হজের সফরে ভুলভ্রান্তি
যেসব ভুলে অপূর্ণ থেকে যায় আপনার বহু সাধনার হজ

সংগৃহীত ছবি
হজ এমন এক অনন্য ইবাদত, যার নিয়ত করার মুহূর্তেই বান্দা আল্লাহতাআলার কাছে সহজতা ও কবুলিয়তের জন্য দোয়া করে। এ থেকেই বোঝা যায়, অন্যান্য ইবাদতের তুলনায় হজের আমল কতটা পরিশ্রমসাধ্য ও জটিল। তাই হজ আদায়ের জন্য শুধু মাসয়ালা জানা যথেষ্ট নয়; বরং এর সঠিক পদ্ধতি, সময়োপযোগী কৌশল এবং অভিজ্ঞদের পরামর্শও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
বাস্তবে দেখা যায়, হজের অনেক ভুল হয় জ্ঞানের অভাবে নয়, বরং অবহেলা ও অসচেতনতার কারণে। অথচ সামান্য সতর্কতা ও প্রস্তুতি নিলে এসব ভুল সহজেই এড়িয়ে চলা সম্ভব। এজন্য নিচে হজ পালনের সময় সাধারণত যে ভুলগুলো হয়ে থাকে, সেগুলো আমরা একে একে ধারাবাহিকভাবে আমাগীর সময় পাতায় পাঠকদের সামনে তুলে ধরব ইনশাআল্লাহ। যাতে হাজিরা সচেতন থেকে সঠিকভাবে হজ আদায় করতে পারেন।
আজ আমরা তুলে ধরব ইহরামবিষয়ক ভ্রান্তিগুলো
ইহরামের দুই রাকাত নামাজের জন্য ইহরাম বিলম্বিত করা : ইহরাম বাঁধার আগে দুই রাকাত নামাজ পড়ার নিয়ম আছে। তাই অনেককে দেখা যায়, কোনো কারণে এই দুই রাকাত নামাজের সুযোগ না পাওয়ার কারণে ইহরাম এতটা বিলম্বিত করতে থাকেন যে, ইহরাম ছাড়াই মিকাতের ভেতর পর্যন্ত চলে যান। অথচ ইহরাম ছাড়া মিকাত অতিক্রম করা জায়েজ নয়। অথচ ইহরামের আগে নামাজ পড়া সব মাজহাবেই মুস্তাহাব; জরুরি কিছু নয়। পক্ষান্তরে ইহরাম ছাড়া মিকাত অতিক্রম করা নাজায়েজ। সুতরাং ইহরামের আগে নামাজের সুযোগ পেলে তো তা আদায় করে নিতে পারেন। আর যদি সুযোগ না থাকে, তাহলে ইহরাম বাঁধাকে বিলম্ব করা যাবে না। (সহিহ মুসলিম ১/৩৭৬; মুসান্নাফ ইবনে আবি শায়বা হাদিস : ১২৯০০; মানাসিক মোল্লা আলী কারী পৃ. ৯৮; আলমুগনী ইবনে কুদামা ৫/৮১; ফাতাওয়া হিন্দিয়া ১/২২৩; রদ্দুল মুহতার ২/৪৮১-৪৮২)
ইহরাম বাঁধার নিয়মসংক্রান্ত ভ্রান্তিগুলো : অনেকে মনে করে থাকে যে, ইহরামের কাপড় পরে নামাজ পড়ার পর নিয়ত করলেই ইহরাম সম্পন্ন হয়ে যায়। এ ধারণা ভুল। এগুলো দ্বারা ইহরাম সম্পন্ন হয় না। নিয়ত আরবিতে করা হোক বা বাংলাতে, সশব্দে করা হোক বা মনে মনে এর দ্বারা ইহরাম সম্পন্ন হয় না; বরং নিয়তের পর তালবিয়া পড়লে ইহরাম পূর্ণ হয়। কেননা ইহরাম সম্পন্ন হয় দুইটি কাজের সমন্বয়ে : (১) হজ বা ওমরার নিয়ত করা। ২. তালবিয়া পড়া। (জামে তিরমিজি ১/১০২; গুনইয়াতুন নাসিক পৃ. ৬৫; মানাকি মোল্লা আলী কারী পৃ. ৮৯)
