অপবাদের বিষবাষ্পে ক্ষতবিক্ষত সমাজ
- গুজব ও অপবাদের বিরুদ্ধে কোরআনের বার্তা

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
কোরআনুল কারিমের বার্তা
সুরা : নূর, আয়াত : ৪
بِسْمِ ٱللَّٰهِ ٱلرَّحْمَٰنِ ٱلرَّحِيمِ
পরম করুণাময়, অসীম দয়ালু আল্লাহর নামে
وَ الَّذِیۡنَ یَرۡمُوۡنَ الۡمُحۡصَنٰتِ ثُمَّ لَمۡ یَاۡتُوۡا بِاَرۡبَعَۃِ شُهَدَآءَ فَاجۡلِدُوۡهُمۡ ثَمٰنِیۡنَ جَلۡدَۃً وَّ لَا تَقۡبَلُوۡا لَهُمۡ شَهَادَۃً اَبَدًا ۚ وَ اُولٰٓئِكَ هُمُ الۡفٰسِقُوۡنَ
৪. আর যারা সচ্চরিত্রা নারীর প্রতি অপবাদ আরোপ করে, তারপর তারা চারজন সাক্ষী নিয়ে না আসে, তাদেরকে তোমরা আশিটি বেত্ৰাঘাত কর এবং তোমরা কখনো তাদের সাক্ষ্য গ্ৰহণ করবে না; এরাই তো ফাসেক।
সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যা
এই আয়াতে ইসলামের দৃষ্টিতে মানুষের সম্মান, বিশেষত নারীর মর্যাদা ও পারিবারিক পবিত্রতা রক্ষার কঠোর নির্দেশনা তুলে ধরা হয়েছে। কোনো সচ্চরিত্র নারী বা পুরুষের বিরুদ্ধে ব্যভিচারের মতো গুরুতর অভিযোগ প্রমাণ ছাড়া ছড়িয়ে দেওয়া ইসলামে বড় কবিরা গুনাহ। কারণ এমন অপবাদ শুধু একজন ব্যক্তির সম্মানই নষ্ট করে না, বরং পরিবার, সমাজ ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ওপরও ভয়াবহ প্রভাব ফেলে।
আল্লাহ তাআলা এখানে নির্দেশ দিয়েছেন, কেউ যদি কারও বিরুদ্ধে ব্যভিচারের অভিযোগ তোলে, তবে তাকে চারজন প্রত্যক্ষ সাক্ষী উপস্থিত করতে হবে। অর্থাৎ ইসলাম মানুষের ইজ্জত ও সম্মানকে এতটাই মূল্য দিয়েছে যে, গুজব, সন্দেহ বা ব্যক্তিগত বিদ্বেষের ভিত্তিতে কাউকে দোষী সাব্যস্ত করার সুযোগ রাখা হয়নি। চারজন সাক্ষীর শর্ত মূলত সমাজকে অপবাদ, কুৎসা ও চরিত্রহননের সংস্কৃতি থেকে রক্ষা করার জন্য।
আয়াতে বলা হয়েছে, যারা প্রমাণ ছাড়া এমন অপবাদ দেয়, তাদের জন্য তিনটি শাস্তির কথা উল্লেখ করা হয়েছে। প্রথমত, তাদেরকে আশি বেত্রাঘাত করা হবে। দ্বিতীয়ত, ভবিষ্যতে তাদের সাক্ষ্য গ্রহণযোগ্য হবে না। তৃতীয়ত, তাদের ‘ফাসেক’ বা অবাধ্য ব্যক্তি হিসেবে গণ্য করা হবে। মুফাসসিরগণ বলেন, এটি প্রমাণ করে যে ইসলামে মানুষের সম্মান ক্ষুণ্ন করা অত্যন্ত ভয়াবহ অপরাধ।
এই আয়াত নাজিলের পেছনে বিখ্যাত ‘ইফকের ঘটনা’ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। মুনাফিকরা আয়েশা (রা.)-এর বিরুদ্ধে মিথ্যা অপবাদ ছড়িয়েছিল। তখন আল্লাহ তাআলা আয়াত নাজিল করে তাঁর পবিত্রতা ঘোষণা করেন এবং ভবিষ্যতের জন্য কঠোর নীতিমালা নির্ধারণ করেন। (তাফসির ইবনে কাসির)
বর্তমান যুগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ইউটিউব, ফেসবুক বা বিভিন্ন অনলাইন প্ল্যাটফর্মে যাচাই ছাড়া মানুষের বিরুদ্ধে অপপ্রচার ও চরিত্রহনন আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। অনেক সময় একটি মিথ্যা পোস্ট বা গুজব একজন মানুষের জীবন ধ্বংস করে দিতে পারে। এই আয়াত মুসলিম সমাজকে শিক্ষা দেয়, কোনো সংবাদ বা অভিযোগ যাচাই ছাড়া প্রচার করা ঈমানদারের কাজ নয়। আল্লাহ তাআলা অন্যত্র বলেন, “যদি কোনো ফাসেক ব্যক্তি তোমাদের কাছে কোনো সংবাদ নিয়ে আসে, তবে তা যাচাই করে নাও।” (সুরা হুজুরাত, আয়াত : ৬)
রাসুলুল্লাহ (সা.) আরও সতর্ক করে বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি কোনো মুমিনের বিরুদ্ধে এমন দোষ আরোপ করে যা তার মধ্যে নেই, আল্লাহ তাকে জাহান্নামের শাস্তিতে রাখবেন যতক্ষণ না সে নিজের কথা ফিরিয়ে নেয়।’ (আবু দাউদ, হাদিস : ৪৮৮৩)
অতএব, এই আয়াতের মূল শিক্ষা হলো, মানুষের সম্মান রক্ষা করা, গুজব ও অপবাদ থেকে সমাজকে নিরাপদ রাখা এবং কথা ও তথ্য প্রচারে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করা। ইসলাম এমন একটি সমাজ গঠন করতে চায়, যেখানে মানুষের ইজ্জত, পরিবার ও ব্যক্তিগত মর্যাদা নিরাপদ থাকবে।






