নিবন্ধ
ঈদের খাবারের ইতিহাস-ঐতিহ্য

উৎসবের জন্য খাবার, নাকি খাবারের জন্য উৎসব— বিষয়টি ভাবার মতোই। তবে কারণ যা-ই হোক, যেকোনো উৎসবের অবিচ্ছেদ্য অংশ হলো খাবার। সে কারণেই ঈদের পরিকল্পনার একটি বড় অংশ জুড়ে থাকে ‘কী রাঁধব, কী খাব, কী খাওয়াব’র ব্যাপার। তার ওপর যদি সেটা হয় কোরবানির ঈদ, তবেই হয়েছে! ইন্টারনেট ঘেঁটে রেসিপি দেখা, মসলাপাতি কেনা, রান্নার তোড়জোড়— সব মিলিয়ে এলাহি কাণ্ড। গরু-ছাগল কেনা, কসাই জোগাড় করার ঝক্কি তো রয়েছেই। তবে সবকিছুই তো আর এমন ছিল না এই শতকের একেবারে গোড়ার দিকে। খাবারদাবারে যে বৈচিত্র্য ছিল, তাও ব্যবহারিক এবং প্রয়োজনেই। কালের আবর্তে কোরবানির ঈদের খাবারের ইতিহাস আর বৈচিত্র্যে তাই দেওয়া যাক নজর।
ড. মুনতাসীর মামুন মোটামুটি একটা ধারণা দিয়েছেন, ‘আজ আমরা যে ঈদের জন্য সাগ্রহে অপেক্ষা করি বা যে ঈদ দেখি আমাদের একটি বড় উৎসব হিসেবে, তা ৪০-৫০ বছরের ঐতিহ্য মাত্র।’ তিনি আরও যোগ করেছেন, ‘১৯৪৭-এর আগে, বাংলাদেশে একমাত্র ঢাকায়ই ঈদ যা একটু ধুমধামের সঙ্গে পালিত হতো। ঢাকা ছিল পূর্ববঙ্গের প্রধান ও মোগল শহর। তাই মোগল ঈদের প্রভাব ছিল বেশি। তা ছাড়া, এখানে থাকতেন নওয়াব ও অন্য ধনাঢ্য-শরিফ মুসলমান ব্যক্তিরা। ফলে ঈদ পেত পৃষ্ঠপোষকতা।’ ঢাকায় তবু এই ঈদ ছিল অভিজাত, উচ্চবিত্ত, উচ্চমধ্যবিত্তের ভেতরে।
বাংলায় সুলতানি আমলের একেবারে গোড়ার দিকের খাবারের বর্ণনা মোটেই নেই। ত্রয়োদশ শতাব্দীর গোড়ার দিকে ঘুরি সাম্রাজ্যের পূর্বতম প্রান্ত ছিল বাংলা। আর পশ্চিমের প্রান্ত ছিল পারস্য উপসাগর ও কাস্পিয়ান সাগর। এ বিশাল ভূখণ্ডের খাবার চলে এসেছিল বাংলায়। তবে যতটা তাদের খাবার ঢুকেছিল, তার চেয়েও বেশি আমাদের খাবারে অভ্যস্ত হতে হয়েছিল তাদের। বাংলায় গমের চাষ অনেক পরের গল্প। কারণ, বাংলা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার আর্দ্র অঞ্চলের ধান চাষের এলাকা; আর আফগানিস্তানের গারমাশিরের খলজি গোত্রের লোকেরা ছিল উত্তর-পশ্চিম এশিয়ার গমনির্ভর সাংস্কৃতিক এলাকা থেকে আসা। এ ধান ও গমের ওপর নির্ভরশীলতা শুধু খাদ্য সংস্কৃতির ব্যাপার নয়; বরং ছিল দুটি ভিন্ন ধরনের সমাজ ও সভ্যতার নির্মাতা। ফলে বাংলায় আগে থেকেই শীতকালীন ফসল হিসেবে গোধূম (গম) থাকলেও সেটি মুসলিম গোষ্ঠীগুলোর আগমনের পর চাষাবাদে ও পঞ্জিকায় ধীরে