ভাঙছে অস্ট্রেলিয়ার গর্বের সৌধ
- অস্ট্রেলিয়া: ১৯৮/১০ ও ১৬১/৪
- বাংলাদেশ: ৪২৬/১০

মেহেদী মিরাজ: ফিফটি ও এক উইকেট
হাসান মাহমুদের করা বলটায় ব্যাট চালিয়ে টেনে আনলেন স্টাম্পে। ঠিক প্রথম ইনিংসের আউট হওয়ার মতো করেই ইনসাইড এজ হয়ে বোল্ড ট্রাভিস হেড। এ রকম পরিস্থিতিতে ব্যাটাররা কেউ ব্যাট দিয়ে স্টাম্প ভেঙে হতাশা বা রাগ ঝাড়েন, কেউ ড্রেসিংরুমে ঢুকে হেলমেটটা ছুড়ে মারেন, কেউ ব্যাট। ২০১১ বিশ্বকাপে আউট হয়ে ড্রেসিংরুমে গিয়ে হতাশায় টিভি ভেঙেছিলেন রিকি পন্টিং। তবে ট্রাভিস হেড বোল্ড হওয়ার পর নিজেই স্টাম্পটা ফের ঠিক করে বেলস বসিয়ে দিয়ে আসার দৃশ্য এবারই প্রথম। ঠিক যেমন এবারই প্রথম আম্পায়ার আঙুল তোলার আগেই রিভিউর সংকেত জানিয়েছেন স্টিভেন স্মিথ। ইবাদত হোসেনের বলে কট বিহাইন্ডের জোরালো আপিলে কুমার ধর্মসেনা সিদ্ধান্ত দেওয়ার আগেই স্মিথ ব্যাটে হাত ঠেকিয়ে আবেদন জানিয়েছেন রিভিউর।
ক্রিকেট মাঠে হাস্যকর অনেক কিছুই হয়, তবে সেসবে অস্ট্রেলিয়ানদের অংশগ্রহণ বিরল।
অস্ট্রেলিয়াকে এতদিন দেখা গেছে খাদের কিনারা থেকে ঘুরে দাঁড়াতে, মাঠে স্লেজিং আর বাইরে সংবাদ সম্মেলনে প্রকাশ্য হুমকি দিয়ে প্রতিপক্ষকে মানসিকভাবে পিছিয়ে দিতে। গ্লেন ম্যাকগ্রা তার খেলোয়াড়ি জীবনে বহুবার সিরিজ শুরুর আগেই ঘোষণা দিতেন শচীন টেন্ডুলকার বা ব্রায়ান লারার উইকেট তুলে নেওয়ার।
ডারউইনে সেই অস্ট্রেলিয়ারই রীতিমতো কম্পমান অবস্থা। দেশের মাটিতে বাংলাদেশের কাছে সিরিজের প্রথম টেস্টে হারের আশঙ্কা এবং তার প্রতিক্রিয়া হিসেবে ধেয়ে আসা সমালোচনার বাক্যবাণ নিঃসন্দেহে চাপে ফেলে দিয়েছে অস্ট্রেলিয়াকে। না হলে কি আর টেস্টের সর্বোচ্চ ক্যাচ ধরা ফিল্ডারের হাত থেকে লোপ্পা ক্যাচ ফসকায়? টেস্টের এক নম্বর ব্যাটার একই বোলারের কাছে পরপর দুই ইনিংসে একইভাবে আউট হয়ে স্টাম্প ঠিক করে দিয়ে মাঠ ছাড়েন! নির্মম সত্যটা হচ্ছে, প্যাট কামিন্সের দলের ক্রিকেটাররা বুঝে গেছেন, বাংলাদেশের বিপক্ষে ম্যাচটি জিততে তাদের অলৌকিক কিছুর জন্যই অপেক্ষা করতে হবে।
প্রতিবেদনে ইতিহাসের খাতা খুলেছেন সিডনি মর্নিং হেরাল্ডের সাংবাদিক ড্যানিয়েল ব্রেটিগ। বাংলাদেশের কাছে অস্ট্রেলিয়া যদি হেরেই যায়, তাহলে এই লজ্জার স্থান হবে কোথায়? ২০২৪ সালে ব্রিসবেনে ওয়েস্ট ইন্ডিজের কাছে হারের পাশে? নাকি ২০১৬-তে হোবার্টে দক্ষিণ আফ্রিকার কাছে ইনিংস হারের সঙ্গে? পরে তার কাছে মনে হয়েছে, এই লজ্জার তীব্রতা আরও বেশি। ইংল্যান্ডের কাছে তিন টেস্ট ইনিংস ব্যবধানে হারের সমান যেটা হয়েছিল ২০১০-১১ মৌসুমে।
