ভারতের সাকিব যেন ‘মোস্তাফিজের ডানহাতি সংস্করণ’

সাকিব হুসেইনকে মোস্তাফিজুর রহমানের সঙ্গে তুলনা করেছেন মিচেল ম্যাকক্লেনাঘান।
আইপিএলের প্রতি আসরেই একের পর এক নতুন তারকার আবির্ভাব ঘটে। চলতি আসরও তার ব্যতিক্রম নয়। গত সোমবার রাজস্থান রয়্যালসের বিপক্ষে অভিষেক ম্যাচে ২৪ রানে ৪ উইকেট নিয়ে হৈচৈ ফেলে দিয়েছেন সাকিব হুসাইন। তবে বিহারের গোপালগঞ্জ থেকে আসা এই পেসারের গল্পটি শুধু তারকা হওয়ার নয়, এটি এক পরিবারের অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই। দারিদ্র্যের সঙ্গে এক অসম্ভব লড়াইয়ে জয়ী হয়ে তিনি এই পর্যায়ে উঠে এসেছেন।
রাজস্থান ম্যাচ শেষে আলোচনায় চলে আসে সাকিবের অফ-কাটার। কিউই কিংবদন্তি মিচেল ম্যাকক্লেনাঘান সাকিবের বোলিং বিশ্লেষণ করতে গিয়ে বাংলাদেশি তারকা মোস্তাফিজুর রহমানের প্রসঙ্গ টেনে আনেন, ‘এই নির্ভীক প্রতিভা সাকিব হুসাইনকে দেখে মনে হচ্ছে ও দারুণ প্রতিভাবান। রান তাড়ায় শুরুতে নতুন বলে জশস্বী জয়সওয়ালের বড় উইকেটটিও তুলে নিল। পরে যেভাবে ও ধীরগতির অফ-কাটারগুলো ব্যবহার করল এবং নিখুঁতভাবে সেগুলো কাজে লাগাল, তা সবাইকে অবাক করে দিয়েছে। ওর স্লোয়ারগুলো অনেকটা মোস্তাফিজুর রহমানের কথা মনে করিয়ে দেয়। সত্যি বলতে, ও যেন মোস্তাফিজেরই এক ডানহাতি সংস্করণ।’
সাকিবের শৈশব কেটেছে ভয়াবহ দারিদ্র্যের মধ্যে। যেখানে দুবেলা দুমুঠো ভাত জোগানোই ছিল বড় চ্যালেঞ্জ, সেখানে দামি ক্রিকেট সরঞ্জাম কেনা ছিল আকাশকুসুম কল্পনা। সেই দিনগুলোর কথা মনে করে সাকিব বলেন, ‘আমার হারানোর কিছু ছিল না, যা পাওয়ার ছিল সব এখানেই। জেদ ছিল, যা করার এখানেই করব এবং নিজের সেরাটা দেব। ক্রিকেটের এক জোড়া ভালো স্পাইক জুতার দাম ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকা। আমার বাবার কাছে যদি সেই জুতার আবদার করতাম, তাহলে টাকা জোগাতে গিয়ে আমাদের পরের বেলার খাবার জুটত না। জুতা কিনলে আমরা খাব কী? এই প্রশ্নটাই বড় হয়ে দাঁড়াত।’
সাকিবের এই কঠিন সময়ে দেবদূতের মতো পাশে দাঁড়িয়েছিলেন তার মা সুবুকতারা খাতুন। ছেলের আকুতি দেখে নিজের শেষ সম্বলটুকু বিলিয়ে দিতে দ্বিধা করেননি তিনি। সেই আবেগঘন মুহূর্তের স্মৃতিচারণ করে টাইমস অব ইন্ডিয়াকে সুবুকতারা খাতুন বলেন, ‘একদিন সাকিব আমার কাছে এসে বলল, “মামণি, আমার তো স্পাইক নেই। জুতা ছাড়া আমি কীভাবে ক্রিকেট খেলা চালিয়ে যাব?” আমার কাছে স্পাইক কেনার মতো কোনো টাকা ছিল না। কিন্তু ছেলের চোখের পানি সহ্য করতে পারিনি। শেষ পর্যন্ত নিজের গয়নাগুলো বিক্রি করে দিয়েছিলাম ওর জুতার টাকা জোগাতে!”
অন্যদিকে সাকিবের বাবা আলী আহমেদ হুসাইন পেশায় ছিলেন কৃষক। কিন্তু হাঁটুতে গুরুতর আঘাতের কারণে তিনি কাজ করার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছিলেন। তার পঙ্গুত্ব যখন পরিবারকে গ্রাস করছিল, তখন ছেলেকে ক্রিকেটে পাঠানো ছিল এক জুয়া খেলার মতো। আলী আহমেদ বলেন, ‘শারীরিক অসুস্থতার কারণে তখন একবেলা খাবার জোগানোই আমাদের জন্য কঠিন হয়ে পড়েছিল। ও (সাকিব) খুব কঠোর পরিশ্রম করে। তাই আমরা ওর ওপর আমাদের সবটুকু বাজি ধরার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম। এটা শুধু আশা ছিল না, এটা ছিল একটা বড় ঝুঁকি।’
পাওয়ার প্লে এবং ডেথ ওভার—দুই ক্ষেত্রেই অধিনায়কের আস্থার প্রতিদান দিয়েছেন সাকিব। বর্তমানে ১৪০ কিলোমিটার গতিতে নিয়মিত বল করা এই তরুণ এখন আরও বড় স্বপ্ন দেখছেন। আত্মবিশ্বাসী সাকিব বলেন, ‘এখন আমি ঘণ্টায় ১৪০ কিলোমিটারের বেশি গতিতে বল করতে পারছি। কঠোর পরিশ্রম চালিয়ে যাচ্ছি। আমি আত্মবিশ্বাসী যে, পরের মৌসুমেই আমি ১৫০ কিলোমিটার গতির মাইলফলক পার করে ফেলব।’

