ঋণ রেখে মারা যাওয়ার ভয়াবহ পরিণতি

প্রতীকী ছবি
ব্যবসা-বাণিজ্য, চিকিৎসা, শিক্ষা কিংবা সংসারের প্রয়োজনে মানুষকে অনেক সময় ঋণ নিতে হয়। আর ইসলাম প্রয়োজনের ক্ষেত্রে ঋণ গ্রহণকে বৈধতা দিয়েছে। কিন্তু ঋণ পরিশোধে অবহেলা বা গাফিলতিকে অত্যন্ত গুরুতর বিষয় হিসেবে বিবেচনা করেছে। কারণ ঋণ বান্দার হকের অন্তর্ভুক্ত। তাই মৃত্যুর পরও এর দায় থেকে মানুষ স্বয়ংক্রিয়ভাবে মুক্ত হয় না।
পবিত্র কোরআনে ঋণ লেনদেনের গুরুত্ব এত বেশি যে, এ বিষয়ে কোরআনের সবচেয়ে দীর্ঘ আয়াত নাজিল হয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেছেন, ‘হে মুমিনগণ! তোমরা যখন নির্দিষ্ট সময়ের জন্য ঋণ লেনদেন করবে, তখন তা লিখে রাখো।’ (সুরা বাকারা, আয়াত : ২৮২) এ আয়াত প্রমাণ করে, ঋণের হিসাব সংরক্ষণ করা, সাক্ষী রাখা এবং লেনদেনে স্বচ্ছতা বজায় রাখা ইসলামে কতটা গুরুত্বপূর্ণ।
রাসুলুল্লাহ (সা.) ঋণের বোঝা থেকে আল্লাহর কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করতেন। তিনি দোয়া করতেন, ‘হে আল্লাহ! আমি আপনার কাছে আশ্রয় চাই ঋণের ভার এবং মানুষের দমন-পীড়ন থেকে।’ (বুখারি, হাদিস: ৬৩৬৯) এটি প্রমাণ করে, ঋণ মানুষের জন্য মানসিক ও ধর্মীয় উভয় দিক থেকেই বড় দায়িত্ব।
ঋণ রেখে মৃত্যুবরণ করলে বিষয়টি আরও সংবেদনশীল হয়ে ওঠে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘মুমিন ব্যক্তির রূহ ঋণ পরিশোধ না করা পর্যন্ত তার ঋণের সাথে বন্ধক অবস্থায় থাকে।’ (তিরমিজি, হাদিস: ১০৭৮) আলেমগণ বলেছেন, এ হাদিসের অর্থ হলো, ঋণের বিষয়টি নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত মৃত ব্যক্তির ওপর এ দায় বহাল থাকে। তাই জীবদ্দশায় ঋণ পরিশোধে সচেষ্ট হওয়া এবং মৃত্যুর আগে পরিবারের সদস্যদের ঋণের তথ্য জানিয়ে রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
এ কারণেই রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর যুগে এমন ঘটনা ঘটেছিল যে, ঋণগ্রস্ত ব্যক্তির ঋণ পরিশোধের দায়িত্ব কেউ গ্রহণ না করা পর্যন্ত তিনি তার জানাজার নামাজ আদায় থেকে বিরত ছিলেন- সালামাহ ইবনে আকওয়া (রা.) হতে বর্ণিত যে, তিনি বলেছেন, একদিন আমরা নবী (সা.)-এর নিকট বসা ছিলাম। এমন সময় একটি জানাযা উপস্থিত করা হল। সাহাবীগণ বললেন, আপনি তার জানাযার সালাত আদায় করে দিন। নবী (সা.) বললেন, তার কি কোনো ঋণ আছে? তারা বলল, না। তিনি বললেন, সে কি কিছু রেখে গেছে? তারা বলল, না। তখন তিনি তার জানাযার সালাত আদায় করলেন। তারপর আরেকটি জানাযা উপস্থিত করা হল। সাহাবীগণ বললেন, হে আল্লাহর রাসুল! আপনি জানাযার সালাত আদায় করে দিন। তিনি বললেন, তার কি কোনো