সিরাতুর রাসূল
পৃথিবী বদলেছে, মানুষের প্রয়োজন বদলায়নি
- অস্থির পৃথিবীতে মুহাম্মদ (সা.)-এর শিক্ষা কেন আজও প্রাসঙ্গিক

প্রতীকী ছবি
মানবসভ্যতা আজ অভূতপূর্ব অগ্রগতির যুগে প্রবেশ করেছে। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মানুষের জীবনকে সহজ করেছে, যোগাযোগব্যবস্থা পৃথিবীকে এনে দিয়েছে হাতের মুঠোয়। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা থেকে মহাকাশ গবেষণা, চিকিৎসাবিজ্ঞান থেকে তথ্যপ্রযুক্তি, সর্বত্র মানুষের সাফল্যের বিস্ময়কর স্বাক্ষর। কিন্তু এই অগ্রগতির মাঝেও মানুষ কি সত্যিই শান্তিতে আছে? যুদ্ধ, হিংসা, বিদ্বেষ, সামাজিক বিভাজন, পারিবারিক অশান্তি, মূল্যবোধের অবক্ষয় ও মানসিক অস্থিরতা আজ মানুষের জীবনকে নানা দিক থেকে বিপর্যস্ত করছে। ফলে প্রশ্ন জাগে, এত জ্ঞান ও প্রযুক্তির পরও মানুষ কেন শান্তির সন্ধানে? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জীবন ও শিক্ষা আজও জোড়ালোভাবে প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে।
কারণ তিনি মানুষের জন্য এমন কোনো শিক্ষা দিয়ে যাননি, যার প্রয়োজন শুধু একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য ছিল। তিনি মানুষের চরিত্র, বিবেক, পরিবার, সমাজ, অর্থনীতি, নেতৃত্ব ও প্রতিবেশীর অধিকারসহ সর্বত্র এমন সব আদর্শ শিখিয়েছেন। যা কিয়ামত পযন্ত কাযকর থাকবে। সময়ের সঙ্গে প্রযুক্তি বদলায়, জীবনযাত্রার ধরন বদলায়, কিন্তু মানুষের মৌলিক নৈতিক প্রয়োজন বদলায় না। তাই চৌদ্দ শতাব্দী পরও তাঁর শিক্ষা মানুষের জন্য জীবন্ত।
আজকের পৃথিবীর অন্যতম বড় সংকট বিভাজন। ধর্ম, বর্ণ, জাতি, ভাষা, রাজনৈতিক মত ও সামাজিক পরিচয়কে কেন্দ্র করে মানুষে মানুষে দূরত্ব বাড়ছে। অথচ মহানবী (সা.) এমন এক সমাজ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, যেখানে ভিন্ন গোত্র ও ধর্মীয় সম্প্রদায়ের মানুষও পারস্পরিক অধিকার ও দায়িত্বের ভিত্তিতে সহাবস্থান করেছিল। মদিনায় হিজরতের পর মুসলিমদের পাশাপাশি ইহুদি ও বিভিন্ন গোত্রের অধিকার ও পারস্পরিক দায়িত্ব নির্ধারণ করে যে সামাজিক চুক্তি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, ইতিহাসে তা মদিনার সনদ নামে পরিচিত। (ইবন হিশাম, আস-সিরাতুন নববিয়্যাহ, ২/১৪৭-১৫০) পবিত্র কোরআনও মানুষের বৈচিত্র্যকে বিদ্বেষের কারণ না বানিয়ে পারস্পরিক পরিচিতির মাধ্যম হিসেবে ঘোষণা করেছে, ‘হে মানুষ! আমি তোমাদের সৃষ্টি করেছি এক পুরুষ ও এক নারী থেকে এবং তোমাদের বিভিন্ন জাতি ও গোত্রে বিভক্ত করেছি, যাতে তোমরা পরস্পর পরিচিত হতে পার।’ (সুরা হুজুরাত, আয়াত : ১৩)।
আজকে যখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি মন্তব্য মুহূর্তেই ঘৃণা ছড়িয়ে দিতে পারে, যখন মতের অমিল সহজেই ব্যক্তিগত শত্রুতায় পরিণত হয়, তখন নবীজি (সা.)-এর ভাষা ও আচরণের শিক্ষা বিশেষভাবে প্রয়োজনীয়। তিনি বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি আল্লাহ ও পরকালের প্রতি ঈমান রাখে, সে যেন ভালো কথা বলে অথবা নীরব থাকে।’ (বুখারি, হাদিস : ৬০১৮; মুসলিম, হাদিস : ৪৭) কথার স্বাধীনতার অর্থ অন্যের সম্মান নষ্ট করার স্বাধীনতা নয়, এই মৌলিক নৈতিক বোধটি আজকের জনপরিসরে অত্যন্ত জরুরি।
