আর্জেন্টিনাকে বিশ্বকাপে তোলা সেই ফুটবলার এখন কৃষক

সংগৃহীত ছবি
২০০৯ সালের ১৪ অক্টোবর। উরুগুয়ের বিপক্ষে বিশ্বকাপ বাছাইপর্বের গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচ। হাতে সময় খুব বেশি নেই। আর্জেন্টিনার কোচ ডিয়েগো ম্যারাডোনা মাঠে নামালেন মারিও বোলাত্তিকে। গঞ্জালো হিগুয়েইনের বদলি হিসেবে নামার মাত্র কয়েক মিনিট পরই গোল করলেন এই মিডফিল্ডার। তার গোলে উরুগুয়েকে ১-০ ব্যবধানে হারিয়ে ২০১০ বিশ্বকাপ নিশ্চিত করে আর্জেন্টিনা।
জাতীয় দলের হয়ে সেটিই ছিল বোলাত্তির একমাত্র গোল। সেই গোল তাকে আর্জেন্টিনার মানুষের কাছে পরিচিত করে তুলেছিল। কিন্তু ১৭ বছর পর তার জীবন পুরোপুরি বদলে গেছে। ফুটবল ছেড়ে এখন পরিবারের সঙ্গে কৃষি ও পশুপালনের ব্যবসায় যুক্ত ৪১ বছর বয়সী সাবেক এই ফুটবলার।
১৯৮৫ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি আর্জেন্টিনার কর্দোবা প্রদেশের লা পারা শহরে জন্ম বোলাত্তির। কৃষির সঙ্গে তার পরিবারের দীর্ঘদিনের সম্পর্ক। ২০০৩ সালে বেলগ্রানো দিয়ে পেশাদার ফুটবলে অভিষেক হয় তার। ২০০৭ সালে যোগ দেন পর্তুগিজ ক্লাব পোর্তোয়। ক্লাবটির হয়ে ২০০৭-০৮ মৌসুমে পর্তুগিজ লিগও জেতেন তিনি। তবে পোর্তোয় কাটানো সময় নিয়ে সন্তুষ্ট ছিলেন না বোলাত্তি। ২০২০ সালে ইনফোবায় দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, ব্যক্তিগত দিক থেকে পোর্তোয় যাওয়া তার জন্য খুব খারাপ সিদ্ধান্ত ছিল।
আর্জেন্টিনায় ফিরে হুরাকানে যোগ দেন বোলাত্তি। সেখানেই ক্যারিয়ারের সেরা সময় কাটান তিনি। হুরাকানের সেই পারফরম্যান্সই জাতীয় দলে খেলার দরজা খুলে দেয় বোলাত্তির জন্য। ২০০৯ সালের ১২ আগস্ট রাশিয়ার বিপক্ষে প্রীতি ম্যাচে ম্যারাডোনার অধীনে আর্জেন্টিনা দলে অভিষেক হয় তার। মস্কোর সেই ম্যাচে ৩-২ গোলে জিতেছিল আর্জেন্টিনা।
এরপর আসে বোলাত্তির জীবনের সবচেয়ে স্মরণীয় রাত। ২০০৯ সালের ১৪ অক্টোবর উরুগুয়ের মাঠে বিশ্বকাপ বাছাইপর্বের শেষ ম্যাচে জিতলেই বিশ্বকাপ নিশ্চিত হতো আর্জেন্টিনার। হিগুয়েইনের বদলি হিসেবে নেমে দ্বিতীয়ার্ধের ৩৯ মিনিটে গোল করেন বোলাত্তি। তার গোলেই ১-০ ব্যবধানে জিতে দক্ষিণ আফ্রিকা বিশ্বকাপে জায়গা করে নেয় আর্জেন্টিনা।
সেই গোলটি নিয়ে বোলাত্তি বলেন,‘ওই গোলটি করতে পেরেছিলাম এটা আমার সৌভাগ্য। গোলটি ইতিহাসের অংশ হয়ে গেছে।‘
