আলী নদভী : জ্ঞান ও আত্মজাগরণের এক অনন্য নাম

সংগৃহীত ছবি
বিংশ শতাব্দীর মুসলিম বিশ্বের অন্যতম প্রভাবশালী আলেম, চিন্তাবিদ, ইতিহাসবিদ ও সাহিত্যিক ছিলেন আল্লামা আবুল হাসান আলী হাসানী আন-নদভী রহ.। উপমহাদেশের মাটি থেকে উঠে এসে তিনি আরবি ও উর্দু ভাষায় ইসলামের ইতিহাস, সভ্যতা, দাওয়াত, সীরাত ও মুসলিম সমাজের সংকট নিয়ে এমন সব গ্রন্থ রচনা করেছেন; যা ভারতীয় উপমহাদেশের গণ্ডি পেরিয়ে আরব বিশ্বসহ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্যাপক পরিচিতি লাভ করেছে। ভালোবাসা ও শ্রদ্ধার জায়গায় রেথকে তিনি অনেকের নিকট ‘আলী মিয়াঁ’ নামেও পরিচিত ছিলেন।
তার চিন্তার বিশেষত্ব ছিল ইতিহাসকে শুধু অতীতের ঘটনাপঞ্জি হিসেবে না দেখা। মুসলিম সভ্যতার উত্থান-পতন, নবী-রাসুল ও সংস্কারকদের জীবন এবং আধুনিক বিশ্বের নৈতিক সংকট থেকে তিনি বর্তমান প্রজন্মের জন্য শিক্ষা আহরণের চেষ্টা করেছেন। তাই তার রচনায় ইতিহাসের সঙ্গে আত্মজাগরণ, জ্ঞানের সঙ্গে চরিত্র এবং ইসলামের সঙ্গে মানবিকতার গভীর সম্পর্ক দেখা যায়।
আবুল হাসান আলী নদভী রহ. ১৯১৩ সালের ৫ ডিসেম্বর ভারতের রায়বেরেলিতে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা মাওলানা আবদুল হাই হাসানীও ছিলেন বিশিষ্ট আলেম, লেখক ও ইতিহাসবিদ। মা খাইরুন্নেসাও ছিলেন ধর্মীয় শিক্ষায় সমৃদ্ধ এমন একটি পরিবারের সন্তান। পারিবারিক সূত্রে তারা হাসান রাযিয়াল্লাহু আনহুর বংশধর ছিলেন বলে জীবনীকাররা উল্লেখ করেছেন।
মাত্র অল্প বয়সে পিতাকে হারান আলী নদভী (রহ.)। ১৯২৩ সালে পিতার ইন্তেকালের পর বড় ভাই মাওলানা আবদুল আলী হাসানী ও মা খাইরুন্নেসা তার শিক্ষার দায়িত্ব নেন। শৈশবে মায়ের কাছেই তিনি কোরআন, আরবি ও উর্দুর প্রাথমিক শিক্ষা লাভ করেন। পরবর্তী জীবনে তার বিশাল জ্ঞানভাণ্ডারের ভিত্তি গড়ে ওঠে এই পারিবারিক পরিবেশেই।
১৯২৪ সালে তিনি শায়খ খলীল বিন মুহাম্মদ আল-আনসারীর কাছে আরবি ভাষা অধ্যয়ন শুরু করেন। ১৯২৬ সালে নদওয়াতুল উলামায় ভর্তি হওয়ার পর আরবি ভাষা ও সাহিত্যে তার দক্ষতা দ্রুত বিকশিত হয়। সে সময় আরব দেশ থেকে আগত অতিথিদের সঙ্গে যোগাযোগের ক্ষেত্রে তিনি দোভাষীর দায়িত্বও পালন করতেন।
পাশাপাশি তিনি উর্দু ভাষা ও সাহিত্য অধ্যয়ন করেন এবং ইংরেজি ভাষাতেও পান্ডিত্য অর্জন করেন। ফলে ইসলামী জ্ঞানভাণ্ডারের পাশাপাশি পাশ্চাত্য লেখকদের ইসলাম ও মুসলিম ইতিহাস বিষয়ক রচনাও তিনি সরাসরি পড়তে সক্ষম হন। এই বহুমাত্রিক শিক্ষা পরবর্তী সময়ে তার চিন্তাকে উপমহাদেশের সীমা ছাড়িয়ে আন্তর্জাতিক পরিসরেও ব্যাপকভাবে সমদিৃত করে দেয়।