ধীরে গুরুত্ব পেতে শুরু করে। বাংলার প্রাচুর্য ছিল মাছে-ভাতে। সেখানে নতুন গোষ্ঠীগুলো ছিল লাল মাংস আর রুটিতে অভ্যস্ত। তাই বাংলা এ দুটি সংস্কৃতির মিলনস্থলে পরিণত হয়েছিল। ভারতীয় খাদ্য ইতিহাসবিদ কে টি আচায়া এটিকে বেশ ভালোভাবে বলেছেন, ‘হিন্দুদের কিছুটা অনাড়ম্বর ভোজন পরিবেশে মুসলমানরা দলবদ্ধ ও একক ভোজন আর সৌহার্দ্যপূর্ণভাবে খাবার ভাগ করে নেওয়ার এক পরিশীলিত দাপ্তরিক শিষ্টাচার নিয়ে এসেছিল। ভারতের স্থানীয় খাবার বাদাম, কিশমিশ, মসলা ও ঘি দিয়ে সমৃদ্ধ করা হয়েছিল। এর মধ্যে ছিল পোলাওয়ের মতো মাংস ও ভাতের পদ, কাবাবের মতো প্রক্রিয়াজাত মাংস, শিঙাড়ার মতো পুর ভরা খাবার, হালুয়ার মতো মিষ্টি আর শরবত ও ফালুদার মতো মিষ্টি পানীয়। নতুন নতুন খাবার এ অঞ্চলের রন্ধনশৈলীকে সমৃদ্ধ করেছিল, যেমন মাংসের সঙ্গে মিহি গুঁড়া করা গম দিয়ে তৈরি খাবার (হালিম), ঠান্ডা কুলফি বা জিলাপি। মুসলমানরা ভারতীয় খাবারের শৈলী ও উপাদান— উভয়কেই প্রভাবিত করেছিল।’ এ প্রক্রিয়া কমবেশি বহাল ছিল মোগল শাসন পর্যন্ত।
ঢাকার বিখ্যাত জাহাজি কালিয়া। জয়তুনের তেলে রান্না করে জাহাজের কর্মীরা সেই খাবার নিয়ে যেত সমুদ্রযাত্রায়। পোর্সেলিনের পাত্রে ঢেকে রাখা হতো আর তোলার ক্ষেত্রে ব্যবহার করা হতো শুকনো কাঠের চামচ। এ খাবার এক বছর পর্যন্ত ভালো থাকত
যাহোক, ধান ভানতে শিবের গীত গাওয়া বন্ধ করি! যারা কোরবানি দিতেন, এ ঈদে যেহেতু সকালে তাদের কিছু মুখে দেওয়া বারণ; তাই নামাজ পড়ে ফিরে পশু কোরবানি দিয়ে তারপর খাবার খেতেন। অবশ্য যারা পশু কোরবানি দিতেন না, তারা নামাজ পড়ে এসেই মুখে কিছু দিতেন। আমাদের এ অঞ্চলে কোরবানির ঈদের খাদ্যগ্রহণ শুরুই হতো বিভিন্ন পদের মিষ্টান্ন দিয়ে। গোটা ভারতীয় উপমহাদেশে সবচেয়ে সাধারণ ও প্রচলিত মিষ্টান্ন ছিল দুধের তৈরি সেমাই (শির খুরমা) আর ফিরনি বা পায়েস বা ক্ষীর (শির বিরাঞ্জ ও লাউজ) এবং অবশ্যই বিভিন্ন ফল ও সবজির হালুয়া, মোরব্বা। পাশাপাশি ছিল পারস্য উপসাগর থেকে বাংলা পর্যন্ত বিস্তৃত বিশাল এলাকার বিভিন্ন ধরনের মিষ্টান্ন, যেমন হাশিমি (মিষ্টি শিরায় ডোবানো ঘিয়ে ভাজা ময়দার গোলা), আল কাহিরিয়া (কাঠবাদাম গুঁড়া আর গোলাপজলের তৈরি ডোনাট), সাবুনিয়া (আমাদের বাদামের টানা এরই উত্তরসূরি), তুৎমায (পাস্তা— মিষ্টি ও ঝাল, দুভাবেই