সহিংসতা ও প্রতিশোধের সংস্কৃতির মধ্যেও নবী (সা.)-এর শিক্ষা আমাদের নতুনভাবে ভাবতে শেখায়। তায়েফে তিনি যে নির্যাতনের শিকার হয়েছিলেন, তা ছিল অত্যন্ত নির্মম। রক্তাক্ত অবস্থায়ও তিনি তাদের ধ্বংস কামনা করেননি। বরং আশা প্রকাশ করেছিলেন, তাদের পরবর্তী প্রজন্মের মধ্য থেকে এমন মানুষ বের হবে যারা আল্লাহর ইবাদত করবে (বুখারি, হাদিস : ৩২৩১)। মানুষের ভুলের চেয়েও তার সম্ভাবনাকে বড় করে দেখার এই দৃষ্টিভঙ্গি আজকের বিভক্ত পৃথিবীতে গভীর তাৎপর্য বহন করে। তিনি এক হাদিসে বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি দয়া করে না, তার প্রতি দয়া করা হয় না।’ (বুখারি, হাদিস : ৫৯৯৭)। অর্থাৎ সমাজকে শান্ত করতে হলে প্রথমে মানুষের হৃদয়ে দয়ার চর্চা ফিরিয়ে আনতে হবে।
পারিবারিক অশান্তিও আধুনিক সমাজের অন্যতম বড় সংকট। প্রযুক্তি মানুষকে কাছাকাছি এনেছে, কিন্তু অনেক সময় একই ঘরে থেকেও মানুষ মানসিকভাবে দূরে সরে যাচ্ছে। স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক, সন্তানদের সঙ্গে যোগাযোগ এবং পারিবারিক দায়িত্বের ক্ষেত্রে মহানবী (সা.)-এর জীবন এক অনন্য আদর্শ। তিনি বলেছেন, ‘তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তি উত্তম, যে তার পরিবারের কাছে উত্তম; আর আমি তোমাদের মধ্যে আমার পরিবারের কাছে সর্বোত্তম।’ (তিরমিজি, হাদিস : ৩৮৯৫)। আয়েশা (রা.)-কে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, নবীজি (সা.) ঘরে কী করতেন। তিনি বলেছেন, ‘তিনি তাঁর পরিবারের কাজে নিয়োজিত থাকতেন; নামাজের সময় হলে নামাজে চলে যেতেন।’ (বুখারি, হাদিস : ৬৭৬)। এখানে নেতৃত্বের অর্থ কর্তৃত্ব নয়, বরং দায়িত্ব ও সহযোগিতা।
আজকের মানুষ বাহ্যিকভাবে যত ব্যস্ত, ভেতরে তত বেশি অস্থির। উদ্বেগ, হতাশা ও অনিশ্চয়তা অনেকের নিত্যসঙ্গী। মহানবী (সা.)-এর জীবনেও দুঃখ ও বিপর্যয়ের কমতি ছিল না। প্রিয়তমা খাদিজা (রা.)-এর ইন্তেকাল, চাচা আবু তালিবের মৃত্যু, তায়েফের নির্যাতন, উহুদের বিপর্যয়, সন্তানদের মৃত্যু, হিজরতের কঠিন মুহূর্ত, মদিনার নানা সংকট তাঁকে মোকাবিলা করতে হয়েছে। কিন্তু কোনো বিপর্যয় তাঁকে আল্লাহর ওপর আস্থা থেকে বিচ্যুত করতে পারেনি। হিজরতের সময় শত্রুরা যখন গুহার মুখে পৌঁছে গিয়েছিল, তখন আবু বকর (রা.) উদ্বিগ্ন হলে তিনি বলেছিলেন, ‘চিন্তা করো না, নিশ্চয়ই আল্লাহ আমাদের সঙ্গে আছেন।’ (সুরা তাওবা, আয়াত : ৪০)। এটি বাস্তবতা অস্বীকার করার শিক্ষা নয়; বরং কঠিন বাস্তবতার মধ্যেও আল্লাহর ওপর আস্থা রেখে দায়িত্ব পালন করার শিক্ষা।
