৫৩ বছর ধরে ধর্মীয় শিক্ষার আলো ছড়াচ্ছেন ফেনীর আমান হুজুর

আমান হুজুর ও তার নিজ উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত ফতেহপুর জামিয়া রাহমানিয়া নামের ধর্মীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান
১৪ বছর বয়সে মক্তবে শিক্ষকতা দিয়ে শুরু। দেখতে দেখতে পেরিয়ে গেছে ৫৩ বছর। এখন বয়স ৭১। জীবনের এই দীর্ঘ পথচলায় কত শিশু যে তার কাছে কোরআনের প্রথম হরফ, কালিমা, নামাজ ও ইসলামের মৌলিক শিক্ষা শিখেছে, তার হিসাব নেই। বয়সের ভারে অনেক দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়ালেও শিশুদের পড়ানোর কাজটি এখনো ছাড়েননি তিনি।
ফেনী সদর উপজেলার শর্শদী ইউনিয়নের ফতেহপুরে ‘আমান হুজুর’ নামেই পরিচিত মৌলভী আমানুল্লাহ। এলাকার কয়েক প্রজন্মের ধর্মীয় শিক্ষার হাতেখড়ি হয়েছে তার কাছে। কারও কাছে তিনি শৈশবের মক্তবের শিক্ষক, কারও কাছে শ্রদ্ধেয় হুজুর। আর নতুন প্রজন্মের শিশুদের কাছে তিনি ‘দাদা হুজুর’।
মাত্র ১৪ বছর বয়সে ফতেহপুর সরদারবাড়ি মসজিদের মক্তবে পড়ানো শুরু করেন আমানুল্লাহ। কৈশোরে শুরু হওয়া সেই পথচলা আজও অব্যাহত। দীর্ঘ ৫৩ বছরে অসংখ্য শিশুকে তিনি শিখিয়েছেন কোরআন তিলাওয়াত, নামাজ, কালিমা ও ইসলামের প্রাথমিক বিধিবিধান। তার ছাত্রদের অনেকে এখন সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত। তাদের কেউ কেউ নিজেরাও শিশুদের ধর্মীয় শিক্ষা দিচ্ছেন। একসময় যারা তার কাছে পড়েছেন, তাদের অনেকের সন্তানও পরে তার কাছেই মক্তবের প্রথম পাঠ নিয়েছে।
শুধু মক্তবে পড়ানো নয়, এলাকায় ধর্মীয় শিক্ষার প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার কাজেও ভূমিকা রেখেছেন আমান হুজুর। আশির দশকের শুরুতে ফতেহপুরে হিফজ ও ধর্মীয় শিক্ষার একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত হন তিনি। পরে স্থানীয় আলেম ও শিক্ষানুরাগীদের সহযোগিতায় ১৯৯৩ সালে প্রতিষ্ঠা করেন ফতেহপুর নূরানি তালীমুল কোরআন মাদ্রাসা। ২০০৬ সালে প্রতিষ্ঠানটি ‘ফতেহপুর জামিয়া রাহমানিয়া’ নামে নতুন পরিসরে কার্যক্রম শুরু করে।
দরিদ্র ও অসচ্ছল পরিবারের শিশুদের প্রতিও ছিল তার বিশেষ নজর। অর্থের অভাবে কোনো শিশু যেন ধর্মীয় শিক্ষা থেকে বঞ্চিত না হয়, সে জন্য অনেককেই বিনা বেতনে কিংবা নামমাত্র বেতনে পড়িয়েছেন তিনি। শিক্ষকতার পাশাপাশি ১৯৭৮ থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত স্থানীয় একটি জামে মসজিদে ইমামের দায়িত্বও পালন করেছেন।
এখন বয়স হয়েছে। আগের মতো সব দায়িত্ব পালন করা সম্ভব হয় না। তবে শিশুদের পড়ানোর আগ্রহে ভাটা পড়েনি। নিয়মিত তাদের শেখান কালিমায়ে তাইয়্যিবা, কালিমায়ে শাহাদাত, ইমানের মৌলিক বিষয় এবং প্রয়োজনীয় হাদিস। বয়সের ভার তাকে থামাতে পারেনি। বরং ছোটদের সঙ্গে সময় কাটানোই যেন তার দীর্ঘ শিক্ষকজীবনের সবচেয়ে আপন অভ্যাস।
শর্শদী ইউনিয়ন পরিষদের প্রশাসক মো. ইকবাল হোসেন ভূঁইয়া বলেন, ‘মাওলানা আমানুল্লাহ সাহেবের অর্ধশতকেরও বেশি সময়ের নিরবচ্ছিন্ন ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষাদান ফতেহপুর তথা ফেনী অঞ্চলের জন্য এক আলোকবর্তিকা। প্রজন্মের পর প্রজন্মকে সুশিক্ষিত ও নীতিবান মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার মাধ্যমে তিনি ধর্মীয় শিক্ষার ভিত্তি সুদৃঢ় করেছেন। তার নিষ্ঠা ও আত্মনিবেদন আগামী প্রজন্মকে ধর্মীয় শিক্ষকতায় অনুপ্রাণিত করবে।’
ফতেহপুর ও আশপাশের এলাকায় আমান হুজুরের পরিচিতি মূলত একজন মক্তবশিক্ষক হিসেবে। কত শিশুকে তিনি পড়িয়েছেন, তার সুনির্দিষ্ট হিসাব হয়তো তার নিজের কাছেও নেই। তবে এলাকার বহু পরিবারের স্মৃতিতে মক্তবের প্রথম পাঠের সঙ্গে জড়িয়ে আছে তার নাম। কোনো ঘরে হয়তো তার পড়ানো ছাত্র এখন বাবা, কোথাও সেই ছাত্রের সন্তানও তার কাছে পড়ছে।
পাঁচ দশকের বেশি সময় পেরিয়ে গেছে। সময় বদলেছে, বদলেছে মক্তবের শিক্ষার্থীদের প্রজন্ম। একসময় যাদের ছোট্ট হাতে কোরআন তুলে দিয়েছিলেন, তারা আজ জীবনের নানা ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত। তাদের পরের প্রজন্মও এসেছে তার কাছে। বয়স ৭১ হলেও আমান হুজুরের হাতে এখনো বই-খাতা, সামনে বসে ছোট ছোট শিশু। এভাবেই প্রজন্মের পর প্রজন্মের মাঝে ধর্মীয় শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দেওয়ার কাজ করে চলেছেন তিনি। তার এই দীর্ঘ শিক্ষকজীবন শুধু একটি ব্যক্তিগত অধ্যায়ের গল্প নয়, বরং একটি জনপদের ধর্মীয় শিক্ষার স্মৃতির সঙ্গেও জড়িয়ে থাকা এক অনুপ্রেরণার নাম।