খাওয়া হতো) ইত্যাদি। কোরবানির মাংস দিয়ে তৈরি করা হতো নানা পদ। কিন্তু কী কোরবানি হতো? সিংহভাগ হিন্দু প্রজার মধ্যে বিরূপ প্রতিক্রিয়া হয়, এমন ঘটনা খুব একটা বেশি হওয়ার কথা নয়। ফলত গরু নয়; বরং মোষ, মেষ, বকরি আর খাসি— এগুলোর মধ্যেই ঘুরপাক খেত কোরবানির পশুর তালিকা। এমনকি আলাউদ্দিন ও পরে জালালউদ্দিন খিলজি তো আইন করেই নিষেধ করেছিলেন গোমাংস। সম্রাট বাবরও একেবারে েমাগল শাসনের শুরুতেই হুমায়ুনকে বলেছিলেন স্থানীয়দের অনুভূতিতে আঘাত না করতে। এখানে আরেকবার শিবের গীতে ঢুকতেই হলো; কোরবানির ঈদ এ অঞ্চলে বহুদিন বকরি ঈদ নামে প্রচলিত ছিল। বকরি নামটা কিন্তু আরব্য পারসিক ‘বাকর’ শব্দ থেকে আসা; যার অর্থ কচি উট। মোগল আমলে বেশ নিয়ম করেই উট জবাই করা হতো এই ঈদে। তাই ঈদের পশুর নামই হয়ে যায় বকরি আর এখনকার ব্যবহারিক অর্থে ছাগি। যাহোক, খাওয়ার সময়ে সুলতানি বাংলায় অভিজাতদের পাতে থাকত বিভিন্ন ধরনের রুটি— রুকাক, শিরমাল (ঘিয়ে ডোবানো রুটি), খুবস (পিটা ব্রেড), দোজাজ পোলাও (মুরগিজাতীয় পাখির আখনি দিয়ে তৈরি পোলাও, সঙ্গে সেই পাখির মুসাল্লাম), কাঠ-কয়লার শুকনো তাপে তৈরি ভেড়ার রোস্ট (শিউয়ান)। খাদ্য গ্রহণের শুরুতে কিছু কিছু ক্ষেত্রে পান করা হতো ফলের শরবত; তবে ফুলের শরবত (বিশেষত গোলাপের) ছিল বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। খাওয়া শেষের পানীয় ছিল ‘ফুক্কা’— বার্লি, পানি, চিনি বা মধু, বেদানার বীজ, ইস্ট দেওয়া গরম রুটি (সামান্য গাঁজনের জন্য), লেবুর রস, জায়ফল, মৌরি ও কস্তুরি একদিন একরাত ঠান্ডা জায়গায় রেখে বানানো পানীয়। আর খাওয়ার একেবারে শেষে বিদায় জানানোর রীতি ছিল পান আর সুপারি দিয়ে। তবে অবশ্যই তুর্ক-আফগান-আরব শাসকদের মেন্যুতে মাছের পদ ছিল। অবশ্য সে ব্যাপারে মান্ডুর সুলতানের ‘নিমাতনামা’ ছাড়া আর তেমন কোনো তথ্য নেই।
মোগল আমলেও একই রীতিনীতি বজায় ছিল; তবে এ সময়ে আরও বেশি পারসিক প্রভাব পড়েছিল বাংলায় তো বটেই, গোটা ভারতীয় উপমহাদেশে। কারণ, সম্রাট শাহজাহানের শ্যালক ও সম্রাট আওরঙ্গজেবের মামা মির্জা আবু তালিব শায়েস্তা খান একই সঙ্গে বাংলার সবচেয়ে লম্বা সময়ের জন্য সুবেদার ছিলেন আর সেই সঙ্গে ছিলেন পারসিক বংশোদ্ভূত। বাংলার নবাবি আমল ও কোম্পানি আমলেও বাংলার নায়েব-নাজিমরা (১৮৪৩ পর্যন্ত) ছিলেন