যেখানে ভূতের ভয়

আমি ভূতপ্রেতে বিশ্বাস করি না। কিন্তু বিশ্বাস করতে চাই। মানে, আমার সবসময় মনে হয়েছে, ভূত থাকলে ভালো হতো।
ভূতপ্রেত-অশরীরী আত্মারা যে নেই, এ নিয়ে আমার মধ্যে একপ্রকার আফসোস কাজ করে। আর কাজ করে নস্টালজিয়া। সেটি কীরকম?
সেটি এরকম যে, আমার শুধুই মনে হয়, আধুনিক যুগে ভূতদের আলাদা একটা অনুপস্থিতি তৈরি হয়েছে। ভূত নেই বটে, কিন্তু তাদের না থাকাটা এতকাল কোনো অনুপস্থিতি তৈরি করেনি। কিন্তু আমাদের বিজ্ঞানমনস্ক নিয়নের আলোজ্বলা নগরজীবন থেকে ভূতরা বিদায় নিয়েছে। একটা কল্পনার জমিন ফাঁকা করে দিয়ে তারা চলে গেছে।
অথচ একটা সময় আমাদের স্পর্শযোগ্য দূরত্বের মধ্যে ভূতপ্রেতদের বসবাস ছিল। বাঁশঝাড়ের অন্ধকারে, নির্জন বটতলায়, শ্মশানে, কুয়োতলায়, সিঁড়িঘরে ভূতদের আনাগোনা ছিল। আমি আমার শৈশবে এমন অনেক লোকজনের সাক্ষাৎ পেয়েছি, যারা নিজেরা ভূত দেখেছেন। ভূতদের সঙ্গে তাদের অ্যানকাউন্টার হয়েছে। যারা দেখেননি, তারা দেখার অপেক্ষায় ছিলেন। ভূত দেখার গল্প আমাদের চারপাশের বাতাসে ভেসে বেড়াত।
এখন আমি আর তেমন কাউকে পাই না, যারা ভূত দেখেছেন। এমনকি এমন কাউকেও পাই না, যারা ভূত দেখা কারও দেখা পেয়েছেন।
ভূতরা আমাদের ত্যাগ করে অনেক দূরে চলে গেছে। এই যাওয়া এমন এক শূন্যতা তৈরি করেছে, যেটি অন্য কোনো কিছু দিয়ে আমরা ভরাতে পারিনি। সেই শূন্যতা ভূতের কাহিনিকাররা শতসহস্র হরর গল্প লিখে আর সিনেমা বানিয়েও পূরণ করতে পারবেন না।
বাংলা সাহিত্যে অনেকেই ভূতের গল্প লিখেছেন। তাদের অনেকে খুব নামজাদা লেখক। তাদের অনেকে ভূতে বিশ্বাস করতেন। যেমন বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়। তবে তিনি নিজে ভূত দেখেছেন কি না, আমি জানি না।
হুমায়ূন আহমেদ বিজ্ঞানের লোক। তিনি ভূতে বিশ্বাস করতেন না। তবে বাংলা সাহিত্যের খুব সফল ভৌতিক কাহিনি লেখকদের একজন তিনি। সত্যজিৎ রায়ও আদিভৌতিক গল্প লিখেছেন। তারও ভূতপ্রেতে বিশ্বাস করার কথা নয়।
বাংলা সাহিত্যে সফল আদিভৌতিক গল্পের লেখকদের একজন শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় ভূতে বিশ্বাস করেন। শুধু তাই নয়, তিনি সেই বিরল লেখকদের একজন, যিনি নিজে ভূত দেখেছেন। একবার নয়, একাধিকার। আর তিনি সেই বিরল লোকদের একজন, যিনি ভূতে বিশ্বাস করলেও ভূতের ভয় পান না।
বাংলা সাহিত্যের সবচেয়ে সেলিব্রেটি লেখক রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ভূতে বিশ্বাস করতেন। শুধু তাই না, তিনি ভূত নামাতেন। যেটিকে বলা হয় প্রেতচর্চা, তিনি সেটি করতেন। শেষ জীবনে তিনি এ চর্চায় মেতেছিলেন। মৃত আত্মীয়স্বজন ও বন্ধু-বান্ধবের আত্মাকে তিনি নামিয়ে আনতেন। তাদের সঙ্গে কথা বলতেন। এ চর্চার একটা পশ্চিমা নাম আছে— প্ল্যাটচেট।