সেই গোলের সুবাদেই ২০১০ বিশ্বকাপের দলে জায়গা পান বোলাত্তি। দক্ষিণ কোরিয়ার বিপক্ষে বদলি হিসেবে খেলেন কয়েক মিনিট। গ্রিসের বিপক্ষে ছিলেন শুরুর একাদশে। লিওনেল মেসি, কার্লোস তেভেস, হুয়ান সেবাস্তিয়ান ভেরন ও সার্জিও আগুয়েরোর মতো তারকাদের সঙ্গে একই দলে খেলেছেন তিনি। মেসিকে নিয়ে বোলাত্তির মন্তব্য, ‘সে আমাদের দলেরই একজন ছিল।’ জার্মানির কাছে কোয়ার্টার ফাইনালে হেরে বিদায়ের পর দলের ড্রেসিংরুমে বিষণ্নতার কথাও মনে আছে তার। ২০১১ সালে কয়েকটি প্রীতি ম্যাচ খেলার পর জাতীয় দলের হয়ে ১২ ম্যাচে একটি গোল করে অধ্যায় শেষ করেন বোলাত্তি।
ম্যারাডোনার প্রতিও বোলাত্তির রয়েছে বিশেষ শ্রদ্ধা, ‘তিনি দলের জন্য সবকিছু দিতেন। খুব প্রাণবন্ত, দয়ালু এবং সবার প্রতি যত্নশীল ছিলেন।’
বিশ্বকাপের পর ফিওরেন্তিনা, ইন্টারন্যাসিওনাল, রেসিং ক্লাব ও বোটাফোগোর মতো দলে খেলেছেন বোলাত্তি। পরে ফিরে যান নিজের পুরোনো ক্লাব বেলগ্রানোতে। তবে দ্বিতীয় দফায় সেখানে সময়টা ভালো কাটেনি। ২০১৭ সালের প্রাক-মৌসুম প্রস্তুতির পর কোচ লিওনার্দো মাদেলনের সঙ্গে সম্পর্কের অবনতি হয় তার। ‘আমি ভালোভাবে ক্লাব ছাড়তে পারিনি,’ স্বীকার করেছিলেন বোলাত্তি।
২০১৮ সালের এপ্রিলে করিয়েন্তেসের ক্লাব বোকা উনিদোসের হয়ে শেষ পেশাদার ম্যাচ খেলেন তিনি। মাত্র ৩৩ বছর বয়সেই ফুটবলকে বিদায় জানান। শারীরিক সক্ষমতা নয়, মানসিক ক্লান্তিই ছিল অবসরের মূল কারণ। লা নাসিওনকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘৩৩ বছর বয়সে সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম, কারণ মানসিকভাবে আমি ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলাম।’
ফুটবল ছাড়ার পরও খেলাটির সঙ্গে যুক্ত থাকার চেষ্টা করেছেন বোলাত্তি। ২০২১ সালে হুরাকানের ক্রীড়া বিভাগ পরিচালনার দায়িত্ব নিয়ে ডেভিড গারসনের প্রকল্পে যোগ দেন। তবে আগের আলোচনা অনুযায়ী সবকিছু না হওয়ায় বেশিদিন টেকেনি সেই অভিজ্ঞতা। ২০২২ সালে জেনারেল পাস জুনিয়র্সের হয়ে আর্জেন্টিনার আঞ্চলিক অপেশাদার টুর্নামেন্টেও অল্প সময়ের জন্য খেলেন।
বর্তমানে কর্দোবা শহরে বসবাস করেন বোলাত্তি। সেখান থেকে প্রায় ১৫০ কিলোমিটার দূরের নিজের জন্মস্থান লা পারার সঙ্গে রয়েছে তার যোগাযোগ। পরিবারের কৃষি ও পশুপালনের ব্যবসায় যুক্ত তিনি। চাকোর অঞ্চলে জমি ও খামারকেন্দ্রিক এই ব্যবসায় তার বাবা কৃষক, আর ভাই কৃষিবিদ।
নিজের ভূমিকা সম্পর্কে বোলাত্তি বলেন, ‘আমি অনেকটা বিনিয়োগকারীর মতো।’ মাসে একবার বাবার সঙ্গে খামারে যান তিনি। কোচিংয়ের লাইসেন্স থাকলেও আপাতত কোচ হওয়ার ইচ্ছা নেই তার। তবে অংশীদারদের সঙ্গে মিলে ফুটবল স্কুলসহ একটি ক্রীড়া কমপ্লেক্স গড়ে তোলার বিষয়ে আলোচনা করছেন। ক্রীড়া ব্যবস্থাপনার প্রতিও আগ্রহ রয়েছে তার।
ফেলে আসা ক্যারিয়ারের দিকে ফিরে তাকিয়ে বোলাত্তির উপলব্ধি, ‘পেছনে ফিরে তাকালে মনে হয়, আমার ক্যারিয়ারটা দারুণ ছিল।’



