কোরআনের বাণী
দ্বীনের প্রশ্নে দৃঢ়তা ও আচরণে কোমলতাই ইসলামের পথ

প্রতীকী ছবি
কোরআনুল কারিমের বার্তা
সুরা : লোকমান, আয়াত : ১৫
পরম করুণাময়, অসীম দয়ালু আল্লাহর নামে
১৫. আর তোমার পিতা-মাতা যদি তোমাকে আমার সাথে শির্ক করার জন্য পীড়াপীড়ি করে, যে বিষয়ে তোমার কোনো জ্ঞান নেই, তাহলে তুমি তাদের কথা মেনো না এবং দুনিয়াতে তাদের সাথে বসবাস করবে সদ্ভাবে। আর যে আমার অভিমুখী হয়েছে তার পথ অনুসরণ কর। তারপর তোমাদের ফিরে আসা আমারই কাছে, তখন তোমরা যা করতে সে বিষয়ে আমি তোমাদেরকে অবিহিত করব।
সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যা
উল্লেখিত আয়াতটি সূরা লুকমানের ১৫ নম্বর আয়াত। এটি এমন এক সূক্ষ্ম ভারসাম্যের শিক্ষা দেয়, যেখানে একদিকে রয়েছে তাওহীদের অটল থাকার আবশ্যকতা, অন্যদিকে রয়েছে পিতা-মাতার প্রতি সদ্ব্যবহারের গুরুত্ব। দুটোকেই একসাথে ধারণ করতে বলা হয়েছে।
আয়াতের শুরুতেইমহান আল্লাহ বলেন, যদি পিতা-মাতা সন্তানকে শির্কে বাধ্য করে; অর্থাৎ আল্লাহর সঙ্গে কাউকে শরিক করতে চাপ প্রয়োগ করে; তাহলে সেই আদেশ মানা যাবে না। কারণ তাওহীদ ইসলামের মূল ভিত্তি, এবং এখানে কোনো আপসের সুযোগ নেই। আয়াতের বাক্য ‘যে বিষয়ে তোমার কোনো জ্ঞান নেই’—এর অর্থ, শির্কের পক্ষে কোনো প্রমাণ বা সত্যতা নেই; এটি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। তাই আল্লাহর সঙ্গে অন্য কাউকে শরিক করা জ্ঞানের পরিপন্থী এবং সত্যের বিপরীত।
কিন্তু এখানেই আয়াত থেমে যায়নি; বরং পরবর্তী অংশে বলা হয়েছে, ‘দুনিয়াতে তাদের সাথে সদ্ভাবে বসবাস কর।’ অর্থাৎ আকীদাগত বিরোধ থাকলেও পিতা-মাতার সাথে আচরণে কঠোরতা বা বিদ্বেষের অনুমতি নেই। পিতা-মাতা যদি কাফিরও হন, তবুও তাদের সাথে সুন্দর আচরণ, সহানুভূতি ও দায়িত্ব পালন করতে হবে। ইসলামের এই নির্দেশ মানবিক সম্পর্ককে ভেঙে দেয় না; বরং তা নৈতিকতা ও সৌন্দর্যের মধ্যে বেঁধে রাখে।
এরপর বলা হয়েছে, ‘যে আমার অভিমুখী হয়েছে তার পথ অনুসরণ কর।’ অর্থাৎ ঈমানদার ও সত্যনিষ্ঠ মানুষের পথই অনুসরণযোগ্য। এখানে সৎ সঙ্গের গুরুত্বের প্রতি ইঙ্গিত রয়েছে। যারা আল্লাহমুখী, তাদের সাথে চললেই মানুষ সঠিক পথে অবিচল থাকতে পারে।
আয়াতের শেষাংশে মহান আল্লাহ স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন যে, ‘তোমাদের ফিরে আসা আমার কাছেই।’ অর্থাৎ দুনিয়ার সব সম্পর্ক, চাপ ও দ্বন্দ্বের পরেও চূড়ান্ত বিচার আল্লাহর কাছেই হবে। তখন তিনি প্রতিটি কাজের হিসাব নেবেন। এই স্মরণ মানুষকে দায়িত্বশীল করে এবং সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে শক্তি দেয়।
মুফসসিরগণ বলেন, এই আয়াত বিশেষভাবে নাজিল হয়েছিল সাহাবি সা‘দ ইবন আবি ওয়াক্কাস (রা.)-এর ঘটনাকে কেন্দ্র করে। সা‘দ ইবন আবি ওয়াক্কাস (রা.) ইসলাম গ্রহণ করলে তার মা শপথ করলেন যে, যতক্ষণ তুমি আবার পূর্ববর্তী দ্বীনে ফিরে না আসবে ততক্ষণ আমি কোনো খাবার গ্রহণ করবোনা। কিন্তু সা‘দ (রা.) তার এ কথা মান্য করলেন না। তার সমর্থনেই এই আয়াত নাযিল হয়। (মুসলিম, হাদিস: ১৭৪৮)
এই আয়াত আমাদের শেখায় যে, ইসলাম কোনো চরমপন্থী দ্বন্দ্বের শিক্ষা দেয় না। এটি সত্যের প্রশ্নে দৃঢ়, কিন্তু সম্পর্কের ক্ষেত্রে কোমল। আকীদায় আপস করা সুযোগ যেমন নেই, তেমনি আচরণে সৌন্দর্য হারানোরও অবকাশ নেই।



