গীবতের ভয়াবহ পরিণাম

প্রতীকী ছবি
মানুষের জিহ্বা আল্লাহর দেওয়া অন্যতম বড় নিয়ামত। এই জিহ্বা দিয়েই মানুষ আল্লাহর জিকির করে, সত্যের সাক্ষ্য দেয়, জ্ঞান প্রচার করে এবং মানুষের হৃদয়ে শান্তির বাণী পৌঁছে দেয়। আবার এই জিহ্বাই নিয়ন্ত্রণহীন হলে মানুষের নেক আমল ধ্বংস করে দেয়, সমাজে বিদ্বেষ ছড়ায় এবং আখিরাতে ভয়াবহ শাস্তির কারণ হয়ে যায়। ইসলামে জিহ্বার যেসব গুনাহকে সবচেয়ে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে, গীবত তার অন্যতম। গীবত এমন একটি পাপ, যা কেবল একজন ব্যক্তির সম্মানই নষ্ট করে না; বরং পারস্পরিক বিশ্বাস, ভ্রাতৃত্ব ও সামাজিক সম্প্রীতিকেও ধ্বংস করে দেয়। তাই কোরআন ও সুন্নাহ গীবতকে অত্যন্ত ভয়াবহ অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করেছে।
গীবতের শাস্তির একটি হৃদয়বিদারক দৃশ্য রাসুলুল্লাহ (সা.) মি'রাজের রাতে প্রত্যক্ষ করেছিলেন। আনাস ইবনে মালিক (রা.) বর্ণনা করেছেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন,
لَمَّا عُرِجَ بِي مَرَرْتُ بِقَوْمٍ لَهُمْ أَظْفَارٌ مِنْ نُحَاسٍ يَخْمُشُونَ وُجُوهَهُمْ وَصُدُورَهُمْ، فَقُلْتُ: مَنْ هَؤُلَاءِ يَا جِبْرِيلُ، قَالَ: هَؤُلَاءِ الَّذِينَ يَأْكُلُونَ لُحُومَ النَّاسِ، وَيَقَعُونَ فِي أَعْرَاضِهِمْ
‘মি'রাজের রাতে আমি এমন এক সম্প্রদায়ের পাশ দিয়ে অতিক্রম করছিলাম, যাদের নখ ছিল তামার তৈরি। তারা সেই নখ দিয়ে নিজেদের মুখমণ্ডল ও বুক আঁচড়াচ্ছিল। আমি বললাম, 'হে জিবরীল! এরা কারা?' তিনি বললেন, 'এরা সেই লোক, যারা মানুষের গোশত ভক্ষণ করত (অর্থাৎ গীবত করত) এবং মানুষের সম্মানহানি করত।' (দাউদ, হাদিস ৪৮৭৮)
এই হাদিস গীবতের ভয়াবহ শাস্তির একটি চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। যারা দুনিয়ায় অন্যের সম্মান ক্ষুণ্ন করেছে, কিয়ামতের আগে বারযাখ বা আখিরাতের শাস্তিতে তাদের নিজেদের মুখ ও বুকই ক্ষতবিক্ষত করতে হবে। কারণ, তারা জিহ্বা দিয়ে অন্যের চরিত্রে আঘাত করেছিল।
গীবত কী, তা রাসুলুল্লাহ (সা.) নিজেই ব্যাখ্যা করেছেন। তিনি বলেছেন, ‘তোমার ভাই সম্পর্কে এমন কথা বলা, যা সে অপছন্দ করে, সেটাই গীবত।’ সাহাবিরা জিজ্ঞেস করলেন, যদি কথাটি সত্য হয়? তিনি বললেন, ‘যদি তা সত্য হয়, তবে সেটাই গীবত। আর যদি সত্য না হয়, তবে তা অপবাদ (বুহতান)।’ (মুসলিম, হাদিস : ২৫৮৯)
অর্থাৎ সত্য কথা হলেও যদি তা তার অনুপস্থিতিতে এমনভাবে বলা হয়, যা সে পছন্দ করবে না, তবে তা গীবত। আর মিথ্যা হলে তা আরও বড় অপরাধ।
গীবতের ভয়াবহতা বোঝাতে আল্লাহ তাআলা পবিত্র কোরআনে এক অনন্য উপমা দিয়েছেন। তিনি বলেছেন,
وَلَا يَغْتَبْ بَعْضُكُم بَعْضًا ۚ أَيُحِبُّ أَحَدُكُمْ أَن يَأْكُلَ لَحْمَ أَخِيهِ مَيْتًا فَكَرِهْتُمُوهُ
‘তোমরা একে অপরের গীবত করো না। তোমাদের কেউ কি তার মৃত ভাইয়ের গোশত খেতে পছন্দ করবে? নিশ্চয়ই তোমরা তা ঘৃণা করবে।’ (সুরা আল-হুজুরাত, আয়াত : ১২)