পারসিক বংশোদ্ভূত। ফলে সুবে বাংলার নিজস্ব মিশ্র খাদ্য সংস্কৃতি গড়ে উঠেছিল আগেকার সুলতানি আমলের ধারাবাহিকতায়; সঙ্গে বিভিন্ন সময়ে যোগ হয়েছিল ইউরোপীয়দের হাত ধরে নতুন পৃথিবী থেকে আসা সবজি, ফল আর খাবারে। মোগল আমলের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য খাবারের বর্ণনা মেলে আবুল ফাযলের লেখা ‘আইন-ই-আকবারি’, সম্রাট জাহাঙ্গীরের সময়ে লেখা ‘আলওয়ান-ই-নিমাৎ’, সম্রাট শাহজাহানের শাসনামলে লেখা ‘নুসখা-ই-শাহাজাহানি’, সম্রাট মুহাম্মদ আযম শাহের আমলে রচিত ‘খুলাসাৎ-ই-মাকুলাত-উ-মাশরুবাৎ’ আর মোগলদের পতনের পর লেখা বই ‘বাযম-ই-আখির’-এ। কেবল ‘আইন-ই-আকবারি’ আর ‘বাযম-ই-আখির’ ছাড়া বাকি তিনটি বই পুরোপুরিই রেসিপির সংগ্রহ। সেখানে বিস্তৃত বর্ণনা আছে খাবার ও খাবার তৈরির। পোলাও আর খিচুড়িকে স্বাভাবিকভাবেই রাজকীয় মর্যাদা দেওয়া হয়েছে, লস্করি বা ক্যান্টনমেন্টের খাবার বিরিয়ানির কোনো অস্তিত্ব নেই এসব বইয়ে। ‘বাযম-ই-আখির’-এ বলা হয়েছে বাদশাহ নামাজ ও উৎসর্গের সব আনুষ্ঠানিকতা শেষ করে রাজকীয় তাঁবুতে ফিরে এলে দস্তরখান বিছিয়ে পরিবেশন করা হতো উট ও ভেড়ার কলিজার কাবাব; সংগত হিসেবে শিরমাল রুটি। মোগল উৎসবের খাবারের তালিকা অতি দীর্ঘ। হালকা খাবারে নানখাটাই থাকত কয়েক পদের। থাকত শিঙাড়া, বিশেষ পানীয়ের সংগত দেওয়ার জন্য কয়েক পদের নুকল, সালোনা মিঠাই, শাখেই, খাজলা ও কাৎলে। কোরমা, কালিয়া, কিমা, কাবাব, রোস্ট, দো-েপঁয়াজু— সবই কয়েক পদের আর প্রাণী, পাখি বা মাছের হতো। রুটি হতো দুই ধরনের— খামিরি ও খামিরহীন। খামিরহীন রুটির তালিকায় ছিল চাপাতি, ফুলকা, পরোটা, রোগনি, বিরি, বেসনি; খামিরি রুটির তালিকায় নান, শিরমাল, খানকাদিয়াঁ, গাও জবান, গাও দিদা, কুলচা, বাকরখানি, বাদামি, পেস্তা, চালের আটা, গাজর, মিছরি, নান-ই-পানাব্বা, নান-ই-তিনকি, নান-ই-কিমাশ। চাল (পোলাও) জাতীয় খাবারের কথা না বলাই ভালো; কেবল নুসকা-ই-শাহজাহানিতেই ৫৬ পদের পোলাও চালের উল্লেখ আছে। এসব খাবারের অনুষঙ্গ হিসেবে থাকত বুরানি (বেগুনের এক পদ, বোরহানি নয়), রাইতা, শসার রাইতা, কয়েক পদের চাটনি, আশ, দইবড়া, কয়েক রকমের ভর্তা, কয়েক পদের দোলমা, কয়েক পদের ডাল, অন্তত ১২ পদের মোরব্বা, ১০ পদের হালুয়া, কাঠবাদাম-দইয়ের মিষ্টি, গমের শিষের মিষ্টি, কয়েক পদের লাড্ডু, আমিত্তি, জিলাপি, বালুসাই, ক্ষীর, ফিরনিসহ অন্তত গোটাবিশেক পদের মিষ্টি। এত এত খাবারের বর্ণনা দেওয়ার সুযোগ এখানে নেই। রেজালা ও বোরহানির উল্লেখ ওপরে নেই। কারণ, সেগুলো বাংলার একান্তই নিজস্ব উদ্ভাবন। আর ছিল কফি। