বিভিন্ন দেশের মুসলিম কোরবানি চিত্র

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
ঈদুল আজহা শুধু একটি ধর্মীয় উৎসব নয়; এটি মুসলিম বিশ্বের সবচেয়ে বড় বৈশ্বিক মিলনমেলারও একটি প্রতীক। পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্ত পর্যন্ত কোটি কোটি মুসলিম কোরবানির নির্ধারিত দিনগুলোতে আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে পশু কোরবানি করেন। তবে কোরবানির মূল চেতনা এক হলেও দেশ, সংস্কৃতি, অর্থনীতি ও সামাজিক বাস্তবতার ভিন্নতায় কোরবানির ধরনেও দেখা যায় বিস্ময়কর বৈচিত্র্য। কোথাও কোরবানির প্রধান পশু উট, কোথাও ভেড়া বা ছাগল; কোথাও পরিবারভিত্তিক কোরবানি বেশি প্রচলিত, আবার কোথাও মসজিদ বা রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনায় সম্মিলিত কোরবানির দৃশ্য চোখে পড়ে।
বাংলাদেশে ঈদুল আজহার সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো কোরবানিকে ঘিরে সামাজিক আবেগ। ঈদের অন্তত দুই সপ্তাহ আগে থেকেই দেশের বিভিন্ন প্রান্তে বসে বিশাল পশুর হাট। রাজধানী ঢাকাসহ বড় শহরগুলোতে লাখ লাখ গরু, ছাগল ও মহিষ আসে। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রতিবছর প্রায় এক কোটির মতো পশু কোরবানি হয়। এর মধ্যে গরুই সংখ্যাগরিষ্ঠ। গ্রামবাংলায় অনেক পরিবার সারা বছর একটি গরু লালন-পালন করে শুধু কোরবানির জন্য। ঈদের দিন সকাল থেকেই অলিগলি ভরে ওঠে তাকবিরের ধ্বনি, কসাইদের ব্যস্ততা এবং গোশত বণ্টনের দৃশ্যে। আত্মীয়-স্বজন ও গরিবদের মধ্যে মাংস বিতরণ এখনো এ দেশের ঈদ সংস্কৃতির অন্যতম সৌন্দর্য। এ ছাড়া শহরাঞ্চলে এখন অনলাইন কোরবানি সেবাও জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। বিভিন্ন দাতব্য সংস্থা কোরবানির গোশত সংগ্রহ করে দুর্গম ও দরিদ্র অঞ্চলে পৌঁছে দেয়।
আবার পাকিস্তানে কোরবানিকে ঘিরে আরেক ধরনের আবেগ দেখা যায়। সেখানে অনেক পরিবার অনেক আগে থেকে পশু কিনে ঘরে লালন করেন। বিশেষ করে করাচি, লাহোর ও পেশোয়ারে ঈদের আগে বিশাল পশুর বাজার বসে, যেখানে লাখ লাখ উট, গরু, দুম্বা ও ছাগল বিক্রি হয়। পাকিস্তানে দুম্বা কোরবানির একটি বিশেষ ঐতিহ্য রয়েছে। বাংলাদেশের মতো পাকিস্তানের শহরগুলোতেও অনলাইন কোরবানি কোরবানির গোশত সংগ্রহ করে দুর্গম ও দরিদ্র অঞ্চলে পৌঁছে দেয়ার রীতি পরিলক্ষিত হয়।
সৌদি আরবে ঈদুল আজহার পরিবেশ অন্যসব দেশের চেয়ে আলাদা। কারণ হজ ও কোরবানি এখানে একই সঙ্গে সম্পন্ন হয়। মক্কা ও মিনায় লাখ লাখ হাজির কোরবানির ব্যবস্থা পরিচালনা করে সৌদি সরকার। ইসলামিক ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত ‘আধাহি প্রকল্প’-এর মাধ্যমে প্রতিবছর প্রায় বিশ লাখ উট, ভেড়া ও ছাগল কোরবানি করা হয়। এসব মাংস শুধু সৌদি আরবেই নয়, বিশ্বের দরিদ্র মুসলিম দেশগুলোতেও পাঠানো হয়। আরব অঞ্চলে উট এখনো মর্যাদাপূর্ণ কোরবানির পশু হিসেবে বিবেচিত হয়, যদিও ভেড়া ও ছাগলের সংখ্যাই বেশি।
সংযুক্ত আরব আমিরাত ও কাতারের মতো উপসাগরীয় দেশগুলোতে কোরবানির চিত্র অনেকটাই আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর। মোবাইল অ্যাপ বা ওয়েবসাইটের মাধ্যমে পশু নির্বাচন, অর্থ প্রদান ও কোরবানি সম্পন্ন করার ব্যবস্থা চালু হয়েছে। শহরকেন্দ্রিক জীবনের কারণে অধিকাংশ মানুষ নির্ধারিত কসাইখানার মাধ্যমে কোরবানি করেন। দুবাই বা আবুধাবির মতো শহরে ঈদের সময় বিলাসবহুল পশু প্রদর্শনও দেখা যায়। দামি উট বা বিশাল গরু নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে আলোচনাও কম হয় না।
