কোরবানির মাংস বণ্টনে রাসুল (সা.)-এর ভারসাম্যপূর্ণ নীতি

ছবি: এআই
ঈদুল আজহার অন্যতম প্রধান শিক্ষা হলো ত্যাগ ও ভাগাভাগির মানসিকতা। কোরবানি এমন এক ইবাদত, যা মানুষের অন্তরে আল্লাহভীতি, আত্মসমর্পণ ও মানবিক সহমর্মিতা জাগ্রত করে। এ ইবাদতের মাধ্যমে একজন মুমিন আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য নিজের প্রিয় সম্পদ উৎসর্গ করেন এবং সমাজের অসহায় ও দরিদ্র মানুষের আনন্দেও শরিক হন। তাই কোরবানি কেবল ব্যক্তিগত ইবাদত নয়; বরং এটি সামাজিক সৌহার্দ্য ও ভ্রাতৃত্ববোধ গড়ে তোলারও এক গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম।
পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা বলেছেন, ‘আপনি আপনার প্রতিপালকের উদ্দেশ্যে নামাজ পড়ুন এবং কোরবানি করুন।’ (সুরা কাউসার, আয়াত: ২)
অন্য আয়াতে এসেছে, ‘বলুন, নিশ্চয়ই আমার নামাজ, আমার কোরবানি, আমার জীবন ও আমার মরণ সবই আল্লাহর জন্য, যিনি সৃষ্টিকুলের প্রতিপালক।’ (সুরা আনআম, আয়াত: ১৬২)
কোরবানির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো এর গোশত সঠিকভাবে বণ্টন করা। ইসলাম কোরবানিকে শুধু ব্যক্তিগত ভোগের বিষয় বানায়নি; বরং এর মাধ্যমে সমাজে সহমর্মিতা, ভ্রাতৃত্ব ও সামাজিক ভারসাম্য প্রতিষ্ঠার শিক্ষা দিয়েছে। তাই কোরবানির গোশত আত্মীয়স্বজন, প্রতিবেশী ও গরিবদের মাঝে বণ্টন করা সুন্নাহসম্মত আমল।
পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা বলেছেন, ‘তোমরা তা থেকে খাও এবং অভাবগ্রস্ত দরিদ্র লোকদের খাওয়াও।’ (সুরা হজ, আয়াত: ২৮)
আরেক আয়াতে বলা হয়েছে, ‘তোমরা নিজেরাও খাও এবং অভাবী ও প্রার্থীকে খাওয়াও।’ (সুরা হজ, আয়াত: ৩৬)
এ আয়াতগুলো থেকে স্পষ্ট বোঝা যায়, কোরবানির গোশত শুধু নিজের জন্য জমা করে রাখা ইসলামের উদ্দেশ্য নয়; বরং এর মাধ্যমে সমাজের দরিদ্র মানুষের মুখেও হাসি ফোটানো কাম্য।
রাসুলুল্লাহ (সা.) নিজেও কোরবানির গোশত বণ্টনের ব্যাপারে অত্যন্ত যত্নবান ছিলেন। আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) কোরবানির গোশতের এক অংশ নিজের পরিবারকে খাওয়াতেন, এক অংশ গরিব প্রতিবেশীদের দিতেন এবং এক অংশ ফকির-মিসকিনদের জন্য বণ্টন করতেন। (মিরআতুল মাফাতিহ, হাদিস: ১৪৯৩-এর আলোচনা; ইরওয়াউল গালিল, হাদিস: ১১৬০)
আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) কোরবানির গোশত তিন ভাগ করতেন। এক ভাগ নিজেরা খেতেন, এক ভাগ আত্মীয়স্বজন ও পরিচিতদের দিতেন এবং এক ভাগ গরিব-মিসকিনদের জন্য নির্ধারণ করতেন। (সুবুলুস সালাম শরহ বুলুগুল মারাম, ৪/১৮৮)
এ কারণেই বহু ফকিহ ও মুহাদ্দিস কোরবানির গোশত তিন ভাগ করা মুস্তাহাব বলেছেন। ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল ও ইমাম শাফেয়ী (রহ.)-এর মতও এমনই। (সুবুলুস সালাম, ৪/১৮৮; আল-মুগনী, ১১/১০৮)