১৯২৯ সালের ৬ নভেম্বর জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়িতে প্ল্যানচেটের এরকম এক আসর বসেছিল। আসরের মধ্যমণি ছিলেন ৬৮ বছর বয়সী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। ছায়া ছায়া অন্ধকার ঘরে যার আত্মাকে ডেকে আনা হয়েছিল, তিনি সত্যজিৎ রায়ের বাবা সুকুমার রায়। মাত্র বছর-সাতেক আগে ৩৬ বছর বয়সে তার মৃত্যু হয়েছে। সুকুমার রায়ের আত্মার সঙ্গে অনেক বিষয়ে কথা হয় রবীন্দ্রনাথের। সত্যজিৎ রায়কে নিয়েও কিছু আলাপ হয়। যেমন সুকুমার রায় অনুরোধ করেন, সত্যজিৎ রায়কে যেন রবীন্দ্রনাথ তার বিশ্বভারতীতে স্থান দেন ছাত্র হিসেবে। এক জায়গায় রবীন্দ্রনাথ একটা অদ্ভুত বিষয়ে জানতে চান সুকুমার রায়ের কাছে। তিনি জিজ্ঞাসা করেন, ‘আর্থার কোনান ডয়েল শুনলুম পরলোক থেকে বার্তা পাচ্ছেন, কথা সত্যি?’ সুকুমার রায় জবাব দেন, ‘সত্যি। তবে বিস্তর কল্পনার মিশেলও আছে।’
এখানে কোনান ডয়েলের কথা এলো কেন? এলো কারণ, ওই সময় শার্লক হোমসের স্রষ্টা এই ব্রিটিশ লেখক মহাসমারোহে পরলোকচর্চা করছেন। রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে ডয়েলের যোগাযোগ হয়েছিল। সেটি এই প্রেতচর্চা নিয়েই। ভাবুন ব্যাপারটা। দুই মহাদেশে বসবাসকারী প্রায় সমবয়সী দুই লেখক ভূত নামাচ্ছেন। আর এ নিয়ে তারা নিজেদের মধ্যে চিঠি চালাচালিও করছেন। কোনান ডয়েলের এরকম একটি চিঠি পাওয়া যায়, যেখানে দেখা যায়, তিনি তার এক বন্ধুকে অনুরোধ করছেন ভারতে ‘টেগোর’ নামের এক ব্যক্তির কাছে একজন নির্ভরযোগ্য ‘মিডিয়ামকে’ পৌঁছে দিতে। ‘মিডিয়াম’ কী জিনিস? মিডিয়াম হচ্ছে আত্মাকে নামিয়ে আনার মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত ব্যক্তি। মৃত ব্যক্তির আত্মা এসে ভর করেন এ মিডিয়ামদের ওপর।
কোনান ডয়েল শার্লক হোমস নামে যে বিখ্যাত গোয়েন্দা চরিত্র সৃষ্টি করেছেন, সেই চরিত্র ভূতে বিশ্বাস করত না। অথচ ডয়েল শুধু ভূত নামানোর চর্চাই শুধু করতেন না, তিনি ইউরোপ জুড়ে এ আন্দোলনের রীতিমতো নেতায় পরিণত হয়েছিলেন। এ নিয়ে বিস্তর বইপত্র, প্রবন্ধ-নিবন্ধ লিখেছেন, আসরে আসরে বক্তৃতা দিয়ে বেরিয়েছেন।
ওই সময়কার ইউরোপের মহাকবি ডব্লিউ বি ইয়েটসও একই কাজ করেছেন। তিনি ‘গোস্ট ক্লাব’ নামে একটি সংগঠনের সদস্য হয়েছিলেন। তার স্ত্রীর ওপর মৃত আত্মারা ভর করত এবং ভূতগ্রস্ত স্ত্রীর হাত দিয়ে সেসব মৃত আত্মা অনেক সাহিত্যকর্মও লিখিয়ে নিয়েছিল। পরে তা বই আকারেও ছেপেছিলেন ইয়েটস।
এসব শুনলে আফসোস বাড়ে। ভূতরা আমাদের একুশ শতকের যান্ত্রিক জীবনটাকে আরও বেশি নীরস করে রেখে চলে গেছে। তবে তারা কতটা দূরে গেছে, আমি জানি না। তাদের ফিরিয়ে আনার কোনো পথ থাকলে আমি সবাইকে সেই পথ বেছে নিতে অনুপ্রাণিত করতাম।