ডারউইনের প্রথম ইনিংসে বাংলাদেশ ব্যাট করেছে ১৩৮ ওভার। এশিয়ার কোনো দলের অস্ট্রেলিয়া সফরে এসে এতটা সময় টিকে থাকার নজির নিকট অতীতে নেই, ২০২১ সালে সিডনিতে দ্বিতীয় ইনিংসে ১৩১ ওভার টিকে থেকে ড্র করেছিল ভারত। গত গ্রীষ্মে স্টার্ক-কামিন্স-হ্যাজেলউডদের এত বেশি ওভার বোলিং করায়নি চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ইংল্যান্ডও। অ্যাশেজে ইংল্যান্ড প্রতি ইনিংসে গড়ে ব্যাটিং করেছে ৭১.২ ওভার, পাঁচ টেস্টের ৯ ইনিংসে (একটি বৃষ্টিতে পরিত্যক্ত) ইংল্যান্ড সর্বোচ্চ ব্যাটিং করেছিল ১০৭ ওভার। সেখানে বাংলাদেশ ২৩ বছর পর অস্ট্রেলিয়া সফরে এসে প্রথম ইনিংসেই ব্যাট করেছে ১৩৮ ওভার।
অথচ টেস্ট শুরুর আগে মনে করা হচ্ছিল, ইতিহাসের অন্যতম সেরা এই বোলিং আক্রমণের সামনে বোধহয় এক সেশনও টিকবে না বাংলাদেশ, বিশেষ করে প্রস্তুতি ম্যাচে অখ্যাত বাঁহাতি পেসার থম্পসন ক্যাম্পবেলকে ৮ উইকেট উপহার দিয়ে ৫৪ রানে অলআউট হওয়ার পর। যে চতুষ্টয় একসঙ্গে খেলেই নিয়েছেন ৫৫০ উইকেট, যাদের টেস্ট উইকেটের যোগফল ১৬২০, তাদেরই এতটা সময় খেলল বাংলাদেশ!
টেস্টে ৩০০ উইকেটের মাইলফলক স্পর্শ করে আর ৬ উইকেট তুলে নিয়ে সংবাদ সম্মেলনে এসেছিলেন হ্যাজেলউড। তার কণ্ঠে ডুবন্ত মানুষের খড়কুটো আঁকড়ে ধরার আকুতি, ‘একবার আমরা রানের ঘাটতিটা (৬৭ রান পিছিয়ে) পূরণ করে ফেললে আশা করি তখনো আমাদের হাতে ৬ উইকেটই থাকবে, তখন থেকে আমরা চাপ তৈরি করতে পারব। আমরা যদি কালকে (আজ) লম্বা সময় ব্যাট করতে পারি, যদি সম্ভব হয় পুরোটা দিন, তাহলে সবসময়ই শেষ দিনে ১০টি উইকেট তুলে নেওয়াটা সম্ভব। যদিও উইকেটে বল খানিকটা উঁচু-নিচু হচ্ছে।’
এমন আশা হ্যাজেলউড করতেই পারেন। তবে প্রশ্ন হচ্ছে, শেষ কবে কোন অস্ট্রেলিয়ান ক্রিকেটারকে এতটা যদি-কিন্তুর মিশেলে কথা বলতে শুনেছেন? হ্যাজেলউডের আশা, চতুর্থ দিন পুরোটা ব্যাট করবে অস্ট্রেলিয়া। জানিয়ে রাখা ভালো, অস্ট্রেলিয়া প্রথম ইনিংসে অলআউট হয়েছিল ৫৩ ওভারে।
ডারউইন টেস্ট শুরুর আগে প্যাট কামিন্সকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, ডারউইনে কখনো খেলতে এসেছেন? তার উত্তর ছিল, ‘হয়তো এসেছিলাম, অস্ট্রেলিয়া এ দলের হয়ে মনে হয়, একবার প্রস্তুতি ক্যাম্পেও এসেছিলাম, ঠিক মনে পড়ছে না কবে।’ এখন কামিন্স ঠিকই মনে রাখবেন ডারউইনকে। ‘অতি দর্পে হত লঙ্কা’র মতো, অস্ট্রেলিয়ার গর্বের সৌধটা যে ধসে পড়েছে এখানেই।






