বাজে ফিল্ডিংয়ে জয় হাতছাড়া
- এক টেস্টে ৯ ডিসমিসাল ও দুই ইনিংসে পঞ্চাশ ছাড়ানো স্কোর করা প্রথম উইকেটরক্ষক হিসেবে বিশ্ব রেকর্ড গড়েছেন লিটন
- শেষ ইনিংসে সর্বোচ্চ ওভার খেলার তালিকায় চতুর্থ অবস্থানে আফগানিস্তান। বাংলাদেশের বিপক্ষে তারা ১৪২ ওভার খেলেছেন
- ম্যাচের ১৩১তম ওভারে কায়েসের সুইপে ক্যাচটি হাতে রাখতে পারেননি হাসান। সেই কায়েসই টিকে ছিলেন শেষ পর্যন্ত

তাইজুল ইসলামের বলটি ডিপ মিডউইকেট দিয়ে সীমানাছাড়া করে আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশে মাটিতে সেজদায় লুটিয়ে পড়লেন কায়েস আহমেদ। তার ছক্কায় শেষ বলে ম্যাচটি জিতে যায়নি আফগানিস্তান, নতুন কোনো রেকর্ডও হয়নি। যেটা হয়েছে, সেটা অবিশ্বাস্য। দ্বিতীয় ইনিংসে ১৪২ ওভার ব্যাটিং করে আবুধাবি টেস্টে হার এড়িয়েছে আফগানিস্তান, ৮ উইকেট হারিয়ে ফেললেও শেষদিকে কায়েস ও জিয়া উর রহমানের অবিচল দৃঢ়তায় জিততে দেয়নি বাংলাদেশকে।
প্রথম ইনিংসে আফগানদের ব্যাটিংয়ের শেষের অংশটি ছিল তাসের ঘর, ২১ রানে শেষ ৬ উইকেট হারিয়েছিল তারা। দ্বিতীয় ইনিংসে সেই তাসের ঘর বদলে গেল চীনের প্রাচীরে। মাত্র ৪ রান করলেও ইসমাত আমিন উইকেটে ছিলেন ৮৫ মিনিট, খেলেছেন ৬০ বল। ইয়ামিন আহমেদজাই উইকেটে ছিলেন ১১৯ মিনিট, ৮৫ বল খেলে করেছেন ১৯ রান। কায়েস আহমেদের ইনিংসের স্থায়িত্ব ৮৬ মিনিট, খেলেছেন ৮০ বল, আর জিয়া উর রহমান শেষ সময়ে ব্যাটিংয়ে নেমে ১৭ মিনিট টিকে থেকেছেন কোনো রান না করে। এই চারজন আফগানিস্তানের ব্যাটিং লাইনআপের সবচেয়ে নিচের চার ব্যাটার!
৪৭৯ রান তাড়া করা অসম্ভবের পেছনে ছোটেনি আফগানরা। বরং বেছে নিয়েছে ধৈর্যের পরীক্ষা দেওয়ার রাস্তা। আবুধাবির গরমে বোলারদের হতাশ করেছেন ওভারের পর ওভার উইকেটশূন্য রেখে। সাদিকুল্লাহ আতাল ২২ গজে অটল হয়েই ছিলেন পঞ্চম দিনে। প্রথম টেস্ট সেঞ্চুরির ইনিংসের স্থায়িত্ব ৫১৪ মিনিট, খেলেছেন ৩৩২ বল, রান করেছেন ১১১। কে বলবে, ক্যারিয়ারের মাত্র তৃতীয় টেস্ট খেলেছেন এই আফগান ওপেনার!