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির প্রথম গভর্নর উইলিয়াম হেজেস ঢাকায় এসে কফির কাপে চুমুক দিয়েছিলেন ১৬৮২ সালের ২৯ অক্টোবর। মোগল অভিজাতদের মধ্যে তখন এ পানীয় বেশ জনপ্রিয় ছিল।
পলাশীতে বাংলার স্বাধীনতার সূর্য অস্ত গেলে ক্ষমতায় আসে ইংরেজরা। ব্রিটিশ-রাজের যুগ। সে সময়ের কিছু খাবারের বর্ণনা দিয়েছেন হাকিম হাবিবুর রহমান। অবশ্য উল্লেখ করা প্রয়োজন, রমজানকে গুরুত্ব দিলেও তিনি কোনো ঈদকেই উৎসবের কাতারে ফেলেননি। তবে তার লেখায় ঐতিহ্যবাহী খাবারগুলো হারিয়ে যাওয়ার শোকাবহ বিলাপের আঁচ মেলে। পুরনো সব খাবার সাহেবি স্বাদে তৈরি হতে থাকে। যে কারণে এখনো উত্তর ভারতের কোরমা ঝাল হলেও, আমাদের বাংলার কোরমা মিষ্টি। মোগল সময় থেকেই খাবারের আদান-প্রদানে যে ফিউশনের জন্ম ঘটে, তাতে সত্যিকার অর্থে হারিয়ে গেছে আমাদের নিজস্ব খাবার। কাটলেট, চপ, রোস্ট, এগ ডেভিল, স্টু, এখনকার রেস্টুরেন্টের সকালের নাশতার যেসব স্যুপ— সবই তাদের খানসামাদের ছোঁয়ায় তৈরি। কাটলেট, চপ মোটামুটি আমাদের ঈদের মেন্যুতেও দেখা যায়। তবে ব্রিটিশ খাবারগুলো হারানোর পথে। ব্রিটিশ শাসনে দস্তরখান ছেড়ে আমরা টেবিলে উঠেছি, হাতের বদলে চামচের ব্যবহার শিখেছি আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হলো তিনবেলা খেতে শিখেছি। তার আগে গোটা ভারতীয় উপমহাদেশে (মোগল আমলেও) দুবেলা খাওয়ার রীতি ছিল।
বাংলার ঈদে কেন বকরি বা ছাগল উৎসর্গ করা হতো, ব্যাপারটা যতটা না হিন্দু জমিদারদের কড়াকড়ি, তার চেয়ে বেশি আর্থিক সামর্থ্যের ব্যাপার। জেমস টেইলরের ‘আ স্কেচ অব দ্য টপোগ্রাফি অ্যান্ড স্ট্যাটিস্টিক অব ডাক্কা’ (ঢাকা) বইয়ে উনিশ শতকের ত্রিশের দশকের ঢাকার বর্ণনায় দেখা গেছে, এ শহরের মুসলিম ধনাঢ্য পরিবারগুলোর মধ্যে শাসকশ্রেণির প্রতিনিধিরা ছাড়া অন্য কেউ ছিলেন না। মুসলমানদের বেশিরভাগই ছিলেন ক্ষুদ্র পেশাজীবী বা শ্রমজীবী। ফলে আর্থিক কারণেই কোরবানি দেওয়া সম্ভব হতো না বেশিরভাগের পক্ষে। ব্রিটিশ শাসনের ওই সময়ে ঢাকার মসলিন শিল্প ছিল ধ্বংসের