শিক্ষাব্যবস্থায় স্টেকহোল্ডারদের অংশগ্রহণ চায় জেন-জিরা

আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার বিভিন্ন ক্ষেত্রে নানারকম গোষ্ঠী এর বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করে চলেছে। দুর্বল বাজেট, দুর্বল কারিকুলাম, চিন্তাশূন্য শিক্ষকমণ্ডলী নিয়ে এই শিক্ষাব্যবস্থা খুব বেশি দূর এগোতে পারবে না। জেন-জিদের জোর দাবি, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও প্রযুক্তিবান্ধব শিক্ষাকে গুরুত্ব দিতে হবে
২০৫০ সালের সেপ্টেম্বর মাস। ঢাকার মগবাজার মোড়ে একটি পুরনো বাসা। টেবিলে সাজানো কিছু কাগজ আর একটা মলাট ছেঁড়া বই। ঘরে বসে থাকা রাশেদের চোখেমুখে ক্লান্তির ছাপ। বয়স তেত্রিশ। বিবিএ পাস করেছেন ২০৪০ সালে। তারপর কেটে গেছে পুরো এক দশক। এখনো পর্যন্ত সরকারি চাকরির লিখিত পরীক্ষায় একবারও পার হতে পারেননি। করপোরেট জব পেতে গেলে যে স্কিল দরকার এআই প্রম্পট ইঞ্জিনিয়ারিং, সাপ্লাই চেইন অ্যানালিটিকস বা কারিগরি ভাষাজ্ঞান— কোনোটাই তার বিশ্ববিদ্যালয়ের সিলেবাসে ছিল না।
রাশেদরা জন্মেছিল একবিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয় দশকে। বেড়ে উঠেছিল ডিজিটাল বাংলাদেশের স্লোগানে কিন্তু কর্মক্ষেত্রে নেমে দেখল তাদের তৈরি করা হয়েছিল শুধু পরীক্ষার খাতার পৃষ্ঠা ভরাট করতে, জীবন গড়তে নয়। ২০৫০ সালের বাংলাদেশ বিশ্বের ৩৫তম অর্থনীতি হয়তো হয়েছে কিন্তু সেই অর্থনীতির চাকার সঙ্গে তাল মেলাতে পারছে না রাশেদের মতো লাখো শিক্ষিত তরুণ। বাংলাদেশের উন্নতির গাড়িটি থেমে থেমে চলছে আর সেই থেমে যাওয়ার গোড়ার কারণ হিসেবে রাশেদ এখন একটাই শব্দ খুঁজে পায়— শিক্ষা।
আগামী দিনের শিক্ষাব্যবস্থা হতে হবে একটি গতিশীল ও বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়া, যা শুধু ডিগ্রির সনদ দেবে না, বরং বাস্তব জীবনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় আমাদের সক্ষম করে তুলবে। যেখানে পাঠ্যক্রম নির্ধারিত হবে বর্তমান ও আগামীর বৈশ্বিক চাহিদাকে নিরূপণ করে
রাশেদের চোখের সামনে ভেসে ওঠে পঁচিশ বছর আগের স্মৃতি।
২০২৪ সাল। সাড়ে পনেরো বছরের একটানা শাসনের অবসান ঘটিয়ে একটি স্বৈরাচারী সরকারের পতন হয়েছে মাত্র। আওয়ামী লীগের সেই দীর্ঘ শাসনামলে শিক্ষা খাতে যা কিছু স্থাপিত হয়েছিল, তার বেশিরভাগই ছিল মঞ্চসজ্জা। রাশেদের মনে আছে, তাদের স্কুলে ডিজিটাল ক্লাসরুমের উদ্বোধন হয়েছিল জাঁকজমক করে। কিন্তু সেই প্রজেক্টর চলত শুধু অতিথি এলে; বাকি সময় ধুলো জমত সাদা পর্দায়। তার ওপর ছিল ২০১০ সালের সৃজনশীল শিক্ষাক্রমের ভুতুড়ে কাণ্ড। তাত্ত্বিকভাবে যেটা মুখস্থবিদ্যা রোধ করার কথা বলেছিল, বাস্তবে সেটা শিক্ষার্থীদের ফেলে দিয়েছিল গোলকধাঁধায়।
