কতটুকু ঋণে কোরবানি মওকুফ হবে?

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
অনেকেই মনে করেন, ঋণ থাকলেই কোরবানি মাফ হয়ে যায়। বাস্তবে বিষয়টি এতটা সরল নয়। ইসলামি শরিয়তে ঋণের ধরন ও ব্যক্তির আর্থিক অবস্থার ভিত্তিতে এ বিষয়ে বিধান নির্ধারিত হয়।
ফিকহে হানাফি অনুযায়ী, জিলহজ মাসের ১০, ১১ অথবা ১২ তারিখ সূর্যাস্ত পর্যন্ত কারও কাছে যদি নিসাব পরিমাণ সম্পদ বিদ্যমান থাকে, তাহলে তার ওপর কোরবানি ওয়াজিব হবে। তবে এ হিসাব করার সময় তার ওপর থাকা তাৎক্ষণিক পরিশোধযোগ্য ঋণ বাদ দেওয়া হবে। ঋণ পরিশোধ করার পর যদি সম্পদ নিসাবের নিচে নেমে যায়, তাহলে তার ওপর কোরবানি ওয়াজিব হবে না। কারণ শরিয়তের দৃষ্টিতে তখন তিনি সাহেবে নিসাব হিসেবে গণ্য হবেন না।
১০ মে ২০২৬ অনুযায়ী, বাংলাদেশে বাজুস নির্ধারিত ২২ ক্যারেট মানের ১ ভরি (১১.৬৬৪ গ্রাম) রুপার দাম প্রায় ৫,৬০০-৫,৭০০ টাকার আশপাশে রয়েছে। সনাতন পদ্ধতির রুপার ভরি ৩,৪০০-৩,৫০০ টাকার মধ্যে। সে হিসাবে একজন ব্যক্তির ওপর কোরবানি ওয়াজিব হওয়ার জন্য মৌলিক প্রয়োজন বাদ দিয়ে সর্বনিম্ন ১ লাখ ৮২ হাজার টাকার থাকতে হবে (সনাতন পদ্ধতির ভরি হিসাব করে)।
এখন কারও কাছে মৌলিক প্রয়োজন বাদ দিয়ে ২ লাখ টাকা আছে, কিন্তু তার ৭০ হাজার টাকা জরুরি ঋণ রয়েছে। ঋণ বাদ দিলে তার কাছে থাকে ১ লাখ ৩০ হাজার টাকা, যা নিসাবের পরিমাণে পৌঁছায় না। সুতরাং তার ওপর কোরবানি আবশ্যক হবে না।
তবে সব ধরনের ঋণ একই বিধানের অন্তর্ভুক্ত নয়। বর্তমানে অনেকেই ব্যবসা সম্প্রসারণ, বিনিয়োগ বা সম্পদ বৃদ্ধির জন্য ব্যাংক কিংবা অন্য উৎস থেকে বড় অঙ্কের ঋণ গ্রহণ করেন। এ ধরনের ঋণকে কেন্দ্র করে অনেক আলেম মত দিয়েছেন যে, ব্যবসায়িক সম্পদ ও চলমান আর্থিক সক্ষমতা বিবেচনায় শুধু ঋণের অজুহাতে কোরবানি পরিত্যাগ করা উচিত নয়। কারণ বাস্তবে তারা আর্থিকভাবে সক্ষমই থাকেন।
অন্যদিকে, যারা মৌলিক প্রয়োজন পূরণে বাধ্য হয়ে ঋণগ্রস্ত হয়েছেন, যেমন চিকিৎসা, সংসার পরিচালনা বা জরুরি জীবনযাপনের খরচের জন্য ঋণ নিয়েছেন, তাদের ক্ষেত্রে ঋণ বাদ দিয়ে নিসাব হিসাব করা হবে। ঋণ পরিশোধের পর নিসাব না থাকলে তাদের ওপর কোরবানি ওয়াজিব হবে না।
কোরবানি ও জাকাতের নিসাব এক নয়
অনেকেই কোরবানি ও জাকাতের নিসাবকে এক মনে করেন। অথচ এ দুই ইবাদতের নিসাব নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ কিছু পার্থক্য রয়েছে।
প্রথম পার্থক্য হলো সময়ের ক্ষেত্রে। জাকাত ফরজ হওয়ার জন্য নিসাব পরিমাণ সম্পদ পূর্ণ এক চান্দ্র বছর ধরে মালিকানায় থাকা আবশ্যক। কিন্তু কোরবানির ক্ষেত্রে এক বছর অতিক্রান্ত হওয়া শর্ত নয়। বরং জিলহজের ১০ থেকে ১২ তারিখের মধ্যে কোনো ব্যক্তি নিসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক হলেই তার ওপর কোরবানি ওয়াজিব হবে।
দ্বিতীয় পার্থক্য হলো সম্পদের ধরনে। জাকাত সাধারণত স্বর্ণ, রুপা, নগদ অর্থ এবং ব্যবসায়িক পণ্যের ওপর ফরজ হয়। কিন্তু কোরবানির ক্ষেত্রে হিসাব আরও বিস্তৃত। মৌলিক প্রয়োজনের অতিরিক্ত যেকোনো সম্পদই এখানে বিবেচনায় আসবে।
যেমন— অতিরিক্ত জমি, অতিরিক্ত বাড়ি, প্রয়োজনের অতিরিক্ত গাড়ি, অতিরিক্ত মূল্যবান পোশাক, সৌন্দর্যবর্ধক আসবাবপত্র, অলংকার বা অপ্রয়োজনীয় সঞ্চিত সম্পদ।
এসব সম্পদের সম্মিলিত মূল্য যদি নিসাব পরিমাণে পৌঁছে যায়, তাহলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির ওপর কোরবানি ওয়াজিব হবে, যদিও সেসব সম্পদের ওপর জাকাত ফরজ নাও হতে পারে।
এ কারণেই অনেক সময় দেখা যায়, কারও ওপর জাকাত ফরজ নয়; কিন্তু কোরবানি ওয়াজিব হয়ে যায়। ইসলামি শরিয়ত এভাবেই মানুষের সামর্থ্য ও সম্পদের প্রকৃতি বিবেচনা করে প্রতিটি ইবাদতের বিধান নির্ধারণ করেছে।
তথ্যসূত্র: বাদায়েউস সানায়ে ৫/৬৪, মুলতাকাল আবহুর পৃ. ৩৩৪, ফাতাওয়ায়ে হিন্দিয়া ৫/২৯২, রদ্দুল মুহতার ৬/৩২১, আল ফাতাওয়াল বাযযাযিয়াহ ৬/২৮৭, ফাতাওয়ায়ে ফকিহুল মিল্লাত ১১/১৮৮-২০০




