মরিনহোই ছিলেন ইউনাইটেডে ফার্গুসনের উত্তরসূরি

স্যার অ্যালেক্স ফার্গুসনের বিশাল সাম্রাজ্য সামলাবেন কে? ২০১৩ সালে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের ডাগ আউট থেকে তিনি সরে দাঁড়ানোর পর প্রশ্নটা ছিল গোটা ফুটবল বিশ্বের। তার উত্তরসূরি হিসেবে বেছে নেওয়া হয় ডেভিড ময়েসকে। ব্রিটিশ মিডিয়া সেসময় জানিয়েছিল, ফার্গুসনের পছন্দেই ময়েসকে নিয়োগ। খবরটা ভুল ছিল না, কিন্তু ময়েসই কি প্রথম পছন্দ ছিলেন? ১৩ বছর পর এই প্রশ্নের উত্তর মিলল। নেটফ্লিক্সের তথ্যচিত্রে উঠে এসেছে বিস্ময়কর তথ্য।
ওল্ড ট্র্যাফোর্ডে ফার্গুসনের উত্তরসূরি হওয়ার কথা ছিল জোসে মরিনহোর। ২০১৩ সালে চুক্তিও সেরে নিয়েছিলেন পর্তুগিজ কোচ। কিন্তু শেষ পর্যন্ত রেড ডেভিলদের দায়িত্ব নেওয়া হয়নি তার। কেন ইউনাইটেডের চাকরি করেননি তিনি— উঠে এসেছে তাকে নিয়ে বানানা নেটফ্লিক্সের তথ্যচিত্র ‘মরিনেহো’তে। যেখানে পর্তুগিজ কোচ এটাও জানিয়েছেন, রিয়াল মাদ্রিদে ‘বিগড়ে যাওয়া’ সংস্কৃতি গড়ে তুলেছিলেন ইকের কাসিয়াস।
২০১৩ সালে ফার্গুসনের উত্তরসূরি হিসেবে ইউনাইটেডের দায়িত্ব নিয়ে ভরাডুবি ময়েসের। আগের মৌসুমে শিরোপা জেতা দলটি সাতে থেকে মৌসুম শেষ করে, ফলে মাত্র ১০ মাসেই বরখাস্ত ময়েস। গত একযুগে ঘরোয়া ও ইউরোপীয় দুই মঞ্চেই ইউনাইটেডের ক্রমাগত পতনের পেছনে তার সেই ব্যর্থ সময়কেই টার্নিং পয়েন্ট হিসেবে দেখেন অনেকে। তবে ইতিহাস ভিন্নও হতে পারত, যদি ফার্গুসনের প্রথম পছন্দের উত্তরসূরি মরিনহোকে ইউনাইটেডে আনা সম্ভব হতো।
নেটফ্লিক্সের তথ্যচিত্রে মরিনহো বলেছেন, ‘আমি যখন রিয়াল মাদ্রিদ ছাড়ি, তখন স্যার অ্যালেক্সের (ফার্গুসন) পর ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডে যাওয়ার জন্য চুক্তি করেছিলাম।’
ফার্গুসনও নিশ্চিত করেছেন, ইউনাইটেডের প্রস্তাব গ্রহণ করেছিলেন মরিনহো, ‘আমার দৃষ্টিতে, সে প্রস্তাবটি গ্রহণ করেছিল। কিন্তু কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই সবকিছু বদলে গেল।’ কীভাবে ঘটল সব, সেই বর্ণনা উঠে এসেছে ফার্গুসনের পরের কথায়, “এক রাতে সে (মরিনহো) আমাকে ফোন করে কান্নাকাটি করছিল। সে বলল, ‘অ্যালেক্স, আমি এটা করতে পারব না। আমি চেলসিকে কথা দিয়েছি। আমি আমার কথা ভাঙতে পারব না।’ সে যে কারণটি বলেছিল, বুঝতে পেরেছিলাম। তবে আমি হতাশ হয়েছিলাম।”
ইউনাইটেডের চাকরি, ফার্গুসনের উত্তরসূরি হওয়া যেকোনো কোচের জন্য ছিল বিশাল সম্মান ও আকর্ষণের। কিন্তু মরিনহোকে সেসব টানেনি। কারণটা ব্যাখ্যা করেছেন তিনি এভাবে, ‘ফুটবলের প্রতি ভালোবাসা এক জিনিস, আর একটি নির্দিষ্ট ক্লাবের প্রতি ভালোবাসা আরেক জিনিস। মূলত রিয়াল মাদ্রিদের পর আমার প্রয়োজন ছিল এমন একটা অনুভূতির, যেখানে আমি ভালোবাসা পাচ্ছি।’