পথে; ফলে সামগ্রিকভাবে শহরের অর্থনীতিতে মন্দা ভাব ছিল। এ প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়েছিল মুসলিম কারিগর ও শ্রমিকদের ওপর, যা তাদের ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের সক্ষমতাকেও সীমিত করে দিয়েছিল। এ প্রভাব সম্ভবত এরপর সেই শতকের আশির দশকেও ছিল। যে কারণে কট্টর হিন্দুত্ববাদী পত্রিকা ‘সারস্বতপত্র’তে (১৮৮৩) ছাপা হয়েছিল, ‘... কিন্তু এখন যখন দেখি গরু কোরবানি নিয়ে বিভিন্ন জায়গায় আন্দোলন চলছে, সে সময় ঢাকা এসব থেকে মুক্ত। ঢাকার হিন্দু-মুসলমানদের মধ্যে নিখুঁত ভালো সম্পর্কই বিদ্যমান। উভয়ে উভয়ের ধর্মীয় উৎসবাদিতে যোগ দেয় এবং কেউ কারও ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দিতে চায় না। দেশের অন্যান্য অঞ্চলের উচিত ঢাকাকে অনুসরণ করা।’ বলা ভালো, এ সময়েই গোরক্ষা আন্দোলন বেশ জোরেশোরেই চলছিল।
বাংলার ঈদের খাবারে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নিয়ামক বা পরিবর্তনকারী ঘটনাগুলো গত শতকেই ঘটেছে। প্রথমত দ্বিজাতি তত্ত্বে গরুর অবস্থান। কংগ্রেসের সঙ্গে পত্রালাপে মুহাম্মদ আলি জিন্নাহ ভারতীয় মুসলিমদের প্রকাশ্যে গরু জবাই করার অধিকারের কথা বলেছিলেন ১৯৩৮ সালে। ফলত দেশভাগের পর কোরবানির ঈদ একটি বড় ব্যাপার হিসেবে আবির্ভূত হওয়ার কথা। কিন্তু ষাটের দশক পর্যন্ত সম্ভবত পরিবারগুলো আর্থিকভাবে ব্যাপক সচ্ছল ও অভিজাত না হলে এই ঈদ সেভাবে পালন করত না। আবুল মনসুর আহমেদ তার ‘আত্মকথা’য় গত শতকের প্রথম দশকের ব্যাপারে লিখেছেন, ‘প্রথম প্রথম দুই-তিনটা ও পরে মাত্র একটা গরু কোরবানি হইত।’ পশ্চিমবঙ্গের বসিরহাটের বনেদি বাড়ির সদস্য অধ্যাপক আনিসুজ্জামান গত শতকের চল্লিশের দশকের স্মৃতিচারণ করে বলেছেন, ‘বকরি ঈদে আমরা প্রতি বছর কুরবানি দিতাম না— মাঝে মাঝে তা বাদ পড়ত— ভক্তির অভাবে অতটা নয়, যতটা সামর্থ্যের অভাবে।’ আবার মুর্শিদাবাদে শৈশবের ঈদের বর্ণনা এসেছে শহীদ জননী জাহানারা ইমামের লেখনীতে। ঈদের আগের রাতে পুকুরে গোসল করে এসে চালের আটার দুই-তিনশ রুটি বানানো থেকে শুরু হতো ভোজের প্রস্তুতি আর শেষ হতো কোরবানির পর শিকে গাঁথা কলিজার কাবাব আর এরপর দু-তিন দিন পর্যন্ত কাবাব, কোরমা, কোফতা, ঝাল-কারি, দো-পেঁয়াজু, রেজালা আহারের মধ্য দিয়ে; সংগত হিসেবে থাকত পোলাও, পরোটা বা চালের আটার রুটি কিংবা শুধুই ভাত।