তারপর এলো করোনা মহামারী। ২০২০ থেকে ২০২২— এ দুই বছরে রাশেদের মতো গ্রাম ও শহরের মাঝামাঝি অঞ্চলের শিক্ষার্থীরা ক্ষতিগ্রস্ত ছিল সবচেয়ে বেশি। শহরের ছেলেমেয়েরা অনলাইন ক্লাস করেছে। রাশেদ বাবার ছোট মুদি দোকানের আয়ে স্মার্টফোন কিনলেও ইন্টারনেটের গতি আর লোডশেডিংয়ের কাছে হার মেনে তার শিক্ষাজীবন গিয়েছিল থমকে।
স্বৈরাচারী সরকারের পতনের পরও অবস্থার খুব বদল হয়নি। ২০১১ সালের কারিকুলামে ফিরে গিয়েছিল তৎকালীন সরকার। অথচ এর আগের পনেরো বছরে পুরো পৃথিবীতে কত কী বদলে গেছে। সেই সময়ে কিছু সংগঠন রাস্তায় নেমে বলেছিল, ‘এ কারিকুলাম এই সময়ের উপযোগী নয়। আগে যুগোপযোগী চাহিদা নিরূপণ করতে হবে, তার আগে এটি চাপিয়ে দিলে প্রজন্ম অন্ধকারে থাকবে।’ তারা সংসদে লবিং করছিল বাজেট বৃদ্ধির ও শিক্ষকদের জন্য মর্যাদাপূর্ণ বেতন কাঠামোর জন্য। কিন্তু তখনকার নীতিনির্ধারকরা শোনেননি বরং সংগঠনগুলোকে বিরোধী রাজনীতির মুখপাত্র বলে চিহ্নিত করা হয়েছিল।
২০৩০ এর দশক: মেরামতের চেষ্টা, কিন্তু কতটা
ফলে ২০৩০-এর দশকে এসে রাশেদ দেখল, বিশ্ববিদ্যালয়ের গণ্ডি পেরোলেও তার ইংরেজি বলার ভয় কাটেনি। একটি সাধারণ আউটলুক ইমেইল লিখতে গিয়েও সে হিমশিম খায়। কারণ, তাকে কখনো ক্লাসে প্রশ্ন জিজ্ঞেস করতে শেখানো হয়নি। তাকে শেখানো হয়েছিল নীরবে পেছনের বেঞ্চে বসে নোট টুকে যেতে, যাতে শিক্ষকের কর্তৃত্বে আঁচড় না লাগে।
স্থবিরতার মাশুল
আজ ২০৫০ সালে দাঁড়িয়ে রাশেদ টের পায়, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নতি থমকে যাওয়ার পেছনে সবচেয়ে বড় অদৃশ্য শত্রু হচ্ছে অদক্ষ মানবসম্পদ।
মেট্রোরেল ছুটছে, ফ্লাইওভার হয়েছে, বিদ্যুৎ উৎপাদন বেড়েছে। কিন্তু বিদেশি বিনিয়োগকারীরা বাংলাদেশে আসতে চাইলেও, দক্ষ কর্মী খুঁজে পাচ্ছে না। বড় বড় প্রকল্পের ম্যানেজার আসছে ভারত বা ভিয়েতনাম থেকে। স্থানীয় তরুণরা রাইড শেয়ারিং করছে অথবা মধ্যপ্রাচ্যে গিয়ে শ্রমিকের কাজ করছে, যে কাজ হয়তো ২৫ বছর আগেও করতেন তাদের নিরক্ষর দাদারা।
রাজনীতির চেহারাও বদলেছে কিন্তু ক্ষমতার কেন্দ্রে এখনো সেই পুরনো ঘরানার লোকজনই ঘুরছে, যারা শিক্ষাকে শুধু ভোটের ইস্যু হিসেবে দেখে, জাতি গঠনের ইস্যু হিসেবে নয়।
রাশেদের জীবনের বাস্তবতা কী?