ঋণ আছে? বলা হল, হ্যাঁ, আছে। তিনি বললেন, সে কি কিছু রেখে গেছে? তারা বললেন, তিনটি দ্বীনার। তখন তিনি তার জানাযার সালাত আদায় করলেন। তারপর তৃতীয় আরেকটি জানাযা উপস্থিত করা হল। সাহাবীগণ বললেন, আপনি তার জানাযা আদায় করুন। তিনি বলেন, সে কি কিছু রেখে গেছে। তারা বললেন, না। তিনি বললেন, তার কি কোনো ঋণ আছে। তারা বললেন, তিন দ্বীনার। তিনি বললেন, তোমাদের এ লোকটির সালাত তোমরাই আদায় করে নাও। আবু কাতাদাহ (রা.) বললেন, হে আল্লাহর রাসুল (সা.)! তার জানাযার সালাত আদায় করুন, তার ঋণের জন্য আমি দায়ী। তখন তিনি তার জানাযার সালাত আদায় করলেন। (বুখারি, হাদিস: ২২৮৯)
এই হাদিসের মাধ্যমে তিনি উম্মাহকে ঋণের গুরুত্ব সম্পর্কে বাস্তব শিক্ষা দিয়েছেন।
কোরআনেও মৃত ব্যক্তির সম্পদ বণ্টনের আগে তার ঋণ পরিশোধের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আল্লাহ তাআলা উত্তরাধিকার বণ্টনের বিধান বর্ণনা করে বলেছেন, ঋণ পরিশোধ ও অসিয়ত বাস্তবায়নের পর সম্পদ বণ্টন করতে হবে। (সুরা আন-নিসা, আয়াত : ১১-১২) অর্থাৎ ঋণ পরিশোধ উত্তরাধিকার বণ্টনের আগেই সম্পন্ন করতে হবে।
কিয়ামতের দিন বান্দার হকের হিসাব অত্যন্ত কঠিন হবে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যার ওপর তার ভাইয়ের কোনো অধিকার বা জুলুম রয়েছে, সে যেন আজই তা থেকে মুক্ত হয়ে নেয়। কারণ সেখানে দিনার-দিরহাম থাকবে না; বরং তার নেক আমল থেকে পাওনাদারের অধিকার আদায় করা হবে। আর নেক আমল না থাকলে পাওনাদারের গুনাহ তার ওপর চাপিয়ে দেওয়া হবে।’ (বুখারি, হাদিস: ২৪৪৯)
তবে এ আলোচনার অর্থ এই নয় যে, ঋণ রেখে মারা যাওয়া প্রত্যেক ব্যক্তির পরিণতি এক হবে। ইসলাম নিয়তেরও মূল্যায়ন করে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি মানুষের সম্পদ গ্রহণ করে তা পরিশোধ করার ইচ্ছা রাখে, আল্লাহ তার পক্ষ থেকে তা আদায়ের ব্যবস্থা করে দেন। আর যে ব্যক্তি আত্মসাৎ করার উদ্দেশ্যে নেয়, আল্লাহ তাকে ধ্বংস করেন।’ (বুখারি, হাদিস: ২৩৮৭) তাই আন্তরিকভাবে ঋণ পরিশোধের চেষ্টা করা এবং সুযোগ থাকা সত্ত্বেও ইচ্ছাকৃতভাবে তা এড়িয়ে যাওয়ার মধ্যে মৌলিক পার্থক্য রয়েছে।
কাজেই ঋণকে কখনো হালকাভাবে নেওয়া উচিত নয়। ঋণ নিলে তা যথাসময়ে পরিশোধ করা, সব লেনদেন লিখিতভাবে সংরক্ষণ করা এবং পরিবারের সদস্যদের এ বিষয়ে অবহিত রাখা একজন মুসলমানের দায়িত্ব। কারণ দুনিয়ায় একটি অপরিশোধিত ঋণ আখিরাতে কঠিন জবাবদিহির কারণ হতে পারে। তাই মৃত্যুর আগেই মানুষের হক আদায় করে আল্লাহর কাছে দায়মুক্ত হওয়ার সর্বোচ্চ চেষ্টা করাই একজন মুমিনের পরিচয়।
লেখক: আলেম ও সাংবাদিক
saipas352@gmail.com