মক্কাগামীদের জন্য জিদ্দায় ইহরাম বাঁধা : কেউ কেউ আগে থেকেই ইহরাম বাঁধা ঝামেলা মনে করে এবং ভাবে যে, ইহরাম বেঁধে নিলেই তো ইহরামের নিষেধাজ্ঞা আরোপিত হয়ে যাবে। বিমান যেহেতু জিদ্দায় অবতরণ করবে, তাই জিদ্দায় ইহরাম বাঁধার ইচ্ছায় ইহরামকে বিলম্বিত করে। অথচ মিকাতের বাইরের হাজিদের জন্য ইহরাম ছাড়া মিকাত অতিক্রম করা জায়েজ নেই। উপমহাদেশ থেকে গমনকারী হাজিদের জন্য মিকাত হলো কারনুল-মানাজিল ও জাতু ইরক, যা অতিক্রম করেই জেদ্দায় যেতে হয়। যদি কেউ বিনা ইহরামে মিকাত অতিক্রম করেন, তবে তার জন্য পুনরায় মিকাতে ফিরে এসে ইহরাম বেঁধে যাওয়া জরুরি। যদি তা না করেন, তবে দম ওয়াজিব হবে। যেহেতু বিমানে থাকা অবস্থায় মিকাতের জায়গা নির্ধারণ করা কঠিন বা ওই সময় ঘুমিয়ে পড়া, অন্যমনস্ক থাকা ইত্যাদি হতে পারে। তাই বিমানে চড়ার আগে কিংবা বিমানে উঠেই ইহরাম বেঁধে নেওয়ার কথা বলা হয়। (মুসান্নাফ ইবনে আবি শায়বা হাদিস : ১৫৭০২; মানাসিক মোল্লা আলী কারী পৃ. ৮৪; গুনইয়াতুন নাসিক পৃ. ৬০; ফাতাওয়া হিন্দিয়া ১/২২১; আলমুগনী ইবনে কুদামা ৫/৭৬; রদ্দুল মুহতার ২/৪৭৭)
সেলাইবিহীন কাপড় বা চপ্পলের জন্য ইহরাম বিলম্বে বাঁধা : কেউ কেউ ইহরামের কাপড় না পরে বিমানে উঠে যায়। অথবা মদিনা থেকে গাড়িতে উঠে পড়ে। এরপর যখন গাড়ি বা বিমানের মধ্যে পরিধানের কাপড় বদলিয়ে ইহরামের কাপড় পরা কষ্টকর হয় কিংবা কাপড় লাগেজে থেকে যায়। তখন তারা সেলাইবিহীন কাপড় পরতে না পারার কারণে ইহরাম বিলম্বিত করতে থাকে। এমনকি ইহরাম ছাড়া মিকাত অতিক্রম করে ফেলে। ফলে দম ওয়াজিব হয়ে যায়। অথচ মিকাত অতিক্রমের আগে সেলাইযুক্ত কাপড়ের অবস্থায়ই যদি ইহরাম বেঁধে নিত এবং গাড়ি বা বিমান থেকে অবতরণের পরেই ইহরামের কাপড় পরে নিত, তবে তার অন্যায়টা দম ওয়াজিব হওয়ার মতো বড় হতো না। ইহরাম অবস্থায় এ কয়েক ঘণ্টা (১২ ঘণ্টার কম) সেলাই করা কাপড় পরে থাকার কারণে একটি পূর্ণ সদকা ফিতর আদায় করে দিলেই চলত। (জামে তিরমিজি ১/১৭১; মানাসিক মোল্লা আলী কারী পৃ. ৩০০; ফাতাওয়া হিন্দিয়া ১/২৪২; রদ্দুল মুহতার ২/৫৪৭)
ইহরামের কাপড় পরিবর্তন করা যাবে না : কেউ কেউ মনে করে, যে কাপড়ে ইহরাম বাঁধা হয়েছে সে কাপড় হালাল (ইহরাম শেষ) হওয়ার আগ পর্যন্ত বদলানো যাবে না। এটা একটা ভুল ধারণা। ওই কাপড় নাপাক না হলেও বদলানো যাবে। (মুসান্নাফ ইবনে আবি শায়বা হাদিস : ১৫০১০, ১৫০১১; মানাসিক মোল্লা আলী কারী পৃ. ৯৮; গুনইয়াতুন নাসিক পৃ. ৭১)
তাওয়াফের সময় ছাড়াও ইজতিবা করা : অনেককে দেখা যায়, ইহরামের প্রথম থেকেই ইজতিবা (বাম কাঁধের উপর চাদর রেখে ডান বগলের নিচ দিয়ে নিয়ে পরিধান করা) করে থাকে এবং হালাল হওয়া পর্যন্ত এ অবস্থায় থাকাকে শরয়ি হুকুম মনে করে। এটি ভুল। এভাবে নামাজ পড়লে নামাজ মাকরূহ হবে। আবার কেউ কেউ তাওয়াফের সময় ইজতিবা করে এবং এ অবস্থায় সাঈ করে থাকে এবং তাওয়াফের মতো সাঈতেও ইজতিবা করা শরয়ি বিধান মনে করে। অথচ সাঈতে ইজতিবার বিধান নেই। এমনকি সব তাওয়াফেও এটি সুন্নত নয়; বরং যে তাওয়াফের পর সাঈ করতে হয় শুধু সেই তাওয়াফেই ইজতিবা করতে হয়। সুতরাং নফল তাওয়াফে ইজতিবা নেই। কারণ নফল তাওয়াফের পর সাঈ নেই। (ফাতাওয়া হিন্দিয়া ১/২২৫; মানাসিক মোল্লা আলী কারী পৃ. ১২৯; আলমুগনী ইবনে কুদামা ৫/২১৭)