মরিনহোর কাছে সেই ভালোবাসার জায়গা ছিল চেলসি। পুরনো ঠিকানায় ফিরে ২০১৪-১৫ মৌসুমে জেতেন ব্লুদের হয়ে নিজের তৃতীয় লিগ শিরোপা। যদিও পরের মৌসুমেই বরখাস্ত। এরপরই অপূর্ণ সেই গল্প পূর্ণতা পায়। ২০১৬ সালে মিলে যায় ইউনাইটেডের সঙ্গে মরিনহোর পথ। তার অধীনে দলটি জেতে ইউরোপা লিগ ও লিগ কাপ শিরোপা।
কাসিয়াসের সঙ্গে কী হয়েছিল মরিনহোর
নেটফ্লিক্সের এই তথ্যচিত্রে আরও অনেক বিষয়ের মধ্যে কাসিয়াসের সঙ্গে মরিনহোর শীতল সম্পর্ক ও রিয়াল মাদ্রিদের ড্রেসিং রুমের অস্থিরতাও বেরিয়ে এসেছে। দ্বিতীয় দফায় মাদ্রিদের ক্লাবটির কোচ হয়েছেন ৬৩ পেরোনো ‘স্পেশাল ওয়ান’। আগের দফায় ছিলেন ২০১০ থেকে ২০১৩ পর্যন্ত। সেসময় মাদ্রিদের অধিনায়ক ও কিংবদন্তি কাসিয়াসের সঙ্গে মুখ দেখাদেখি বন্ধ ছিল তার। বার্নাব্যুতে ২৫ বছরে ৭৫২ ম্যাচ খেলা কাসিয়াসকে বেঞ্চে বসিয়ে রেখেছিলেন ম্যাচের পর ম্যাচ। কারণ হিসেবে উঠে এসেছিল বার্সেলোনায় খেলা স্পেন জাতীয় দলের সতীর্থদের সঙ্গে কাসিয়াসের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক।
তথ্যচিত্রে কাসিয়াসের বক্তব্য, ‘জোসে (মরিনহো) ও আমার মধ্যে সম্পর্কটা খুবই শীতল ছিল। সেই বছরগুলোতে আমার মনে হয়েছে, পরিস্থিতি এমন এক সীমায় নিয়ে যাওয়া হয়েছিল, যেখানে শেষ পর্যন্ত সম্পর্কের সুতো ছিঁড়ে যায়।’
রিয়ালের সাবেক মিডফিল্ডার সামি খেদিরার দাবি, এই দ্বন্দ্ব দলের বড় তারকাদের বিরুদ্ধে দাঁড় করিয়ে দিয়েছিল মরিনহোকে, ‘সত্যি বলতে, ড্রেসিংরুমটা একটা দুঃস্বপ্নে পরিণত হয়েছিল। মরিনহোর সঙ্গে অনেক খেলোয়াড়ের সম্পর্ক নষ্ট হয়ে যায়। তার মধ্যে ক্রিস্তিয়ানো (রোনালদো), স্প্যানিশ খেলোয়াড়েরা- কাসিয়াস, সের্হিয়ো রামোসরা ছিল।’
ওই পরিস্থিতি যেভাবে সামলেছিলেন, তা নিয়ে মরিনহোর কোনো অনুশোচনা নেই। বরং তার মতে, কাসিয়াসের আচরণ রিয়াল মাদ্রিদে তৈরি করেছিল এক ধরনের অতিরিক্ত সুবিধা পাওয়ার মানসিকতা।
মরিনহো পুরো ব্যাপারটির ব্যাখ্যা করেছেন এভাবে, “অধিনায়ক কাসিয়াসের সঙ্গে প্রথম তিনবার আমার কথা হয়েছিল এমন: প্রথমবারই সে আমাকে বলেছিল, ‘জাতীয় দলের খেলোয়াড়দের জন্য আমি আরও কয়েক দিনের ছুটি চাই।’ দ্বিতীয়বার সে বলেছিল, ‘আপনি কি অনুশীলনের সময় এক ঘণ্টা পিছিয়ে দিতে পারেন? কারণ আপনি যে সময়ে অনুশীলন করতে চান, তখন মাদ্রিদে প্রচণ্ড যানজট থাকে।’ তৃতীয়বার সে এসে বলেছিল, ‘আমরা হোটেলে যেতে চাই না। ম্যাচের দিন সরাসরি স্টেডিয়ামে গিয়ে দেখা করতে চাই এবং সেখানেই ম্যাচ খেলতে চাই।’ অল্প সময়ের মধ্যেই আমি বুঝতে পারলাম, তারা অতিরিক্ত সুবিধায় অভ্যস্ত হয়ে গেছে।”
বার্সেলোনার খেলোয়াড়দের সঙ্গে কাসিয়াসের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক নিয়ে গুঞ্জন ছিল— এ ব্যাপারেও মরিনহো স্বভাবসুলভ অকপট, ‘আমি বলেছিলাম, এটা বার্সেলোনা-রিয়াল মাদ্রিদ। জাতীয় দলে গেলে তুমি ওই খেলোয়াড়কে জড়িয়ে ধরতে পারো, কিন্তু এখন নয়। এখন এটা যুদ্ধ।’






