতে। এছাড়া গত দুই দিনের টানা বৃষ্টিতে জেলার ১০টি উপজেলার নীচু জমির ধান গেছে ডুবে।
সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার দেখার হাওরের একাংশেও মঙ্গলবার ভোর থেকে কৃষকরা পানিতে ডুবে যাওয়া ধান তুলতে পার করেছেন ব্যস্ত সময়। মোল্লাপাড়া ইউনিয়নের আব্দুল্লাপুর গ্রামের কৃষক আলা উদ্দিন মিয়া বলছিলেন, ‘১৫ কেয়ার জমিতে করছিলাম ধান। সাত কেয়ার কেটেছি, কিন্তু খলায় পঁচে যাচ্ছে। বাকি সাত কেয়ার গেছে পানিতে তলিয়ে।’
একই এলাকার কৃষক আব্দুস ছাত্তারের ভাষ্য, বজ্রপাতের ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও কেউ হাওর ছেড়ে যেতে পারছেন না। ফসল বাঁচাতে সবাই চালিয়ে যাচ্ছেন প্রাণপণ চেষ্টা।
সুনামগঞ্জ সদর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা শাহাদাত হোসেন জানালেন, মাত্র দুই দিনের বৃষ্টিতে ৫০৫ হেক্টর জমি ডুবে গেছে জলাবদ্ধতায়। বৃষ্টি অব্যাহত থাকলে ক্ষতির পরিমাণ বাড়বে আরও।
নলুয়ার হাওরেও বিরাজ করছে একই পরিস্থিতি। দাসনোয়াগাঁও গ্রামের কৃষক সারদা চরন দাস বলছিলেন, ১৬ কেয়ার জমির মধ্যে মাত্র এক কেয়ার ধান তুলতে পেরেছেন, বাকিগুলো তলিয়ে গেছে পানিতে। হতাশা নিয়ে তিনি বলছিলেন, ‘ধার-দেনা করে চাষ করেছি, এখন সব শেষ। কীভাবে চলব বুঝতে পারছি না।’
চিলাউড়া হলদিপুর ইউনিয়নের সদস্য রনধির দাস জানিয়েছেন, শ্রমিক সংকট ও আগাম জলাবদ্ধতার কারণে অনেক কৃষক সময়মতো পারেননি ধান কাটতে। গত দুই দিনের বৃষ্টিতে অন্তত দেড় থেকে দুই হাজার হেক্টর জমির ফসল তলিয়ে গেছে বলে তার ধারণা।
ধর্মপাশা উপজেলার বিভিন্ন হাওরেও দেখা গেছে করুণ চিত্র। অনেক কৃষক ছেড়ে দিয়েছেন পানিতে তলিয়ে যাওয়া জমির ধান কাটার আশা। অন্যদিকে, রোদের অভাবে শুকাতে না পারায় পঁচে যাচ্ছে কাটা ধান।
নেত্রকোনার মোহনগঞ্জের কৃষক আলাল মিয়া জানাচ্ছিলেন, ৩০ মণ ধান সংগ্রহ করলেও বৃষ্টির কারণে শুকাতে না পেরে তা নষ্ট হওয়ার উপক্রম। একইভাবে অনেক কৃষক পরিবহন সংকট ও খারাপ যোগাযোগ ব্যবস্থার কারণে বাধ্য হচ্ছেন হাওরেই ধান ফেলে রাখতে।
অন্যদিকে, মধ্যনগর উপজেলার বংশীকুন্ডা দক্ষিণ ইউনিয়নে একটি খালের বাঁধ ভেঙে হাওরে পানি ঢুকে নতুন করে তৈরি হয়েছে সংকট। এতে ইয়ারন বিলসহ আশপাশের এলাকায় পাকা ও আধাপাকা ধান দেখা দিয়েছে তলিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা।
কৃষি বিভাগ জানাচ্ছে, এ বছর সুনামগঞ্জে ধান চাষ হয়েছে ২ লাখ ২৩ হাজার ৫১১ হেক্টর জমিতে। ইতোমধ্যে কয়েক দফা বৃষ্টিতে হাজার হাজার হেক্টর জমির ফসল হয়েছে ক্ষতিগ্রস্ত।
কৃষকদের আশঙ্কা, দ্রুত আবহাওয়া স্বাভাবিক না হলে এবং বাঁধ মেরামতের উদ্যোগ না নেওয়া হলে ব্যাপক ক্ষতি হতে পারে চলতি মৌসুমে হাওরাঞ্চলের বোরো ফসলের।



