কোরআনের বাণী
কিয়ামতের দিন প্রতিটি ভালোমন্দ কাজ সামনে আনা হবে

প্রতীকী ছবি
কোরআনুল কারিমের বার্তা
সুরা : লোকমান, আয়াত : ১৬
পরম করুণাময়, অসীম দয়ালু আল্লাহর নামে
১৬. হে আমার প্রিয় বৎস! নিশ্চয় তা (পাপ-পুণ্য) যদি সরিষার দানা পরিমাণও হয়, অতঃপর তা থাকে শিলাগর্ভে অথবা আসমানসমূহে কিংবা জমিনে, আল্লাহ তাও উপস্থিত করবেন। নিশ্চয়ই আল্লাহ সূক্ষ্মদর্শী, সম্যক অবহিত।
সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যা
সুরা লোকমানের এই আয়াতটি পবিত্র কোরআনের গভীরতম নৈতিক শিক্ষাগুলোর একটি, যেখানে একজন পিতার স্নেহময় উপদেশের ভেতর দিয়ে মানবজীবনের জবাবদিহির এক সুস্পষ্ট চিত্র তুলে ধরা হয়েছে।
আয়াতের ভাষা লক্ষ্য করলে প্রথমেই চোখে পড়ে, “يَا بُنَيَّ” (হে আমার প্রিয় বৎস)। এটি কেবল একটি সম্বোধন নয়; বরং ভালোবাসা, মমতা ও দায়িত্ববোধে ভরা এক শিক্ষণ-পদ্ধতি। লোকমান (আ.) তাঁর সন্তানকে কঠোর ভাষায় নয়, বরং হৃদয়স্পর্শী কোমলতায় এমন এক সত্য শেখাচ্ছেন, যা মানুষের অন্তরকে জাগিয়ে তোলে।
এরপর তিনি বললেন, যদি কোনো কাজ সরিষার দানা পরিমাণও ক্ষুদ্র হয়, তা যদি পাথরের গভীরে লুকানো থাকে, কিংবা আসমান বা জমিনের যেকোনো প্রান্তে থাকে, আল্লাহ তা উপস্থিত করবেন। এখানে ‘সরিষার দানা’ দিয়ে বোঝানো হয়েছে কাজের ক্ষুদ্রতা, আর ‘শিলাগর্ভ, আসমান, জমিন’ দিয়ে বোঝানো হয়েছে তার লুকিয়ে থাকার সম্ভাব্য সর্বোচ্চ গভীরতা ও দূরত্ব। অর্থাৎ মানুষের কোনো কাজই এত ছোট নয় বা এত গোপন নয়, যা আল্লাহর জ্ঞানের বাইরে থাকতে পারে।
মুফাসসিররা এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক তুলে ধরেছেন। এই আয়াত মূলত মানুষের মধ্যে ‘মুরাকাবা’ বা আল্লাহর সর্বক্ষণ উপস্থিতি অনুভব করার চেতনা গড়ে তোলে।
আল্লামা ইবন কাসীর (রহ.) বলেন, এই আয়াত মানুষকে স্মরণ করিয়ে দেয় যে, কিয়ামতের দিন মহান আল্লাহ প্রতিটি ভালো বা মন্দ কাজ উপস্থাপন করবেন এবং তার যথাযথ প্রতিদান দেবেন। (তাফসির ইবন কাসীর, সুরা : লোকমান, আয়াত : ১৬)।
আয়াতের শেষাংশে বলা হয়েছে, “إِنَّ اللَّهَ لَطِيفٌ خَبِيرٌ”। এখানে ‘লতীফ’ শব্দটি বোঝায় যে, আল্লাহ এমন সূক্ষ্ম বিষয়ও জানেন, যা মানুষের বোধগম্যতার বাইরে। আর ‘খবীর’ অর্থ হচ্ছে তিনি সবকিছুর পরিপূর্ণ খবর রাখেন, অন্তরের গোপন চিন্তাও তাঁর কাছে অজানা নয়। ইমাম কুরতুবী (রহ.) ব্যাখ্যা করেন, আল্লাহর এই দুটি গুণ একত্রে মানুষের সামনে একটি পূর্ণাঙ্গ উপলব্ধি সৃষ্টি করে; তিনি যেমন সূক্ষ্মতম বিষয় অবলোকন করেন, তেমনি তার প্রকৃত অবস্থা সম্পর্কেও সম্পূর্ণ অবগত (তাফসির কুরতুবী)।
এই আয়াতের সঙ্গে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর একটি হাদিস গভীরভাবে সম্পৃক্ত— ‘যে ব্যক্তি অণু পরিমাণ সৎকর্ম করবে, সে তা দেখবে; আর যে অণু পরিমাণ অসৎকর্ম করবে, সেও তা দেখবে।’ (মুসলিম, হাদিস: ২৬৫৭)
বর্তমান জীবনেও এই আয়াতের তাৎপর্য অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। মানুষ যখন একা থাকে, তখন অনেকেই মনে করে, কেউ দেখছে না, তাই ছোটখাটো অন্যায় করা যায়। কিন্তু এই আয়াত সে ধারণাকে ভেঙে দেয়। এটি শেখায় যে, একটি ছোট মিথ্যা, গোপন অন্যায়, কিংবা অদৃশ্য কোনো সৎকর্ম—সবই আল্লাহর কাছে সংরক্ষিত আছে।
একই সঙ্গে এই আয়াত আশার বার্তাও বহন করে। অনেক সময় মানুষ ক্ষুদ্র কোনো ভালো কাজকে গুরুত্বহীন মনে করে। একটি হাসি, একটি সহানুভূতির কথা, একটি গোপন দান খুব সাধারণ মনে হয়। কিন্তু আল্লাহর কাছে এসব কিছুই মূল্যহীন নয়। বরং সেই ক্ষুদ্র কাজই কিয়ামতের দিনে মুক্তির কারণ হতে পারে।
এই আয়াত মানুষকে দুটি মৌলিক চেতনায় প্রতিষ্ঠিত করে। একদিকে জবাবদিহির ভয়, অন্যদিকে আল্লাহর ন্যায়বিচারের প্রতি আস্থা। এটি এমন একটি নৈতিক দৃষ্টি গড়ে তোলে, যেখানে মানুষ প্রকাশ্য ও গোপন; উভয় অবস্থাতেই নিজেকে সংশোধন করতে সচেষ্ট হয়, কারণ সে জানে, কোনো কিছুই আল্লাহর দৃষ্টি থেকে আড়াল নয়।