লিটন দাস এই টেস্টে ৯টি ডিসমিসাল করে বিশ্বরেকর্ড গড়েছেন। অথচ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তেই স্টাম্পিং মিস করেছেন লিটন, এটাই নিয়তির পরিহাস। আতালের রান যখন ৭০, তখন তাইজুল ইসলামের বলে ডাউন দ্য উইকেটে এসেছিলেন, ব্যাটে-বলে সংযোগ হয়নি। লিটন প্রথম সুযোগে বল ধরতে পারেননি, ভাঙতে পারেননি স্টাম্প। তাতে করে লিটনের ১০ ডিসমিসালের সঙ্গে হয়তো বাংলাদেশের জয়ের পথটাও পরিষ্কার হয়ে যেত। ৯টি ডিসমিসাল, প্রথম ইনিংসে হাফসেঞ্চুরির পর দ্বিতীয় ইনিংসে সেঞ্চুরি; এত এত প্রাপ্তির ম্যাচে লিটনের আক্ষেপ হয়ে থাকবে এই একটি ভুল।
ক্যাচ পড়েছে দুই তরফেই, তানজিদ হাসান তামিমের পর হাসান মাহমুদও ফেলেছেন সহজ ক্যাচ। ম্যাচের ১৩১তম ওভারে কায়েসের সুইপে মিডউইকেটে ক্যাচটি হাতে রাখতে পারেননি হাসান, কায়েসের রান তখন ২৮। সেই কায়েসই টিকে ছিলেন শেষ পর্যন্ত। তবে বাংলাদেশকে আক্ষেপে পোড়াবে পরপর দুই বলে দুটি রানআউটের সুযোগ হাতছাড়া করাটা। দুই রান নিতে গিয়ে একই প্রান্তে চলে এসেছিলেন কায়েস ও ইয়ামিন, শান্ত বল কুড়িয়ে থ্রো করেন বোলারের প্রান্তে। নাঈম নিজে আন্ডারআর্ম থ্রো করে স্টাম্প ভাঙতে গিয়ে মিস করেন, অথচ পাশেই দাঁড়ানো মিরাজকে বলটি দিলেই রানআউট হয়। ঠিক পরের বলেও রানআউটের সুযোগ এসেছিল, কিন্তু সেটি কাজে লাগাতে পারেনি বাংলাদেশ।
অন্যদিকে আফগানরা নিয়মের ভেতরে থেকে যতভাবে সময় নষ্ট করা যায়, সব সুযোগই নিয়েছে। তাইজুলের বলে ফ্রন্টফুটে ডিফেন্স করার পর কায়েস আহমেদ যেভাবে পায়ে টান লাগার ভঙ্গি করে শুয়ে পড়লেন এবং গড়াগড়ি খেয়ে সময় নষ্ট করছিলেন, তাতে করে ২০২৪ সালে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে গুলবাদিন নায়েবের সময়ক্ষেপণের নাটকের কথাই ধারাভাষ্যকারদের কণ্ঠে ঘুরেফিরে আসছিল। একবার কায়েস সাইট স্ক্রিন ঠিক করার অজুহাতে বল ডেলিভারির পর সরে গেলেন স্টাম্প থেকে। কিছুক্ষণ সাইট স্ক্রিন নিয়ে ডান-বাম চলল। এভাবে শেষ আধঘণ্টায় যতভাবে পেরেছেন সময় নষ্ট করেছেন আফগানরা। শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশকে আরও দুটি উইকেট তুলে নেওয়ার সুযোগটি দেয়নি কাবুলিওয়ালারা, ১৪২ ওভার ব্যাটিং করে আবুধাবি টেস্টে হার এড়িয়েছে তারা, যেটি নিঃসন্দেহে জয়ের সমান।
বাংলাদেশের অধিনায়ক শান্তর কাছে এই ফল স্বাভাবিকভাবেই অপ্রত্যাশিত, ‘এই ফলাফল হতাশাজনক। তবে তারা দুর্দান্ত খেলেছে। আমরা সুযোগের সদ্ব্যবহার করতে পারিনি। পেসাররা বেশ ভালো বল করেছে; আশা ছিল স্পিনাররাও ভালো বোলিং করবে। তারা চেষ্টা করলেও আফগানিস্তান দারুণ ক্রিকেট খেলেছে।’ ম্যাচসেরার পুরস্কার নিতে এসে লিটনও বলে গেছেন, ‘আমরা জিততে চেয়েছিলাম, তবে ক্রিকেটে সবসময় সবকিছু হয় না।’ তাই কিপিংয়ে বিশ্বরেকর্ড আর দারুণ ব্যাটিংয়ের পরও দলকে জিততে না দেখার সাক্ষী হয়েই থাকলেন লিটন।