সে আজ সকালে একটি চাকরির ইন্টারভিউ দিয়ে এসেছে। একটি গার্মেন্টস ফ্যাক্টরির ডেটা এন্ট্রি অপারেটর পদে। মাসিক বেতন পঁচিশ হাজার টাকা। তার বাবা ২০২৪ সালে মুদি দোকান চালিয়ে যা আয় করতেন, মূল্যস্ফীতি ধরলে প্রায় কাছাকাছি।
সে ভাবে, পঁচিশ বছরে যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি হয়েছে কিন্তু শিক্ষার্থীর গন্তব্য বদলায়নি। সংস্কৃতির বাহ্যিক চাকচিক্য বেড়েছে, কিন্তু কমেছে ভেতরের চিন্তার গভীরতা।
ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি রোধ
রাশেদ তার বাবার পুরনো ডায়েরিটা হাতে নেয়। তাতে ২০২৪ সালের একটা পাতা ভাঁজ করা। তার বাবা লিখেছিলেন, ‘ছেলেটা বড় হচ্ছে। দেশের জন্য অনেকেই জীবন দিয়েছে, দেশ বদলাচ্ছে। কিন্তু স্কুলটা ঠিক আমাদের কালের, সেই ১৯৯৬ সালের মতোই।’
রাশেদ চমকে ওঠে। এত বছর পরেও কি কিছু বদলায়নি? হয়তো সবকিছুর নাম বদলেছে, চেহারা বদলেছে কিন্তু শিক্ষাব্যবস্থার প্রাণটা চলছে এখনো কৃত্রিম শ্বাসযন্ত্রে।
আমরা যদি ২০৫০ সালের এ করুণ চিত্র এড়াতে চাই, তাহলে আজ থেকেই আমাদের স্বীকার করতে হবে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনই শেষ কথা নয়। যতদিন না শিক্ষাকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করে একে শুধুই একটি বৈজ্ঞানিক ও মানবিক প্রক্রিয়া হিসেবে দেখা হবে, যতদিন না চাহিদা নিরূপণ করে সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও বিভিন্ন স্টেকহোল্ডারকে অ্যাডভোকেসি কাজে লাগিয়ে শিক্ষার বাজেট বাড়ানো হবে, ততদিন রাশেদের মতো লাখো তরুণের চোখে এ প্রশ্নই জ্বলজ্বল করবে: ২০৫০ সালে পৌঁছে আমরা কি আদৌ কোথাও পৌঁছালাম নাকি শুধু ক্যালেন্ডারের পাতা উল্টালাম?
জেন-জির ভাবনায় শিক্ষাব্যবস্থা
আমাদের ভাবনায় আগামী দিনের শিক্ষাব্যবস্থা হতে হবে একটি গতিশীল ও বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়া, যা শুধু ডিগ্রির সনদ দেবে না, বরং বাস্তব জীবনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় আমাদের সক্ষম করে তুলবে। যেখানে পাঠ্যক্রম নির্ধারিত হবে বর্তমান ও আগামীর বৈশ্বিক চাহিদাকে নিরূপণ করে। মুখস্থবিদ্যার পুরনো দেয়াল ভেঙে সেখানে জায়গা করে নিতে হবে সত্যিকার অথের্ সৃজনশীল ও সমালোচনামূলক চিন্তা, ডেটা অ্যানালিটিকস এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মতো যুগোপযোগী দক্ষতাকে, যাতে ২০৫০ সালে কোনো রাশেদকে অদক্ষতার গ্লানি নিয়ে বসে থাকতে না হয়।
সবচেয়ে বড় দাবি হলো, শিক্ষা খাতকে যাবতীয় রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করে একে একটি স্বায়ত্তশাসিত রূপ দেওয়া। শিক্ষাকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা কতিপয় স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীর যে সিন্ডিকেট বছরের পর বছর মেধার বিকাশ বাধাগ্রস্ত করছে, তার গোড়া সমূলে উপড়ে ফেলতে হবে। একই সঙ্গে কারিগরি উৎকর্ষের পাশাপাশি আমাদের শিক্ষায় নৈতিকতা ও মানবিক মূল্যবোধ থাকতে হবে অগ্রাধিকারের শীর্ষে। আমরা এমন এক অন্তর্ভুক্তিমূলক ও প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষাব্যবস্থা চাই, যা আমাদের শুধু দক্ষ কর্মী নয়, বরং একজন সৎ ও দায়িত্বশীল মানুষ হিসেবে গড়ে তুলবে। যাতে ক্যালেন্ডারের পাতা উল্টে ২০৫০ সালে পৌঁছে আমাদের মনে না হয় যে আমরা আসলে কোথাও
পৌঁছাতে পারিনি।
লেখক: শিক্ষার্থী, শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউট (আইইআর), ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়; শিক্ষা অধিকার সংসদের সঙ্গে যুক্ত