তুরস্কে ঈদুল আজহা পরিচিত ‘কুরবান বায়রামি’ নামে। সেখানে কোরবানির সঙ্গে পারিবারিক পুনর্মিলনের সম্পর্ক অত্যন্ত গভীর। ঈদের আগে মানুষ দূরদূরান্ত থেকে নিজ শহরে ফিরে আসে। সরকার অনুমোদিত নির্দিষ্ট স্থানে পশু জবাই বাধ্যতামূলক। ভেড়া ও মেষ কোরবানির হার সবচেয়ে বেশি। তুরস্কে অনেক মানুষ সরাসরি পশু কোরবানি না করে আন্তর্জাতিক মানবিক সংস্থার মাধ্যমে আফ্রিকা বা এশিয়ার দরিদ্র মুসলমানদের জন্য কোরবানির অর্থ পাঠানোর মতো অতি মানবিক রীতি বেশ জনপ্রিয়।
ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া ও ব্রুনাইয়ের মতো দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মুসলিম সমাজে কোরবানি অনেকটাই মসজিদকেন্দ্রিক। এলাকাবাসী মিলে পশু সংগ্রহ করে মসজিদে নিয়ে আসেন। পরে স্বেচ্ছাসেবকেরা মাংস প্যাকেট করে বাড়ি বাড়ি পৌঁছে দেন। ইন্দোনেশিয়ায় প্রতিবছর লাখ লাখ গরু ও ছাগল কোরবানি হয়। দেশটির বহু অঞ্চলে রাষ্ট্রীয় কর্মকর্তা, ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষ একত্রে ‘সম্মিলিত কোরবানি’ আয়োজন করেন।
ভারতে মুসলমানরা সংখ্যাগরিষ্ঠ না হওয়ায় সেখানে কোরবানির পরিবেশ অনেক ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রিত। বিভিন্ন রাজ্যে গরু জবাইয়ের আইনগত সীমাবদ্ধতা থাকায় মুসলমানদের বড় অংশ ছাগল, ভেড়া বা মহিষ কোরবানি করেন। হায়দরাবাদ, কেরালা, পশ্চিমবঙ্গ ও কাশ্মীরে অবশ্য বড় পরিসরে কোরবানির আয়োজন দেখা যায়। ‘বকরা ঈদ’ নামটি ভারতীয় উপমহাদেশে এখান থেকেই জনপ্রিয় হয়েছে।
মিশর, মরক্কো ও আলজেরিয়ার মতো উত্তর আফ্রিকার দেশগুলোতে ভেড়া কোরবানির ঐতিহ্য সবচেয়ে প্রবল। মরক্কোয় ঈদের আগে গ্রামাঞ্চল থেকে শহরে লাখ লাখ ভেড়া আনা হয়। অনেক পরিবার ঈদের আগের রাতেই পশুকে সাজিয়ে রাখে। মিশরে দাতব্য সংস্থাগুলো কোরবানির মাংস দরিদ্র জনগোষ্ঠীর মধ্যে বিতরণে বড় ভূমিকা পালন করে। শহরাঞ্চলে ফ্রোজেন মাংস সংরক্ষণের ব্যবস্থাও এখন সাধারণ ব্যাপার।
মধ্য এশিয়ার দেশগুলোতেও কোরবানির নিজস্ব আবহ রয়েছে। তাজিকিস্তান, উজবেকিস্তান ও কাজাখস্তানে পরিবারভিত্তিক কোরবানির পাশাপাশি প্রতিবেশী ও আত্মীয়দের বাড়িতে খাবার পাঠানোর সংস্কৃতি খুব শক্তিশালী। সেখানে ঘোড়ার মাংস ঐতিহ্যগতভাবে জনপ্রিয় হলেও কোরবানির জন্য মূলত ভেড়া ও গরুই ব্যবহৃত হয়।
ইউরোপ ও আমেরিকার মুসলমানদের কোরবানির অভিজ্ঞতা আবার ভিন্ন। নিউইয়র্ক, লন্ডন, বার্লিন বা টরন্টোর মতো শহরে খোলা জায়গায় পশু জবাইয়ের অনুমতি নেই। ফলে মুসলমানরা নির্ধারিত স্লটারহাউস বা ইসলামিক সেন্টারের মাধ্যমে কোরবানি করেন। অনেকেই অনলাইনে দেশে বা বিদেশে কোরবানির ব্যবস্থা করে থাকেন। পশ্চিমা দেশগুলোতে মুসলমানদের মধ্যে ‘শেয়ার কোরবানি’ এবং ‘চ্যারিটি কোরবানি’ ক্রমেই জনপ্রিয় হচ্ছে।
চীনের মুসলিম অধ্যুষিত অঞ্চলগুলোতে ঈদুল আজহার দিন মসজিদভিত্তিক কোরবানি দেখা যায়। ভেড়া ও উটের ব্যবহার সেখানে বেশি। অন্যদিকে রাশিয়ার মুসলিম অঞ্চলগুলোতে, বিশেষ করে চেচনিয়া ও দাগেস্তানে ঈদ উপলক্ষে বিশাল জামাত ও সামাজিক ভোজের আয়োজন করা হয়।
বিশ্বজুড়ে কোরবানির ধরন ভিন্ন হলেও একটি বিষয় সর্বত্র অভিন্ন। তা হলো, কোরবানি মুসলমানদের কাছে শুধু ধর্মীয় আচার নয়; বরং আত্মত্যাগ, উদারতা ও সামাজিক সংহতির এক জীবন্ত প্রতীক। ঈদের দিনে ধনী-গরিব একসঙ্গে বসে খাবার ভাগাভাগি করে, দূরের মানুষ ঘরে ফেরে, আত্মীয়তার বন্ধন দৃঢ় হয়। আধুনিক প্রযুক্তি, নগরসভ্যতা কিংবা ভৌগোলিক দূরত্ব কোরবানির এ মূল চেতনাকে এখনো ম্লান করতে পারেনি।