বর্তমান পৃথিবীতে নেতৃত্বের সংকটও প্রকট। ক্ষমতা অর্জন অনেকের কাছে সাফল্যের মাপকাঠি হলেও ক্ষমতার সঙ্গে নৈতিকতা ও জবাবদিহির সম্পর্ক ক্রমেই দুর্বল হচ্ছে। মহানবী (সা.) নেতৃত্বকে সম্মানের আসন নয়, আমানত হিসেবে দেখেছেন। তিনি বলেছেন, ‘তোমরা প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল এবং প্রত্যেককেই তার দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে।’ (বুখারি, হাদিস : ৭১৩৮) তাঁর নেতৃত্বে পরামর্শ, ন্যায়, দায়িত্ব বণ্টন, দুর্বলদের অধিকার এবং মানুষের মর্যাদা ছিল গুরুত্বপূর্ণ।
অর্থনৈতিক বৈষম্যের যুগেও নবীজির শিক্ষা সমানভাবে প্রাসঙ্গিক। সমাজের এক শ্রেণির হাতে সম্পদের বিপুল সঞ্চয়, অন্যদিকে বহু মানুষের মৌলিক প্রয়োজন পূরণ না হওয়ার বাস্তবতা পৃথিবীর নানা প্রান্তে বিদ্যমান। ইসলাম সম্পদকে শুধু ব্যক্তিগত ভোগের বিষয় হিসেবে দেখেনি; দরিদ্র, মিসকিন, ঋণগ্রস্ত ও অসহায় মানুষের অধিকারও নির্ধারণ করেছে (সুরা তাওবা, আয়াত : ৬০)। নবীজি (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি কোনো মুমিনের দুনিয়ার একটি কষ্ট দূর করে দেয়, আল্লাহ কিয়ামতের দিন তার একটি কষ্ট দূর করবেন।’ (মুসলিম, হাদিস : ২৬৯৯)। অর্থাৎ একটি ন্যায়ভিত্তিক সমাজ শুধু রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার মাধ্যমে নয়, মানুষের পারস্পরিক দায়িত্ববোধের মাধ্যমেও গড়ে ওঠে।
মানুষের মর্যাদা রক্ষার ক্ষেত্রেও নবীজি (সা.)-এর শিক্ষা আজ বিশেষভাবে প্রয়োজনীয়। একবার একটি জানাজা নবী (সা.)-এর পাশ দিয়ে অতিক্রম করার সময় তিনি দাঁড়িয়ে গেলেন। তাঁকে বলা হলো, এটি তো ইহুদির জানাজা। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, ‘সে কি মানুষ নয়?’ (বুখারি, হাদিস : ১৩১২; মুসলিম, হাদিস : ৯৬১)। মতাদর্শগত পার্থক্য থাকলেও মানবিক মর্যাদাকে অস্বীকার না করার এই শিক্ষা বর্তমান পৃথিবীর জন্য গভীর তাৎপর্যপূর্ণ।
রবিউল আউয়ালে তাই মহানবী (সা.)-এর জন্ম ও জীবনের ঘটনা স্মরণ করা নিঃসন্দেহে ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ। কিন্তু তাঁর প্রতি ভালোবাসার প্রকৃত প্রমাণ কেবল আলোচনা, আয়োজন কিংবা প্রশংসায় সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না। তাঁর জীবন আমাদের ভাষায় নম্রতা, পরিবারে ভালোবাসা, সমাজে দায়িত্ববোধ, দুর্বল মানুষের প্রতি মমতা, মতভেদে সংযম, ক্ষমতায় জবাবদিহি এবং বিপদের সময় আল্লাহর ওপর আস্থা তৈরি করছে কি না, সেটিই বড় প্রশ্ন।
পৃথিবী যত আধুনিক হচ্ছে, মানুষের প্রয়োজন তত নতুন হচ্ছে না; বরং মানুষের পুরোনো নৈতিক সংকটগুলোই নতুন রূপে ফিরে আসছে। তাই মুহাম্মদ (সা.) আজ প্রাসঙ্গিক কোনো ঐতিহাসিক স্মৃতির কারণে নন; তিনি প্রাসঙ্গিক মানুষকে মানুষ করে তোলার শিক্ষার কারণে। তাঁর সিরাত আমাদের শুধু অতীতের একটি মহান জীবন সম্পর্কে জানায় না, বরং বর্তমানকে কীভাবে সুন্দর করা যায় এবং ভবিষ্যৎকে কীভাবে মানবিক করা যায়, তারও পথ দেখায়। তাই অস্থির এই পৃথিবীতে মুহাম্মদ (সা.)-কে নতুন করে জানার অর্থ শুধু একজন মহান ব্যক্তিকে জানা নয়; বরং নিজেদের হারিয়ে যাওয়া মানবিকতাকে নতুন করে আবিষ্কার করা।
লেখক: আলেম ও সাংবাদিক






