১৪ বছর পর এভারেস্টের চূড়ায় বাংলাদেশি নারী নুরুন্নাহার নিম্নি

নুরুন্নাহার নিম্নি। ছবি: সংগৃহীত
দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে এভারেস্টের চূড়ায় বাংলাদেশের পতাকা উড়িয়েছেন পর্বতারোহী নুরুন্নাহার নিম্নি। গতকাল মঙ্গলবার ভোরে বিশ্বের সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গ মাউন্ট এভারেস্ট জয় করেন তিনি। বিষয়টি নিশ্চিত করেছে বাংলা মাউন্টেইনিয়ারিং অ্যান্ড ট্রেকিং ক্লাব (বিএমটিসি)।
এর মধ্য দিয়ে ১৪ বছর পর কোনো বাংলাদেশি নারী এভারেস্টের শিখরে উঠলেন। এর আগে ২০১২ সালের ১৯ মে প্রথম বাংলাদেশি নারী হিসেবে এভারেস্ট জয় করেন নিশাত মজুমদার। একই বছরের ২৬ মে শিখরে পৌঁছান ওয়াসফিয়া নাজরীন।
এভারেস্ট অভিযানের উদ্দেশ্যে গত ১১ এপ্রিল ঢাকা থেকে নেপালে যান নুরুন্নাহার নিম্নি। কাঠমান্ডু থেকে লুকলা হয়ে পৌঁছান এভারেস্ট বেজক্যাম্পে। সেখানে কয়েক সপ্তাহ ধরে উচ্চতাজনিত পরিবেশের সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নেওয়ার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেন তিনি।
গত ১৭ মে চূড়ান্ত সামিট প্রচেষ্টার জন্য বেজক্যাম্প ত্যাগ করেন নিম্নি। ধাপে ধাপে বিভিন্ন ক্যাম্প অতিক্রম করে ২৩ মে পৌঁছান ক্যাম্প-৪-এ। সেদিন শিখরের উদ্দেশে যাত্রা শুরু করলেও প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে নিরাপত্তার স্বার্থে নিচে নেমে আসতে বাধ্য হন।
পরে কয়েক দিন ক্যাম্প-২-এ অবস্থান করে অনুকূল আবহাওয়ার অপেক্ষা করেন তিনি। আবহাওয়ার উন্নতি হলে ২৫ মে ফের সামিটের উদ্দেশে যাত্রা শুরু করেন। সোমবার (২৬ মে) আবারও পৌঁছান ক্যাম্প-৪-এ। সেখান থেকে সন্ধ্যায় চূড়ান্ত আরোহণ শুরু করে মঙ্গলবার নেপাল সময় সকাল ৫টা ২৪ মিনিটে এভারেস্টের চূড়ায় ওঠেন। পুরো অভিযানে তার সঙ্গে ছিলেন নেপালের এইটকে এক্সপেডিশনের একজন শেরপা।
বর্তমানে পূবালী ব্যাংক পিএলসির জেনারেল ব্যাংকিং বিভাগের প্রিন্সিপাল অফিসার হিসেবে কর্মরত নুরুন্নাহার নিম্নি। তাঁর এভারেস্ট অভিযানের পৃষ্ঠপোষকতাও করেছে প্রতিষ্ঠানটি। রংপুরে বেড়ে ওঠা নিম্নি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগ থেকে পড়াশোনা শেষ করেছেন।
পাহাড়ের প্রতি তার ভালোবাসার শুরু ২০০৬ সালে, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম বর্ষে চন্দ্রনাথ পাহাড়ে একটি ফিল্ডওয়ার্কে অংশ নেওয়ার মাধ্যমে। এরপর বান্দরবানের পাহাড়ে নিয়মিত ঘোরাঘুরি তার আগ্রহকে আরও গভীর করে। চাকরিজীবনে প্রবেশের পরও সেই আগ্রহ অটুট থাকে। ভুটান, ভারতের সিকিম এবং নেপালের বিভিন্ন পর্বতাঞ্চলে ট্রেকিংয়ের অভিজ্ঞতা অর্জন করেন তিনি।
২০১৯ সালে নেপালের অস্ট্রেলিয়ান ক্যাম্প ভ্রমণের পর আরও বড় স্বপ্ন দেখতে শুরু করেন নিম্নি। ২০২০ সালে এভারেস্ট বেজক্যাম্প ট্রেক সম্পন্ন করার অভিজ্ঞতা তাকে পেশাদার পর্বতারোহণের পথে এগিয়ে দেয়। ২০২২ সালে ভারতের দার্জিলিংয়ের হিমালয়ান মাউন্টেনিয়ারিং ইনস্টিটিউটে প্রশিক্ষণ নেন। একই বছর যুক্ত হন বাংলা মাউন্টেইনিয়ারিং অ্যান্ড ট্রেকিং ক্লাবের সঙ্গে। এই সংগঠনের ব্যানারেই সফলভাবে এভারেস্ট অভিযান সম্পন্ন করলেন তিনি।
বিশ্বের সর্বোচ্চ শৃঙ্গ মাউন্ট এভারেস্ট প্রথম জয় করা হয় ১৯৫৩ সালের ২৯ মে। সেদিন নিউজিল্যান্ডের পর্বতারোহী এডমন্ড হিলারি এবং নেপালের কিংবদন্তি শেরপা তেনজিং নোরগে প্রথমবারের মতো শিখরে পৌঁছান।
বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথম এভারেস্টজয়ী হলেন মুসা ইব্রাহীম, যিনি ২০১০ সালের ২৩ মে শিখরে আরোহণ করেন। এরপর এম এ মুহিত, নিশাত মজুমদার ও ওয়াসফিয়া নাজরীনের সাফল্যে সমৃদ্ধ হয় বাংলাদেশের পর্বতারোহণের ইতিহাস। ২০১৩ সালে এভারেস্টজয়ী পঞ্চম বাংলাদেশি সজল খালেদ শিখর থেকে ফেরার পথে মারা যান।
দীর্ঘ বিরতির পর ২০২৪ সালে এভারেস্ট জয় করেন বাবর আলী। আর ২০২৫ সালে কক্সবাজার সমুদ্রসৈকত থেকে হেঁটে এভারেস্ট শিখরে পৌঁছে আলোচনায় আসেন ইকরামুল হাসান শাকিল।
সবশেষে সেই ইতিহাসে নতুন অধ্যায় যোগ করলেন নুরুন্নাহার নিম্নি। ১৪ বছর পর বাংলাদেশের কোনো নারী হিসেবে এভারেস্ট জয় করে তিনি দেশের পর্বতারোহণ অঙ্গনে নতুন অনুপ্রেরণার নাম হয়ে উঠলেন।