ইমাম ইবনে কাসির (রহ.) বলেছেন, এই আয়াতে গীবতের নিকৃষ্টতা বোঝাতে এমন উপমা দেওয়া হয়েছে, যা মানুষের স্বভাবগত ঘৃণাবোধকে জাগিয়ে তোলে। যেমন মৃত ভাইয়ের গোশত খাওয়া অকল্পনীয় ও জঘন্য, তেমনি গীবতও আল্লাহর কাছে অত্যন্ত জঘন্য অপরাধ। (তাফসির ইবনু কাসির)
গীবতের সবচেয়ে বড় ক্ষতির একটি হলো, এটি মানুষের নেক আমল অন্যের কাছে স্থানান্তর করে দেয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমরা কি জানো, নিঃস্ব ব্যক্তি কে?" সাহাবিরা বললেন, যার অর্থ-সম্পদ নেই। তিনি বললেন, "আমার উম্মতের প্রকৃত নিঃস্ব ব্যক্তি সে, যে কিয়ামতের দিন নামাজ, রোজা ও জাকাত নিয়ে আসবে; কিন্তু সে কাউকে গালি দিয়েছে, কারও ওপর অপবাদ দিয়েছে, কারও সম্পদ আত্মসাৎ করেছে, কারও রক্ত ঝরিয়েছে এবং কাউকে প্রহার করেছে। তখন তার নেক আমলগুলো তাদের মধ্যে বণ্টন করে দেওয়া হবে। নেক আমল শেষ হয়ে গেলে তাদের গুনাহ তার ওপর চাপিয়ে দেওয়া হবে, এরপর তাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে।’ (মুসলিম, হাদিস : ২৫৮১)
গীবতের ক্ষতি শুধু আখিরাতেই নয়, দুনিয়াতেও ভয়াবহ। এটি পরিবারে বিভেদ সৃষ্টি করে, বন্ধুত্ব নষ্ট করে, কর্মক্ষেত্রে অবিশ্বাস তৈরি করে এবং সমাজে শত্রুতা ও বিদ্বেষ ছড়িয়ে দেয়। তাই ইসলাম মানুষের সম্মান রক্ষাকে কাবা শরিফের মর্যাদার মতোই গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচনা করেছে।
ইমাম নববী (রহ.) তার 'রিয়াদুস সালিহীন' ও 'আল-আযকার' গ্রন্থে গীবতকে কবিরা গুনাহ হিসেবে উল্লেখ করেছেন এবং অপ্রয়োজনে মানুষের দোষ আলোচনা করা থেকে কঠোরভাবে সতর্ক করেছেন।
গীবত থেকে বাঁচার সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো কথা বলার আগে নিজেকে প্রশ্ন করা, ‘এই কথা আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য প্রয়োজনীয় কি না?’ রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি আল্লাহ ও আখিরাতের প্রতি ঈমান রাখে, সে যেন উত্তম কথা বলে অথবা নীরব থাকে।’ (বুখারি, হাদিস : ৬০১৮)
যদি কারও দ্বারা গীবত হয়ে যায়, তাহলে আন্তরিক তওবা করা, ভবিষ্যতে তা থেকে বিরত থাকার দৃঢ় সংকল্প করা এবং সম্ভব হলে যার গীবত করা হয়েছে, তার জন্য দোয়া করা ও তার প্রশংসা করা উচিত। অনেক আলেমের মতে, যদি সরাসরি ক্ষমা চাইতে গেলে আরও বড় ফিতনার আশঙ্কা থাকে, তাহলে তার জন্য বেশি বেশি ইস্তিগফার ও দোয়া করা উত্তম। (ইমাম নববী, আল-আযকার; ইবনু তাইমিয়্যা, মাজমু' আল-ফাতাওয়া)
গীবত এমন একটি গুনাহ, যা মানুষ অনেক সময় তুচ্ছ মনে করে, অথচ আল্লাহ ও তাঁর রাসুল (সা.) এটিকে ভয়াবহ অপরাধ হিসেবে ঘোষণা করেছেন। মি'রাজের রাতের সেই ভয়ঙ্কর দৃশ্য, কুরআনের কঠোর উপমা এবং কিয়ামতের দিনের হিসাব আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে, মানুষের সম্মান রক্ষা করা ঈমানেরই অংশ। তাই প্রত্যেক মুসলিমের কর্তব্য জিহ্বাকে সংযত রাখা, অন্যের দোষ প্রচার না করা এবং এমন সমাজ গড়ে তোলা, যেখানে সম্মান, সৌহার্দ্য ও ভ্রাতৃত্ব গীবতের বিষ থেকে নিরাপদ থাকে।
লেখক: আলেম ও সাংবাদিক