তিনি নদওয়াতুল উলামায় হাদিসের গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ অধ্যয়ন করেন। ১৯৩২ সালে লাহোরে আল্লামা আহমদ আলী লাহোরীর কাছে কোরআনের পূর্ণ তাফসির অধ্যয়ন করেন। একই সময়ে দেওবন্দে শায়খুল ইসলাম আল্লামা হুসাইন আহমদ মাদানী রহ.-এর দরসেও অংশ নেন। ফিকহ ও তাজবিদের মতো বিষয়সমুহেও তিনি প্রাজ্ঞ আলেমদের কাছে শিক্ষা লাভ করেন।
১৯৩৪ সালে আলী নদভী রহ. দারুল উলুম নদওয়াতুল উলামায় শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন। তাফসির, হাদিস, আরবি সাহিত্য, ইতিহাস ও যুক্তিবিদ্যাসহ বিভিন্ন বিষয়ে পাঠদান করেন। তার কাছে শিক্ষা ছিল শুধু তথ্য অর্জনের বিষয় নয়, বরং মানুষের চিন্তা, চরিত্র ও আত্মিক শক্তি গঠনের মাধ্যম।
১৯৩৯ সালের বিভিন্ন সফরে তিনি মাওলানা আবদুল কাদির রায়পুরী রহ. ও মাওলানা মুহাম্মদ ইলিয়াস কান্ধলভী রহ.-এর সংস্পর্শে আসেন। আত্মশুদ্ধি ও তাযকিয়ার ক্ষেত্রে রায়পুরী রহ. এবং দাওয়াত ও সমাজসংস্কারের ক্ষেত্রে মাওলানা ইলিয়াস কান্ধলভী রহ.-এর কাছ থেকে তিনি পরামর্শ গ্রহণ করতেন। এই দুই ধারার প্রভাব তার পরবর্তী জীবন ও চিন্তায় লক্ষ করা যায়।
১৯৪৩ সালে তিনি দীনী শিক্ষার প্রসারে ‘আনজুমানে তা’লীমাতে দীন’ প্রতিষ্ঠা করেন। পরবর্তী সময়ে নদওয়াতুল উলামার শিক্ষা ও প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৫১ সালে শিক্ষা বিভাগের উপপরিচালক এবং ১৯৫৪ সালে পরিচালক হন। ১৯৬৫ সালে বড় ভাইয়ের ইন্তেকালের পর নদওয়াতুল উলামার মহাসচিবের দায়িত্বও গ্রহণ করেন।
আলী নদভীর সাহিত্যিক জীবন শুরু হয় অতি অল্প বয়সে। ১৯৩১ সালে মাত্র ১৭ বছর বয়সে মিসরের ‘আল-মানার’ পত্রিকায় তার প্রথম প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়। ১৯৩৮ সালে প্রকাশিত হয় তার প্রথম উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ সীরাতে আহমদ শহীদ।
এরপর তিনি ধারাবাহিকভাবে বহু গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ রচনা করেন। শিশুদের জন্য ক্বাসাসুন নাবিয়্যীন ও আল-কিরাআতুর রাশিদাহ আল নদভীর আকাশচুম্বি জনপ্রিয় দুটো রচনা। ইসলামের ইতিহাস, দাওয়াত, মুসলিম সমাজ, সভ্যতা ও চিন্তাজগত নিয়ে তাঁর অসংখ্য গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে।
তার বহুল আলোচিত গ্রন্থ ‘মা যা খাসিরাল আলামু বিনহিতাতিল মুসলিমীন’। বাংলায় যার ভাবার্থ ‘মুসলমানদের পতনে বিশ্ব কী হারালো?’ মুসলিম সভ্যতার অবক্ষয়কে বৃহত্তর মানবসভ্যতার প্রেক্ষাপটে বিশ্লেষণের চেষ্টা করেছে। গ্রন্থটির জন্য ১৯৮০ সালে তিনি বাদশাহ ফয়সাল আন্তর্জাতিক পুরস্কার লাভ করেন। তার জীবনীতে উল্লেখ রয়েছে, পুরস্কারের অর্থের একটি বড় অংশ তিনি বিভিন্ন কল্যাণমূলক কাজে ব্যয় করেন।