তামাত্তুকারীর একত্রে হজ ও ওমরার ইহরামের নিয়তে তালবিয়া পড়া : কোনো কোনো তামাত্তু হজকারী প্রথমে ইহরাম বাঁধার সময় একত্রে হজ ও ওমরার নিয়ত করে ফেলে। এ ভুলটি অনেকেই পরস্পর দেখাদেখি করে কাজ করার কারণে হয়ে থাকে।
মূলত হজে তামাত্তুর ক্ষেত্রে নিয়ম হলো, প্রথমে শুধু ওমরার নিয়ত করবে। বাইতুল্লাহ পৌঁছে ওমরার কাজ সেরে ফেললে হালাল হবে। তারপর আবার হজের সময় হজের নিয়তে ইহরাম বাঁধবে। (সহিহ বুখারি ১/২১২; ফাতাওয়া হিন্দিয়া ১/২৩৮; মানাসিক মোল্লা আলী কারী পৃ. ২৭১; আলমুগনী ইবনে কুদামা ৫/৮২; আদ্দুররুল মুখতার ২/৫৩৫-৫৩৭)
ইহরাম অবস্থায় মহিলাদের চেহারা খোলা রাখা : ইহরাম অবস্থায়ও মহিলাদের চেহারার পর্দা করা জরুরি। যেহেতু নারী-পুরুষ সবার জন্যই এ অবস্থায় চেহারায় কাপড় লাগানো নিষেধ, তাই অনেক মহিলা মনে করে যে, ইহরাম বাঁধার পর চেহারা খোলা রাখতে হবে। চেহারার পর্দা করা যাবে না। ফলে পর্দানশীন মা-বোনদের অনেককেই পুরো হজের সফরে ইহরাম অবস্থায় চেহারা খুলে চলাফেরা করতে দেখা যায়। অথচ এ ধারণা ঠিক নয়। চেহারায় কাপড়ের স্পর্শ ছাড়াও চেহারার পর্দা করা সম্ভব। এজন্য আজকাল ক্যাপ পাওয়া যায়, যা পরিধান করলে মুখের পর্দাও হয়ে যায়, আবার মুখে কাপড় না লাগানোর উপরও আমল হয়ে যায়। প্রকাশ থাকে যে, ক্যাপের উপর দিয়ে নেকাব পরিধান করলে বাতাসে কিংবা চলাফেরার সময় অনেক ক্ষেত্রে নেকাবের কাপড় চেহারায় লেগে যায়। এতে অনেকে বিব্রত হন যে, না জানি ইহরাম পরিপন্থী হয়ে গেল কি না। কিন্তু মাসয়ালা হলো, এত অল্প সময় লাগলে কোনো অসুবিধা হয় না। তাই এই পন্থা অবলম্বন করে হলেও চেহারার পর্দা করা জরুরি। (মুসান্নাফ ইবনে আবি শায়বা হাদিস : ১৪৫৩৯, ১৪৫৪০; সুনানে আবু দাউদ ১/২৫৪; হিন্দিয়া ১/২৩৮; মানাসিক ১১৫; আলমুগনী ইবনে কুদামা ৫/১৫৪; রদ্দুল মুহতার ২/৪৮৮, ৫২৭)
ইহরাম অবস্থায় বাইতুল্লাহ স্পর্শ করা : বাইতুল্লাহর দেয়ালে ও গিলাফে নিচ থেকে প্রায় ৭/৮ ফুট পরিমাণ চতুর্দিকেই সুগন্ধি লাগানো থাকে, তাই যেকোনো অংশে হাত লাগানোর দ্বারা হাতে সুগন্ধি লেগে যায়, যা ইহরাম অবস্থায় নিষিদ্ধ।
মুমিন বান্দা যখন বিরাট ত্যাগ-তিতিক্ষার পর অনেক চড়াই-উতরাই পেরিয়ে বাইতুল্লাহ শরিফের একেবারে কাছে পৌঁছে যায়, তখন আবেগের বশবর্তী হয়ে ইহরামের অবস্থার কথা ভুলে গিয়ে বাইতুল্লায় হাত লাগায়, আলিঙ্গন করে। ফলে ইহরাম অবস্থায় অঙ্গ-প্রত্যঙ্গে সুগন্ধি লেগে যায়। তাই ইহরাম অবস্থায় গিলাফে বা কাবাঘরে হাত দেওয়া যাবে না। এ সময় আবেগের বশবর্তী না হয়ে হুঁশকে কাজে লাগানো প্রয়োজন। একটু সতর্ক হলেই এ বড় ভুল থেকে বেঁচে থাকা সম্ভব। (সহিহ মুসলিম ১/৩৭৩; ফাতাওয়া হিন্দিয়া ১/১২৪; আলমুগনী ইবনে কুদামা ৫/১৪০; আদ্দুররুল মুখতার ২/৪৮৭)
আল্লাহতাআলা আমাদের সবাইকে শুদ্ধভাবে হজ আদায়ের তাওফিক দান করুন।
উৎস : আল-কাউসার, নভেম্বর ২০০৯ সংখ্যায় প্রকাশিত মাওলানা মুহাম্মাদ ইয়াহইয়া রচিত হজবিষয়ক ভুলভ্রান্তি প্রবন্ধ।
(…. চলবে ইনশাআল্লাহ)