তবে শরিয়ত এখানে কোনো কঠোর বাধ্যবাধকতা আরোপ করেনি। পরিস্থিতি ও প্রয়োজন অনুযায়ী বণ্টনে কম-বেশি করা যাবে। যদি পরিবার বড় হয়, তাহলে নিজের জন্য কিছু বেশি রাখা যেতে পারে। আবার এলাকায় দরিদ্র মানুষের সংখ্যা বেশি হলে তাদের অংশ বাড়িয়ে দেওয়াও উত্তম। ইসলামের সৌন্দর্য এখানেই যে, এটি মানবিক প্রয়োজন ও সামাজিক বাস্তবতাকে গুরুত্ব দেয়।
বর্তমান সমাজে একটি দুঃখজনক প্রবণতা দেখা যায়, অনেকে কোরবানির অধিকাংশ গোশত ফ্রিজে জমা করে রাখেন; অথচ আশপাশের দরিদ্র পরিবারগুলো সামান্য অংশও পায় না। এটি কোরবানির মূল শিক্ষা ও আত্মত্যাগের চেতনার পরিপন্থী। কোরবানি কেবল ধনীদের আনন্দের উপলক্ষ নয়; বরং এটি দরিদ্র মানুষের অধিকার নিশ্চিত করারও একটি মাধ্যম।
আল্লাহ তাআলা স্পষ্টভাবে ঘোষণা করেছেন, ‘আল্লাহর কাছে পৌঁছে না কোরবানির গোশত কিংবা রক্ত; বরং পৌঁছে তোমাদের তাকওয়া।’ (সুরা হজ, আয়াত: ৩৭)
অর্থাৎ কোরবানির প্রকৃত উদ্দেশ্য হলো অন্তরের বিশুদ্ধতা, আত্মত্যাগ এবং আল্লাহভীতি অর্জন করা। তাই যে কোরবানি মানুষের হৃদয়ে উদারতা সৃষ্টি করে না, গরিবের পাশে দাঁড়ানোর মানসিকতা তৈরি করে না, সেই কোরবানির চেতনা অসম্পূর্ণ থেকে যায়।
মুসলিম স্কলারগণ পরামর্শ দিয়ে বলেছেন যে, মহল্লাভিত্তিকভাবে কোরবানির গোশত সংগ্রহ করে যারা কোরবানি দিতে পারেনি তাদের মাঝে সুশৃঙ্খলভাবে বণ্টন করা একটি উত্তম উদ্যোগ হতে পারে। এতে সমাজে সৌহার্দ্য বৃদ্ধি পাবে এবং দরিদ্র মানুষেরাও ঈদের আনন্দে শরিক হওয়ার সুযোগ পাবে। (মাসায়িলে কোরবানি ও আকিকা, পৃষ্ঠা: ২৩)
তবে এ ক্ষেত্রে একটি ভুল রীতি পরিহার করা জরুরি। অনেক সময় দেখা যায়, সব গোশত একত্রিত করে গরিবদের অল্প কিছু দিয়ে বাকিটা আবার নিজেদের মধ্যেই ভাগ করে নেওয়া হয়। আলেমরা একে কৃপণতার পরিচয় বলে উল্লেখ করেছেন। কোরবানির প্রকৃত শিক্ষা হলো উদারতা, সংকীর্ণতা নয়। যদিও কেউ নিজ কোরবানির সবটুকুই নিজের জন্য রেখে দিলেও তার কোরবানি আদায় হয়ে যাবে; কিন্তু তা সুন্নাহ পদ্ধতি পরিপন্থী কাজ হবে।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমরা খাও, অন্যকে খাওয়াও এবং সঞ্চয়ও করো।’ (মুসলিম, হাদিস: ১৯৭১; তিরমিজি, হাদিস: ১৫১০)
অতএব কোরবানির মাংস বণ্টনে রাসুল (সা.)-এর রীতি ছিল ভারসাম্যপূর্ণ, মানবিক ও সমাজকল্যাণমুখী। তিনি নিজে খেয়েছেন, আত্মীয়-প্রতিবেশীকে খাইয়েছেন এবং দরিদ্র মানুষের হক আদায় করেছেন। আজকের মুসলিম সমাজ যদি এ সুন্নাহকে জীবন্ত করতে পারে, তাহলে কোরবানি শুধু একটি আনুষ্ঠানিক ইবাদত হবে না; বরং তা সমাজে ভালোবাসা, সহমর্মিতা ও ভ্রাতৃত্বের এক জীবন্ত নিদর্শনে পরিণত হবে।