যে তিনজনের স্মৃতি ধরে টান দেওয়া হলো, তারা সবাই ছিলেন অভিজাত বা সম্ভ্রান্ত পরিবারের। সাধারণ মানুষ যেহেতু স্মৃতিকথা লেখেনি, তাই জানার উপায়ও তেমন নেই। তবে সকালে নামাজ পড়া, ফিরে এসে সেমাই বা পায়েস মুখে দেওয়া তো হতোই। মুনশী রহমান আলী তায়েশের লেখায় কেবল পাওয়া যায় রমনা আর চকের মেলার কথা, সেটাই ছিল ঢাকাবাসীর ঈদ বিনোদন। এরপর ১৯৪৩ সালের দুর্ভিক্ষ একটা বড় নাড়া দিয়ে গিয়েছিল। এ সময়ে বাংলায় আর কোনো কিছুই ফেলনা ছিল না। বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় যেমন দেখিয়েছেন ব্রাহ্মণী অনঙ্গ বউকে বাধ্য হয়ে শামুক-গুগলি খেতে, তেমন অবস্থা ছিল শহরেরও। বিভিন্ন শাকসবজির খোসা, বীজ, পাতা, মাছের আঁশ পর্যন্ত খাবার হয়ে ওঠে এ সময়ে। ভাত ছেড়ে রুটিতেও দীক্ষা হয় রেশনের আটার বদৌলতে। ১৯৪৩ সালের নভেম্বরের মাঝামাঝি হওয়া কোরবানির ঈদে ছিল না কোনো উৎসবের আমেজ। এরপর দেশভাগের কারণে ওপারের বিভিন্ন জায়গা থেকে আসা মানুষদের খাদ্যাভ্যাস বাংলায় ঢুকেছিল; বিশেষ করে বিহারের, যা দেখি এখন আমাদের কাবাব, তেহারি, বিরিয়ানিতে।
বাংলায় আরেকটি বড় ব্যাপার ছিল মাংস সংরক্ষণ। গত শতকের সত্তরের দশকের আগে এ অঞ্চলে ফ্রিজের তেমন চল ছিল না। আর চল শুরু হওয়ার পরও সেই ফ্রিজে এত মাংস রাখার জায়গা কই? তাই অনেকে চর্বি ফেলে রোদে শুকিয়ে, আবার কেউ কেউ মাটির চুলার ওপরে ধোঁয়া দিয়ে শুঁটকি করত। হলুদ আর লবণ মেখেও এ প্রক্রিয়া অবলম্বনের চল ছিল। তবে সবচেয়ে প্রচলিত উপায় ছিল রান্না করে সংরক্ষণ করা। প্রতিদিন অল্প আঁচে বহুক্ষণ চুলার ওপর রেখে এ প্রক্রিয়ায় ঝুরা মাংস, কালা ভুনা, কিংবা স্রেফ ভুনা ইত্যাদি করা সবচেয়ে সহজ উপায় ছিল। অন্তত আশুরা পর্যন্ত এ মাংস দিয়ে চালানো হতো এই বিশ্বাসে যে, এতে পুণ্য নিহিত রয়েছে। আর ছিল ঢাকার বিখ্যাত জাহাজি কালিয়া। জয়তুনের তেলে রান্না করে জাহাজের কর্মীরা সেই খাবার নিয়ে যেত সমুদ্রযাত্রায়। পোর্সেলিনের পাত্রে ঢেকে রাখা হতো আর তোলার ক্ষেত্রে ব্যবহার করা হতো শুকনো কাঠের চামচ। এ খাবার এক বছর পর্যন্ত ভালো থাকত। চট্টগ্রামের কালা ভুনার ইতিহাসেও রয়েছে পারসিক মাংস সংরক্ষণের উত্তরাধিকার। বোরহানিতেও তাই (পারসিক আইরান থেকে অনুপ্রাণিত)।
