অশ্লীলতার বিস্তার রোধে ইসলামের প্রতিরোধনীতি

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
কোরআনুল কারিমের বার্তা
সুরা : নূর, আয়াত : ১,২
بِسْمِ ٱللَّٰهِ ٱلرَّحْمَٰنِ ٱلرَّحِيمِ
পরম করুণাময়, অসীম দয়ালু আল্লাহর নামে
سُوۡرَۃٌ اَنۡزَلۡنٰهَا وَ فَرَضۡنٰهَا وَ اَنۡزَلۡنَا فِیۡهَاۤ اٰیٰتٍۭ بَیِّنٰتٍ لَّعَلَّكُمۡ تَذَكَّرُوۡنَ ﴿۱﴾
اَلزَّانِیَۃُ وَ الزَّانِیۡ فَاجۡلِدُوۡا كُلَّ وَاحِدٍ مِّنۡهُمَا مِائَۃَ جَلۡدَۃٍ ۪ وَّ لَا تَاۡخُذۡكُمۡ بِهِمَا رَاۡفَۃٌ فِیۡ دِیۡنِ اللّٰهِ اِنۡ كُنۡتُمۡ تُؤۡمِنُوۡنَ بِاللّٰهِ وَ الۡیَوۡمِ الۡاٰخِرِ ۚ وَ لۡیَشۡهَدۡ عَذَابَهُمَا طَآئِفَۃٌ مِّنَ الۡمُؤۡمِنِیۡنَ ﴿۲﴾
১. এটা একটি সূরা, এটা আমরা নাযিল করেছি এবং এর বিধানকে আমরা অবশ্য পালনীয় করেছি, আর এতে আমরা নাযিল করেছি সুস্পষ্ট আয়াতসমূহ যাতে তোমরা উপদেশ গ্ৰহণ কর।
২. ব্যভিচারিণী ও ব্যভিচারী— তাদের প্ৰত্যেককে একশত বেত্ৰাঘাত করবে, আল্লাহর বিধান কার্যকরীকরণে তাদের প্রতি দয়া যেন তোমাদেরকে প্রভাবান্বিত না করে, যদি তোমরা আল্লাহ্ এবং আখেরাতের উপর ঈমানদার হও; আর মুমিনদের একটি দল যেন তাদের শাস্তি প্ৰত্যক্ষ করে।
সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যা
উল্লিখিত আয়াত দুটি পবিত্র কোরআনের সুরা আন-নূর-এর সূচনা অংশ। এই সুরাটি মূলত ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজজীবনের পবিত্রতা রক্ষার বিধান নিয়ে অবতীর্ণ হয়েছে। ইসলামী সভ্যতায় নৈতিকতা, লজ্জাশীলতা, পারিবারিক নিরাপত্তা ও সামাজিক শৃঙ্খলার যে ভিত্তি, সুরা আন-নূর তা অত্যন্ত শক্তভাবে প্রতিষ্ঠা করে।
প্রথম আয়াতের শুরুতেই মহান আল্লাহ তাআলা বিশেষভাবে সুরাটির গুরুত্ব ঘোষণা করেছেন। কোরআনের সব সুরাই আল্লাহর পক্ষ থেকে অবতীর্ণ, কিন্তু এখানে ‘ফারাদনাহা’ শব্দ ব্যবহার করে বোঝানো হয়েছে যে, এ সুরার বিধানগুলো কেবল উপদেশ নয়, বরং সমাজজীবনে বাস্তবায়নযোগ্য অপরিহার্য আইন। ইমাম কুরতুবি রহ. বলেছেন, এখানে আল্লাহ তাআলা মানুষকে সতর্ক করেছেন যে, পারিবারিক ও সামাজিক পবিত্রতার প্রশ্নে কোনো শৈথিল্য গ্রহণযোগ্য নয়।
এই সুরায় পর্দা, দৃষ্টি সংযম, অপবাদ, ব্যভিচার, শালীনতা, পারিবারিক অনুমতি, সামাজিক সম্পর্ক ইত্যাদি বিষয়ে এমন সব নির্দেশনা এসেছে, যা একটি সভ্য ও নিরাপদ সমাজ গঠনের ভিত্তি। আজকের পৃথিবীতে যখন অশ্লীলতা, অবাধ সম্পর্ক ও মিডিয়ার অপসংস্কৃতি পরিবারব্যবস্থাকে দুর্বল করে দিচ্ছে, তখন সুরা আন-নূরের শিক্ষা আরও বেশি প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে।
