সন্তানদের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ার ইসলামী শিক্ষা

প্রতীকী ছবি
পরিবারে সন্তানের সঙ্গে সুন্দর সম্পর্ক গড়ে ওঠা কেবল আবেগের বিষয় নয়, বরং এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ ইসলামী দায়িত্ব। অনেক সময় দেখা যায়, সন্তান বাবা-মাকে ভয় পাওয়ার কারণে মনের কথা বলতে পারে না। ফলে ভুল সিদ্ধান্ত, মানসিক চাপ কিংবা খারাপ সঙ্গের মতো সমস্যায় ভোগে। এক সময় পরিবার থেকে দূরে সরে যায়। অথচ ইসলামের শিক্ষা হলো, সন্তানকে এমন পরিবেশ দেওয়া, যেখানে সে বাবা-মাকে অভিভাবকের পাশাপাশি বিশ্বস্ত বন্ধু হিসেবেও পায়।
পবিত্র কোরআনে লুকমান (আ.) ও তার সন্তানের কথোপকথন অত্যন্ত শিক্ষণীয়। তিনি উপদেশ দেওয়ার সময় স্নেহভরা ভাষায় বলেন, ‘হে আমার প্রিয় পুত্র...’। লক্ষণীয় বিষয় হলো, তিনি আদেশের ভাষা নয়; ভালোবাসা, যুক্তি ও আন্তরিকতার ভাষা ব্যবহার করেছেন। এটি প্রমাণ করে, সন্তানকে শিক্ষা দেওয়ার ক্ষেত্রে কোমল আচরণ ও সংলাপের গুরুত্ব ইসলামে কত বেশি।
রাসুলুল্লাহ (সা.) ছিলেন শিশু ও কিশোরদের সর্বশ্রেষ্ঠ বন্ধু। তিনি শিশুদের সালাম দিতেন, তাদের সঙ্গে কথা বলতেন, রসিকতা করতেন এবং তাদের অনুভূতির মূল্য দিতেন। আনাস (রা.) বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) তার (আনাস) ছোট ভাই আবু উমাইরের সঙ্গে স্নেহভরে কথা বলতেন এবং তার পোষা পাখির কথা জিজ্ঞেস করে তাকে আনন্দ দিতেন। (বুখারি, হাদিস: ৬১২৯)
বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের অন্যতম ভিত্তি হলো মনোযোগ দিয়ে শোনা। অনেক বাবা-মা সন্তানের কথা শেষ হওয়ার আগেই বকাঝকা বা সিদ্ধান্ত দিয়ে দেন। এতে সন্তান ধীরে ধীরে নিজের অনুভূতি গোপন করতে শেখে। ইসলাম মানুষকে কথা শোনার এবং উত্তমভাবে সাড়া দেওয়ার শিক্ষা দেয়। পরিবারেও এই নীতি সমানভাবে প্রযোজ্য।
সন্তানের ভুল হলে তাকে অপমান না করে সংশোধনের সুযোগ দেওয়া উচিত। রাসুলুল্লাহ (সা.) মানুষের ভুল সংশোধনে কঠোরতার পরিবর্তে প্রজ্ঞা ও নম্রতাকে প্রাধান্য দিতেন। আল্লাহ তাআলাও নবী (সা.)-কে উদ্দেশ করে বলেছেন, ‘আল্লাহর রহমতেই আপনি তাদের প্রতি কোমল হয়েছেন। আপনি যদি রূঢ় ও কঠোর হৃদয়ের হতেন, তবে তারা আপনার কাছ থেকে সরে যেত।’ (সুরা আলে ইমরান, আয়াত: ১৫৯)। যদিও আয়াতটি সাহাবিদের প্রসঙ্গে নাজিল হয়েছে, এর শিক্ষাটি পারিবারিক সম্পর্কেও গভীরভাবে প্রযোজ্য।
বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক মানে শাসনের অভাব নয়। ইসলাম ভালোবাসা ও দায়িত্বশীলতার মধ্যে ভারসাম্য শেখায়। সন্তানকে সঠিক-ভুল বোঝানো, নিয়ম শেখানো এবং প্রয়োজনীয় সীমারেখা নির্ধারণ করা অভিভাবকের দায়িত্ব। তবে তা হতে হবে অপমান, ভয় বা মানসিক নির্যাতনের মাধ্যমে নয়; বরং ভালোবাসা, ধারাবাহিকতা ও উত্তম চরিত্রের মাধ্যমে।
আজকের ডিজিটাল যুগে সন্তানদের সঙ্গে সময় কাটানো আরও জরুরি। একই ঘরে থেকেও অনেক পরিবারে কথোপকথন কমে যাচ্ছে। তাই প্রতিদিন কিছু সময় মোবাইল বা অন্যান্য ব্যস্ততা থেকে দূরে রেখে সন্তানদের সঙ্গে গল্প করা, তাদের পড়াশোনা, বন্ধু, স্বপ্ন ও দুশ্চিন্তার কথা শোনা প্রয়োজন। এসব ছোট উদ্যোগই পারস্পরিক আস্থা ও বন্ধুত্বকে দৃঢ় করে।
ইসলামে সন্তান আল্লাহর দেওয়া আমানত। এই আমানতের যথাযথ হক আদায় করতে হলে কেবল ভরণ-পোষণ নিশ্চিত করাই যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন তাদের হৃদয়ের কাছাকাছি থাকা। যে পরিবারে ভালোবাসা, সম্মান, সংলাপ ও পারস্পরিক বিশ্বাসের পরিবেশ থাকে, সেই পরিবারেই সন্তান সুস্থ ব্যক্তিত্ব, নৈতিকতা ও আত্মবিশ্বাস নিয়ে বেড়ে ওঠে। তাই সন্তানদের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলা আধুনিক মনোবিজ্ঞানের পরামর্শই নয়, বরং কোরআন-সুন্নাহর আলোকে একটি গুরুত্বপূর্ণ ইসলামী শিক্ষা।
লেখক: আলেম ও সাংবাদিক
saifpas352@gmail.com




