কোরআনের বাণী
চোখের হেফাযত চরিত্রের দুর্গ

প্রতীকী ছবি
কোরআনুল কারিমের বার্তা
সুরা : নূর, আয়াত : ৩০
بِسْمِ ٱللَّٰهِ ٱلرَّحْمَٰنِ ٱلرَّحِيمِ
পরম করুণাময়, অসীম দয়ালু আল্লাহর নামে
قُلۡ لِّلۡمُؤۡمِنِیۡنَ یَغُضُّوۡا مِنۡ اَبۡصَارِهِمۡ وَ یَحۡفَظُوۡا فُرُوۡجَهُمۡ ؕ ذٰلِكَ اَزۡكٰی لَهُمۡ ؕ اِنَّ اللّٰهَ خَبِیۡرٌۢ بِمَا یَصۡنَعُوۡنَ
৩০. মুমিনদেরকে বলুন, তারা যেন তাদের দৃষ্টিকে সংযত করে এবং তাদের লজ্জাস্থানের হেফাযত করে; এটাই তাদের জন্য অধিক পবিত্র। তারা যা করে নিশ্চয় আল্লাহ সে বিষয়ে সম্যক অবহিত।
এই আয়াতে আল্লাহ তাআলা মানব চরিত্র গঠন, সামাজিক পবিত্রতা এবং নৈতিক নিরাপত্তার একটি মৌলিক নীতি শিক্ষা দিয়েছেন। ইসলামে শালীনতা ও পবিত্রতা প্রতিষ্ঠার যে ব্যবস্থা রয়েছে, তার সূচনা হয়েছে মানুষের দৃষ্টি নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে।
আল্লাহ তাআলা প্রথমে রাসুল (সা.)-কে নির্দেশ দিয়েছেন, ‘মুমিনদেরকে বলুন’। এর দ্বারা বোঝা যায়, এটি কেবল একটি পরামর্শ নয়; বরং ঈমানদারদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি আদেশ। মানুষের অধিকাংশ পাপের সূচনা হয় চোখের মাধ্যমে। কোনো নিষিদ্ধ বিষয়, পরনারী বা পরপুরুষ, অশ্লীল দৃশ্য কিংবা কামনা-উদ্দীপক বস্তুর প্রতি অবাধ দৃষ্টি হৃদয়ে কুপ্রবৃত্তির জন্ম দেয়। তাই আল্লাহ বলেছেন, ‘তারা যেন তাদের দৃষ্টিকে সংযত করে।’
এখানে ‘দৃষ্টি সংযত করা’ বলতে সম্পূর্ণ চোখ বন্ধ করে রাখা বোঝানো হয়নি। বরং হারাম ও কামনাপ্রবণ দৃষ্টি থেকে চোখ ফিরিয়ে রাখা বোঝানো হয়েছে। ইবনে কাসীর (রহ.) বলেছেন, মুমিন এমন সব বিষয় থেকে নিজের দৃষ্টি রক্ষা করবে, যা আল্লাহ হারাম করেছেন। কোনো নিষিদ্ধ জিনিস হঠাৎ চোখে পড়ে গেলে সঙ্গে সঙ্গে দৃষ্টি সরিয়ে নেওয়াই হলো এই আদেশের বাস্তব প্রয়োগ।
রাসুলুল্লাহ (সা.) আলী (রা.)-কে বলেছিলেন:
يَا عَلِيُّ، لَا تُتْبِعِ النَّظْرَةَ النَّظْرَةَ، فَإِنَّ لَكَ الْأُولَى وَلَيْسَتْ لَكَ الْآخِرَةُ
‘হে আলী! এক দৃষ্টির পর আরেক দৃষ্টি দিও না। প্রথম (অনিচ্ছাকৃত) দৃষ্টি তোমার জন্য ক্ষমাযোগ্য, কিন্তু পরবর্তী দৃষ্টি নয়।’ (আবু দাউদ, হাদিস : ২১৪৯; তিরমিজি, হাদিস : ২৭৭৭)