তার সাত খণ্ডের ‘তারীখে দাওয়াত ওয়া আযীমত’ দাওয়াত ও ইসলামী সংস্কার আন্দোলনের ইতিহাস নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ একটি রচনা। এতে তিনি এমন সব ব্যক্তিত্বের জীবন তুলে ধরেছেন, যাঁরা প্রতিকূলতার মধ্যেও দ্বীন ও মানুষের কল্যাণে কাজ করেছেন।
আলী নদভীর সীরাতচর্চার একটি বৈশিষ্ট্য ছিল, তিনি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জীবনকে বিচ্ছিন্ন ঘটনাপ্রবাহ হিসেবে উপস্থাপন করেননি। নবুওয়াতের পূর্বে আরব ও বিশ্বের সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও নৈতিক বাস্তবতাও তিনি আলোচনায় এনেছেন। এরপর দেখিয়েছেন, কীভাবে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নেতৃত্বে ব্যক্তি ও সমাজের নৈতিক পুনর্গঠন ঘটেছিল।
একইভাবে মুসলিম ইতিহাসের উত্থান ও পতন বিশ্লেষণেও তার লক্ষ্য ছিল শিক্ষা গ্রহণ। তার কাছে ইতিহাস ছিল আত্মপরিচয় ও আত্মসমালোচনার আয়না।
আলী নদভীর প্রভাব ভারতীয় উপমহাদেশের বাইরে ব্যাপকভাবে বিস্তৃত হয়। তিনি মদিনা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরামর্শক পর্ষদ, দামেস্কের আরবি ভাষা একাডেমি ও জর্ডানের আরবি একাডেমির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। অক্সফোর্ডের ইসলামিক সেন্টারের সঙ্গেও তাঁর গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্ক ছিল।
তিনি ১৯৮৪ ও ১৯৯৪ সালে বাংলাদেশ সফর করেছিলেন। এ সময় বাংলাদেশের আলেম ও লেখকদের বাংলা ভাষায় ইসলামী সাহিত্য রচনায় উৎসাহিত করেন বলে বিভিন্ন স্মৃতিচারণে উল্লেখ পাওয়া যায়। ইসলামের সার্বজনীন বার্তাকে স্থানীয় ভাষা, ইতিহাস ও সংস্কৃতির সঙ্গে সংযুক্ত করে উপস্থাপনের প্রয়োজনীয়তা তাঁর চিন্তায় বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছিল।
দীর্ঘ ৮৬ বছরের জীবনজুড়ে তিনি শিক্ষকতা, লেখালেখি, দাওয়াত ও জ্ঞানচর্চায় নিজেকে নিয়োজিত রেখেছেন। ১৯৯৯ সালের ৩১ ডিসেম্বর রায়বেরেলিতে তার ইন্তেকাল হয় এবং সেখানেই তাঁকে দাফন করা হয়। তার জীবনীতে উল্লেখ রয়েছে, মৃত্যুর সময় তিনি কোরআন তিলাওয়াত করছিলেন।
মহান আল্লাহ তাআলা আল্লামা আবুল হাসান আলী হাসানী আন-নদভী রহ.-এর প্রতি রহমত বর্ষণ করুন এবং তার ইলম, সাহিত্য ও দাওয়াতি খেদমতকে কবুল করুন। আমিন।
লেখক: আলেম ও সাংবাদিক