দ্বিতীয় আয়াতে বলা হয়েছে—‘ব্যভিচারিণী ও ব্যভিচারী— তাদের প্রত্যেককে একশত বেত্রাঘাত করো...’ এখানে ইসলামে ব্যভিচারের ভয়াবহতা তুলে ধরা হয়েছে। ইসলাম মানুষের স্বাভাবিক প্রবৃত্তিকে অস্বীকার করে না; বরং বিবাহের মাধ্যমে তা পবিত্র ও বৈধ পথে পরিচালিত করে। কিন্তু যখন সমাজে অবাধ যৌনতা ছড়িয়ে পড়ে, তখন পরিবার ধ্বংস হয়, বংশপরিচয় অনিশ্চিত হয়, নারী নির্যাতন বাড়ে, শিশুদের নিরাপত্তা নষ্ট হয় এবং মানুষের অন্তর থেকে লজ্জাবোধ বিলীন হতে থাকে। তাই ইসলাম ব্যভিচারকে শুধু ব্যক্তিগত গুনাহ হিসেবে দেখেনি; বরং সামাজিক অপরাধ হিসেবেও বিবেচনা করেছে।
আয়াতে বলা হয়েছে, ‘আল্লাহর বিধান কার্যকর করতে গিয়ে তাদের প্রতি দয়া যেন তোমাদেরকে প্রভাবিত না করে।’ এর অর্থ নিষ্ঠুরতা নয়; বরং ন্যায়বিচারের ক্ষেত্রে আবেগ দ্বারা প্রভাবিত না হওয়া। কারণ অপরাধীর প্রতি অযথা কোমলতা অনেক সময় পুরো সমাজের প্রতি নিষ্ঠুরতায় পরিণত হয়। ইবনে কাসির রহ. লিখেছেন, এখানে উদ্দেশ্য হলো আল্লাহর বিধান প্রতিষ্ঠায় দৃঢ় থাকা, ব্যক্তিগত আবেগ বা সামাজিক প্রভাবের কাছে নতি স্বীকার না করা।
তবে ইসলামী শরিয়তে এ শাস্তি কার্যকর করার জন্য অত্যন্ত কঠোর শর্ত রয়েছে। চারজন প্রত্যক্ষ সাক্ষী ছাড়া অভিযোগ প্রমাণিত হয় না। ফলে ইসলাম একদিকে যেমন সমাজকে অশ্লীলতা থেকে রক্ষা করেছে, অন্যদিকে মানুষের সম্মান ও ব্যক্তিগত মর্যাদাকেও সর্বোচ্চ নিরাপত্তা দিয়েছে। মিথ্যা অপবাদদাতার জন্যও পবিত্র কোরআন কঠিন শাস্তির ঘোষণা দিয়েছে।
আয়াতের শেষাংশে বলা হয়েছে, ‘মুমিনদের একটি দল যেন তাদের শাস্তি প্রত্যক্ষ করে।’ এর উদ্দেশ্য প্রতিশোধ নয়; বরং সমাজকে সতর্ক করা, যাতে মানুষ অপরাধের ভয়াবহতা উপলব্ধি করে এবং নৈতিক অবক্ষয় থেকে দূরে থাকে।
আজকের যুগে পশ্চিমা সংস্কৃতির প্রভাবে অনেক সমাজে ব্যভিচারকে ব্যক্তিস্বাধীনতার অংশ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। অথচ বাস্তবে এর ফলে পরিবার ভাঙন, মানসিক অস্থিরতা, যৌন অপরাধ ও সামাজিক বিপর্যয় বাড়ছে। ইসলাম মানুষের মর্যাদা, পরিবারব্যবস্থা ও সমাজের পবিত্রতা রক্ষার জন্যই কঠোরভাবে ব্যভিচারকে নিষিদ্ধ করেছে।
সূরা আন-নুরের এ আয়াতগুলো আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়, একটি সুস্থ সমাজ গড়তে শুধু আইন নয়, ঈমান, লজ্জাশীলতা ও আল্লাহভীতি অপরিহার্য। যখন মানুষ অন্তরে আল্লাহকে ভয় করবে, তখনই সমাজে সত্যিকারের পবিত্রতা ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠিত হবে।






