৭ সারথি
প্রত্যক্ষ করের ওপর প্রথম গুরুত্ব দেন ড. নূরুল হুদা

ড. মির্জা নূরুল হুদা (১ আগস্ট ১৯১৯ – ২২ ডিসেম্বর ১৯৯১)
১৯৭৯ সালের ২৪ নভেম্বর রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান যখন ড. মির্জা নূরুল হুদাকে অর্থমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব দেন, তখন বাংলাদেশের অর্থনীতি এক সংবেদনশীল সময় পার করছে। তেমনই এক প্রেক্ষাপটে ১৯৭৯-৮০ অর্থবছরে তার পেশ করা ৩ হাজার ৩১৭ কোটি টাকার বাজেট শুধু একটি বার্ষিক অর্থনৈতিক হিসাব ছিল না, নীতিগত দিকনির্দেশনার এক স্পষ্ট ইঙ্গিতও তাতে ছিল।
তার এই বাজেট নানাদিক থেকে ছিল অনন্য। কারণ এই বাজেট প্রস্তাবের মধ্য দিয়ে তিন বছরের খরা কাটিয়ে জাতীয় সংসদ বাজেট উপস্থাপনের ধারায় ফিরে আসে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই বাজেটে প্রত্যক্ষ করের ওপর জোর দেওয়া হয় এবং কর তদন্ত কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়নে উদ্যোগ নেওয়া হয়। সব মিলিয়ে এই বাজেট নতুন এক অর্থনৈতিক ভাবনার প্রতিফলন ঘটায়।
১৯১৯ সালের ১ আগস্ট টাঙ্গাইলের দেলদুয়ার উপজেলার জাঙ্গালিয়া গ্রামে এক সাধারণ কৃষক পরিবারে জন্ম নেওয়া মির্জা নূরুল হুদার শৈশব কেটেছে সীমিত সুযোগের ভেতরেই। কিন্তু সেই সীমাবদ্ধতা তার শিক্ষাজীবনে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারেনি।
১৯৪০ ও ১৯৪১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে বিএ (অনার্স) ও এমএ সম্পন্ন করেন তিনি। শুধু প্রথম শ্রেণিতে প্রথম হওয়াই নয়, সর্বোচ্চ নম্বর অর্জন করে কালী নারায়ণ বৃত্তিও লাভ করেন। সে সময়ের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ স্বীকৃতি ছিল এটি।
গণঅভ্যুত্থানের উত্তাল সময়ে তাকে পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়
তার কর্মজীবনের শুরু শিক্ষকতা দিয়ে। প্রথমে যোগ দেন করটিয়া কলেজে, তারপর রাজশাহী সরকারি কলেজ। এরপর বেঙ্গল সিভিল সার্ভিসে যোগ দিয়ে ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৪৬ সালে পাড়ি দেন যুক্তরাষ্ট্রে। বৃত্তি নিয়ে পড়তে যান যুক্তরাষ্ট্রের কর্নেল ইউনিভার্সিটিতে। যুক্তরাষ্ট্রে গমন তার দৃষ্টিভঙ্গিকে আরও বিস্তৃত করে। দেশে ফিরে ১৯৪৯ সালে যোগ দেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রিডার পদে। যেখানে দীর্ঘ সময় ধরে শিক্ষকতা ও গবেষণার সঙ্গে যুক্ত থাকেন।
১৯৬৫ থেকে ১৯৬৯ সাল পর্যন্ত পূর্ব পাকিস্তান সরকারের পরিকল্পনা ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। একই সময়ে পাকিস্তান অর্থনীতি সমিতির সভাপতিও ছিলেন। অর্থনীতির একাডেমিক জ্ঞান এবং প্রশাসনিক অভিজ্ঞতার এই সমন্বয় তাকে নীতিনির্ধারণের কেন্দ্রে নিয়ে আসে।
১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানের উত্তাল সময়ে তাকে পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। তবে রাজনৈতিক পরিস্থিতি দ্রুত পরিবর্তনের কারণে সে দায়িত্ব তিনি পালন করতে পারেন মাত্র এক দিন। এরপর আবার ফিরে যান বিশ্ববিদ্যালয়ে এবং অর্থনীতি বিভাগের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব নেন।
স্বাধীনতার পরও তার অভিজ্ঞতা রাষ্ট্রের কাজে লাগে। ১৯৭৫ সালের ২৬ নভেম্বর তিনি সরকারের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পান। কৃষি, বাণিজ্য, অর্থ, শিল্প ও পরিকল্পনা, এই গুরুত্বপূর্ণ খাতগুলোতে একসঙ্গে কাজ করার অভিজ্ঞতা তাকে পরে অর্থমন্ত্রীর দায়িত্ব পালনে প্রস্তুত করে। ১৯৯১ সালের ২২ ডিসেম্বর ৭২ বছর বয়সে ঢাকায় তার মৃত্যু হয়।