গ্রাম আর শহরের ঈদের মেন্যুতে যে পার্থক্য ছিল, অন্তত গত শতকের শেষ দশক পর্যন্ত, সেটি যতটা না সামর্থ্যের, তার চেয়ে বেশি যোগাযোগব্যবস্থার কারণে। সময়ের আবর্তে যোগাযোগব্যবস্থা উন্নত হয়েছে, জেলা শহরগুলোতেও ঢাকার সুপার শপগুলো আসন গেড়েছে, ইন্টারনেট আছে সব জায়গায়। ফলে প্রত্যন্ত গ্রামে বসেও এখন দুনিয়ার সব প্রান্তের রেসিপি দেখা এবং সেগুলো তৈরির উপকরণ জোগাড় করা যায়। আরেকটি কারণ হলো, শহরে আমরা একক পরিবারে থেকে অভ্যস্ত, নাড়ির টানে গ্রামে ফেরত গেলে সেটি আবার যৌথ পরিবারে রূপ নেয়। এ বিপুলসংখ্যক মানুষের তিনবেলার খাবার, অন্তত দুবেলা নাশতা-পানির ব্যবস্থা করতেই বাড়ির বউ-ঝিদের প্রাণ ওষ্ঠাগত হওয়ার দশা। পিষে তৈরি করা মসলা থেকে শুরু করে রান্না পর্যন্ত তাই এখনো সরল প্রথার দেখা মেলে বাংলাদেশের বহু গ্রামে। মোটা চাল আর মাষকলাইয়ের ডালের ধোঁয়া তোলা খিচুড়ি, শুকনো মরিচ পুড়িয়ে সরিষার তেল, আমের ঝুরি আচার আর পেঁয়াজের মিশ্রণ দিয়ে মেখে পাশে কয়েক টুকরো কলিজা বা মাংসের কাছে পোলাও, বিরিয়ানি, কোরমা নস্যি! যদি সঙ্গে থাকে পুরো জ্ঞাতিগোষ্ঠীর লোকেরা, কোথায় আর এমন ধারা আছে শহরে? প্রতিদিন তো আর একই খাবার দিয়ে হয় না; তাই ক্ষুধার্তের দলকে ঠান্ডা করতে ঈদের পরদিন সকালে হয়তো চিতই পিঠা বা ছিটে রুটি দিয়ে মাংসের ঝোল; দুপুর বা রাতে চৌকো করে কাটা আলু আর ভুঁড়িভাজা দিয়ে ভাত বা লাল আটার রুটি; আবার কোনো সকালে নেহারি বা পায়া, চর্বি দিয়ে ডাল। পাটি বা মাদুর বিছিয়ে আয়েশ করে খাওয়া। সেমাই, পায়েস, ক্ষীর সবই একসময় রান্না হতো দেশি গরুর দুধে; যে গরু কখনোই দিনে এক বা দেড় লিটারের বেশি দুধ দেয়নি। কনডেন্সড মিল্ক দিয়ে শহরে রান্না হলেও এ শতকের গোড়াতেও তা ছিল গুরুচণ্ডালি দোষ; যেমনটি ছিল ঘি বা সরষের তেলের সঙ্গে সয়াবিন তেল মেশানো। আর ছিল রং চা। গরম মসলা আর আদা দেওয়া চায়ের হাঁড়ি একটি চুলা দখল করে রাখত অন্তত ১৮ ঘণ্টা, ঈদের এই কটি দিন।
শহুরে গুঁড়া মসলা, কৌটার দুধের রাজত্বে ঈদের ছুটির কদিনই তো গ্রামে সুখ মেলে দাদি-নানিদের হাতের বাটা মসলা, গোটা মসলার রান্নায়। অবশ্য এখন ঈদে গ্রামেও অনেক বাড়িতে রান্না হয় গুঁড়া মসলায়— সুবিধাজনক বলেই; তবে এ সুবিধার দাম আমরা চুকিয়ে যাচ্ছি স্বাদ ও স্বাস্থ্যের বিনিময়ে।
লেখক : ইতিহাস, ঐতিহ্য ও খাদ্যবিশারদ