এরপর আল্লাহ বলেছেন, “এবং তারা যেন তাদের লজ্জাস্থানের হেফাযত করে।” অর্থাৎ অবৈধ যৌনাচার, ব্যভিচার, সমকামিতা এবং যৌন পাপের সকল পথ থেকে নিজেদের রক্ষা করবে। অধিকাংশ মুফাসসিরের মতে, দৃষ্টি সংযত করার নির্দেশ লজ্জাস্থান সংরক্ষণের আগে উল্লেখ করা হয়েছে, কারণ চোখই অনেক সময় পাপের প্রথম দরজা। দৃষ্টি নিয়ন্ত্রিত হলে হৃদয় পবিত্র থাকে, আর হৃদয় পবিত্র থাকলে চরিত্রও সুরক্ষিত থাকে।
রাসুল (সা.) বলেছেন:
الْعَيْنَانِ تَزْنِيَانِ وَزِنَاهُمَا النَّظَرُ
‘চোখও ব্যভিচার করে, আর চোখের ব্যভিচার হলো (হারামভাবে) তাকানো।’ (বুখারী, হাদিস : ৬২৪৩; মুসলিম, হাদিস : ২৬৫৭)
এরপর আল্লাহ তাআলা বলেছেন, “এটাই তাদের জন্য অধিক পবিত্র।” অর্থাৎ দৃষ্টি ও চরিত্রের হেফাযত মানুষের অন্তরকে কলুষমুক্ত করে, ঈমানকে শক্তিশালী করে এবং সমাজকে অশ্লীলতা ও নৈতিক অবক্ষয় থেকে রক্ষা করে। যে ব্যক্তি নিজের চোখ ও প্রবৃত্তিকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে, তার হৃদয়ে তাকওয়া বৃদ্ধি পায় এবং সে আল্লাহর নৈকট্য লাভ করে।
ইমাম কুরতুবী (রহ.) উল্লেখ করেছেন, এই আয়াত প্রমাণ করে যে অন্তরের পবিত্রতা, পারিবারিক শান্তি এবং সামাজিক নিরাপত্তা রক্ষার অন্যতম প্রধান উপায় হলো দৃষ্টি সংযম। কারণ অনিয়ন্ত্রিত দৃষ্টি অনেক সময় এমন অগ্নিস্ফুলিঙ্গ সৃষ্টি করে, যা পরবর্তীতে বড় পাপের দিকে নিয়ে যায়।
আয়াতের শেষাংশে মহান আল্লাহ তাআলা সতর্ক করে বলেছেন, “তারা যা করে নিশ্চয় আল্লাহ সে বিষয়ে সম্যক অবহিত।” মানুষ হয়তো অন্যের দৃষ্টি এড়িয়ে কোনো কাজ করতে পারে, কিন্তু আল্লাহর জ্ঞান থেকে কিছুই গোপন নয়। মানুষের চোখ কোথায় তাকিয়েছে, হৃদয়ে কী চিন্তা এসেছে, প্রকাশ্যে বা গোপনে কী করেছে, সবই আল্লাহ জানেন। তাই এই নির্দেশ কেবল সামাজিক শৃঙ্খলার জন্য নয়; বরং আল্লাহভীতির ভিত্তিতে আত্মশুদ্ধিরও শিক্ষা।
সুতরাং এই আয়াত আমাদের শেখায় যে চরিত্রের পবিত্রতা রক্ষার প্রথম ধাপ হলো দৃষ্টি সংযম। যে ব্যক্তি নিজের চোখকে হারাম থেকে রক্ষা করে এবং নিজের লজ্জাস্থানের হেফাযত করে, সে ব্যক্তিগতভাবে পবিত্র জীবন লাভ করে, পরিবারকে নিরাপদ রাখে এবং একটি নৈতিক ও সুস্থ সমাজ গঠনে ভূমিকা রাখে। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে এই আয়াতের নির্দেশনা অনুযায়ী জীবন পরিচালনার তাওফীক দান করুন। আমীন।




