কোরআনের বাণী
কোরআন যাদের জন্য লাঞ্ছনাকর শাস্তি ঘোষণা করেছে
- কোরআনবিমুখ থাকার ভয়াবহ পরিণতি

প্রতীকী ছবি
কোরআনুল কারিমের বার্তা
সুরা : লোকমান, আয়াত : ০৬
পরম করুণাময়, অসীম দয়ালু আল্লাহর নামে
মানুষের মধ্যে কেউ কেউ অজ্ঞ লোকদের আল্লাহর পথ হতে বিচ্যুত করার জন্য অসার বাক্য ক্রয় করে এবং আল্লাহর প্রদর্শিত পথ নিয়ে ঠাট্টা-বিদ্রূপ করে। ওদেরই জন্য রয়েছে অবমাননাকর শাস্তি।
সুরা লোকমানের আলোচ্য আয়াতটিতে মহান আল্লাহতায়ালা এক বিশেষ শ্রেণির মানুষের কথা তুলে ধরেছেন, যারা নিজেরা সত্যকে গ্রহণ করে না, বরং অন্যদেরও সত্যের পথ থেকে সরিয়ে দিতে সচেষ্ট থাকে। আয়াতের প্রতিটি শব্দের ভেতরেই একটি গভীর সামাজিক ও আধ্যাত্মিক বাস্তবতা লুকিয়ে আছে।
আল্লাহ বলেন, কিছু মানুষ ‘লাহওয়াল হাদিস’ বা অসার কথাবার্তা ক্রয় করে। মুফাসসিরগণ এর ব্যাখ্যায় বলেছেন, এর দ্বারা বোঝানো হয়েছে এমন সব বিষয়, যা মানুষের মনকে আল্লাহর স্মরণ, কোরআনের শিক্ষা এবং সত্য পথ থেকে দূরে সরিয়ে দেয়। ইবনে আব্বাস (রা.), মুজাহিদ (রহ.) প্রমুখ তাফসিরকারগণ বলেছেন, এর মধ্যে গান-বাজনা, মিথ্যা গল্প, অশ্লীল ও বিভ্রান্তিকর আলোচনা; সবই অন্তর্ভুক্ত, যদি সেগুলো মানুষকে দ্বীনের পথ থেকে বিমুখ করে দেয় (তাফসিরে তাবারী, কুরতুবী)।
এখানে ‘ক্রয় করা’ শব্দটি কেবল অর্থ ব্যয় করাকে বোঝায় না; বরং আগ্রহ, সময় ও মনোযোগ ব্যয় করাকেও বোঝায়। অর্থাৎ, কেউ যদি নিজের মূল্যবান সময় ও শক্তি এমন কাজে ব্যয় করে, যা তাকে এবং অন্যদের হেদায়েত থেকে দূরে সরিয়ে দেয়, তাহলে সেটিও এই আয়াতের অন্তর্ভুক্ত।
আয়াতে বলা হচ্ছে, তারা “অজ্ঞতাবশত মানুষকে আল্লাহর পথ থেকে বিচ্যুত করে।” এখানে অজ্ঞতা মানে কেবল জ্ঞানের অভাব নয়; বরং সত্যকে উপেক্ষা করা, অহংকারে অন্ধ হয়ে থাকা। অনেক সময় তারা নিজেরাও বুঝতে পারে না যে, তাদের এই কাজ অন্যদের জন্য কত বড় ক্ষতির কারণ হচ্ছে। আবার অনেকেই জেনেশুনে এই কাজ করে—নিজস্ব স্বার্থ, খ্যাতি বা প্রভাব ধরে রাখার জন্য।
আয়াতের পরবর্তী অংশে বলা হয়েছে, তারা আল্লাহর পথকে নিয়ে ঠাট্টা-বিদ্রূপ করে। এটি একটি ভয়ংকর মানসিকতার পরিচয়। যখন কেউ সত্যকে যুক্তি দিয়ে মোকাবিলা করতে পারে না, তখন সে উপহাসের আশ্রয় নেয়। ইতিহাসে দেখা যায়, নবী-রাসুলদের বিরোধীরা প্রায়ই এ পথই বেছে নিয়েছিল। তারা সত্যকে অস্বীকার করার পাশাপাশি সেটিকে উপহাসের বস্তু বানিয়েছে। যেমন পবিত্র কোরআনের সুরা ইয়াসিনের ৩০ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, ‘আফসোস এসব বান্দার প্রতি! তাদের কাছে যে রাসুলই এসেছে, তাকে নিয়ে তারা ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ করত।’ আবার সুরা মুতাফফিফীনের ২৯-৩২ আয়াতে বলা হয়েছে, ‘নিশ্চয় যারা অপরাধ করেছে তারা মুমিনদেরকে উপহাস করত, আর যখন তারা মুমিনদের কাছ দিয়ে যেত তখন তারা চোখ টিপে বিদ্রূপ করত, আর যখন তাদের আপনজনের কাছে ফিরে আসত তখন তারা ফিরত উৎফুল্ল হয়ে, আর যখন মুমিনদেরকে দেখত তখন বলত, নিশ্চয় এরা পথভ্ৰষ্ট।’
সবশেষে আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘ওদের জন্য রয়েছে অবমাননাকর শাস্তি।’ এখানে শাস্তির বর্ণনায় ‘মুহীন’ শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে, যার অর্থ এমন শাস্তি যা শুধু কষ্টদায়ক নয়, বরং লাঞ্ছনাকরও। কারণ তারা দুনিয়াতে আল্লাহর বাণী ও পথকে অপমান করেছে, তাই আখিরাতে তাদের জন্যও অপমানজনক পরিণতি নির্ধারিত হয়েছে।
এই আয়াত আমাদের জন্য একটি সতর্কবার্তা। আমরা কী শুনছি, কী পড়ছি, কী প্রচার করছি; এসব বিষয়ে সচেতন হওয়া জরুরি। কারণ কথাবার্তা, বিনোদন বা তথ্য; এসবই আমাদের হৃদয়কে গঠন করে। যদি সেগুলো সত্য থেকে দূরে সরিয়ে দেয়, তাহলে তা ধীরে ধীরে আমাদের ইমান ও চরিত্রকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। আর যদি আমরা এমন কিছু ছড়িয়ে দিই, যা অন্যদেরও আল্লাহর পথ থেকে সরিয়ে দেয়, তাহলে তার দায়ও আমাদের ওপর বর্তাবে।
তাই একজন মুমিনের দায়িত্ব হলো, নিজের সময় ও মনোযোগ এমন জিনিসে ব্যয় করা, যা তাকে আল্লাহর নৈকট্যের দিকে এগিয়ে দেয় এবং অন্যদের জন্যও কল্যাণ বয়ে আনে।



