নবী চরিত্রের কিছু নান্দনিক দিক

সংগৃহীত ছবি
মানুষের জীবনে জ্ঞান, সম্পদ, ক্ষমতা ও মর্যাদার চেয়ে সুন্দর চরিত্রের মূল্য অনেক বেশি। আর মানব ইতিহাসে উত্তম চরিত্রের সর্বোচ্চ আদর্শ হলেন মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)। তাঁর জীবন ছিল সৌন্দর্য, সৌম্যতা, ক্ষমা, বিনয় ও মানবিকতার এক অনুপম সমন্বয়। পবিত্র কোরআসে মহান আল্লাহ তাআলা তাঁর সম্পর্কে ঘোষণা করেছেন, ‘নিশ্চয়ই আপনি মহান চরিত্রের ওপর প্রতিষ্ঠিত।’ (সুরা আল-কলম, আয়াত : ৪)
আবু আবদুল্লাহ আল-জাদালী (রাহ.) বলেন, তিনি হজরত আয়েশা (রা.)-কে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর চরিত্র সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলে তিনি বলেছেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) কখনো অশ্লীল বা কটুভাষী ছিলেন না এবং অশালীন আচরণও করতেন না। তিনি বাজারে গিয়ে উচ্চস্বরে চিৎকার-চেঁচামেচি করতেন না। কেউ তাঁর সঙ্গে অন্যায় করলেও তিনি অন্যায়ের মাধ্যমে তার প্রতিশোধ নিতেন না; বরং উদারচিত্তে ক্ষমা করে দিতেন। (তিরমিজি, হাদিস: ২০২৬)
এই হাদিসে নবী চরিত্রের প্রথম যে নান্দনিক দিকটি ফুটে ওঠে, তা হলো ভাষার সৌন্দর্য। মানুষের ব্যক্তিত্বের অন্যতম পরিচয় তার কথা। মহানবী (সা.) কখনো কাউকে অশ্লীল, কটু বা অপমানজনক ভাষায় আঘাত করতেন না। তাঁর ভাষা ছিল সত্য, সংযত ও হৃদয়গ্রাহী। আজকের সমাজে যখন কথার মাধ্যমে মানুষ মানুষকে আহত করতে অভ্যস্ত, তখন নবীজির এই চরিত্র আমাদের ভাষাকে শুদ্ধ ও মানবিক করার শিক্ষা দেয়।
তাঁর চরিত্রের আরেকটি সৌন্দর্য ছিল সংযম ও মার্জিত আচরণ। জনসমাগমস্থলেও তিনি হট্টগোল করতেন না, অহেতুক উচ্চকণ্ঠ হতেন না। তাঁর ব্যক্তিত্বে ছিল এমন এক প্রশান্তি, যা মানুষকে তাঁর কাছে টেনে আনত। ক্ষমতা বা জনপ্রিয়তা তাঁকে কখনো রূঢ় করে তোলেনি।
সবচেয়ে উজ্জ্বল দিক ছিল তাঁর ক্ষমাশীলতা। তিনি অন্যায়ের জবাব অন্যায় দিয়ে দিতেন না। ব্যক্তিগতভাবে কেউ তাঁকে কষ্ট দিলে তিনি প্রতিশোধের পথ বেছে না নিয়ে ক্ষমার পথ গ্রহণ করতেন। মক্কা বিজয়ের দিন, দীর্ঘদিনের নির্যাতন ও শত্রুতার পরও তিনি প্রতিশোধের পরিবর্তে সাধারণ ক্ষমার ঘোষণা দেন। এ ছিল শক্তিমান হয়েও ক্ষমা করার বিরল সৌন্দর্য।
নবীজির চরিত্রের নান্দনিকতা শুধু তাঁর কোমলতায় নয়, বরং ন্যায়, আত্মসংযম, ধৈর্য ও ক্ষমার অপূর্ব ভারসাম্যে। তিনি প্রমাণ করেছেন, সত্যিকারের মহত্ত্ব প্রতিশোধ নেওয়ার মধ্যে নয়; বরং ক্ষমা করার শক্তিতে। কটুবাক্যের জবাবে কটু কথা বলা সহজ, কিন্তু সংযম ধরে রাখা মহত্ত্বের পরিচয়।
আজ ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজজীবনে যদি আমরা মহানবীর এই চরিত্রের শিক্ষা গ্রহণ করি, তবে অনেক বিরোধ, হিংসা ও বিদ্বেষ দূর হতে পারে। তাঁর চরিত্র আমাদের শেখায়, সুন্দর মানুষ হতে হলে শুধু ভালো কাজ করলেই যথেষ্ট নয়; ভালো ভাষা, সংযত আচরণ এবং ক্ষমাশীল হৃদয়েরও প্রয়োজন।
তাই রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর চরিত্র শুধু অনুসরণের বিষয় নয়, বরং তা মানবজীবনকে সুন্দর ও সুবাসিত করে তোলার এক চিরন্তন শিল্পও বটে।
লেখক: আলেম ও সাংবাদিক




