কোরবানির পশু পরিবর্তন করা যাবে?

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
কোরবানির জন্য নির্দিষ্ট পশু পরিবর্তন করার মাসআলাটি ফিকহে গুরুত্বপূর্ণ একটি আলোচনা। বিশেষত কেউ যদি একটি পশু কোরবানির নিয়তে নির্ধারণ করার পর সেটি বিক্রি করে অন্য পশু নেয়, তাহলে তার বিধান কী হবে, তা নিয়ত, মানত, আর্থিক অবস্থা এবং পশু নির্ধারণের ধরন অনুযায়ী ভিন্ন হয়। ইসলামি ফিকহে এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা পাওয়া যায়।
প্রথমে এর মূলনীতি বুঝতে হবে। সাধারণভাবে কোরবানির পশু শুধু মনে মনে নির্ধারণ করলেই তা ‘ওয়াজিব নির্দিষ্ট’ হয়ে যায় না। তবে কিছু অবস্থায় পশুটি নির্দিষ্ট হয়ে যায়, তখন তা পরিবর্তন করার বিধান ভিন্ন হয়।
হানাফি ফিকহ অনুযায়ী কোরবানিদাতা মূলত দুই ধরনের হতে পারেন—
১. ধনী ব্যক্তি,
যার ওপর কোরবানি ওয়াজিব।
২. গরিব ব্যক্তি,
যার ওপর কোরবানি ওয়াজিব নয়।
এ দুই অবস্থার হুকুম আলাদা।
ধনী ব্যক্তি যদি কোরবানির জন্য একটি পশু ক্রয় করেন, তাহলে শুধু ক্রয় করার মাধ্যমে পশুটি চূড়ান্তভাবে নির্দিষ্ট হয়ে যায় না। তিনি চাইলে সেটি বিক্রি করে তার চেয়ে উত্তম বা সমমূল্যের অন্য পশু নিতে পারবেন।
বাদায়েউস সানায়ে গ্রন্থে বলা হয়েছে— ‘ধনী ব্যক্তি যদি কোরবানির পশু নির্ধারণ করে, অতঃপর তা পরিবর্তন করে অন্য পশু নেয়, তবে তা বৈধ। কারণ তার ওপর মূলত কোরবানি ওয়াজিব, নির্দিষ্ট পশুটি নয়।’ (বাদায়েউস সানায়ে, ৫/৬৮)
অর্থাৎ ওয়াজিব হলো ‘কোরবানি আদায় করা’; নির্দিষ্ট ওই ছাগল বা গরুই কোরবানি করতে হবে, এমন নয়।
তবে শর্ত হলো, নতুন পশুটি কোরবানির উপযুক্ত হতে হবে। আর যদি কম মূল্যের পশু নেয়, তাহলে বাকি টাকা সদকা করা উত্তম।
ফাতাওয়ায়ে হিন্দিয়্যাতে এসেছে— ‘ধনী ব্যক্তি নির্ধারিত পশু বিক্রি করে অন্য পশু ক্রয় করলে তা জায়েজ হবে।’ (ফাতাওয়া আল-হিন্দিয়্যা, ৫/৩০০)
কিন্তু যদি ব্যক্তি গরিব হন, যার ওপর কোরবানি ওয়াজিব নয়, আর তিনি কোরবানির নিয়তে পশু কিনে ফেলেন, তাহলে সেই পশুটি তার জন্য নির্দিষ্ট হয়ে যায়। কারণ তার ক্ষেত্রে ক্রয়টাই এক ধরনের ইলতিজাম (নিজের ওপর নেওয়া দায়বদ্ধতা) হিসেবে গণ্য হয়।
ইমাম মরগীনানি (রহ.) হিদায়া কিতাবে বলেছেন— ‘গরিব ব্যক্তি কোরবানির পশু ক্রয় করলে সেটিই তার জন্য আবশ্যক হয়ে যায়।’ (আল-হিদায়াহ, ৪/৩৫৮)
এ অবস্থায় সেই পশু বিক্রি করে পরিবর্তন করা মাকরূহ বা অনুচিত বলা হয়েছে। তবে যদি উত্তম পশু দ্বারা পরিবর্তন করে, তাহলে কিছু আলেম জায়েজ বলেছেন।
আর যদি কেউ স্পষ্টভাবে মানত করে বলে, ‘এই পশুটিই আমি আল্লাহর নামে কোরবানি করব’, তাহলে পশুটি মানতের কারণে নির্দিষ্ট হয়ে যাবে। তখন বিনা প্রয়োজনে পরিবর্তন করা বৈধ হবে না।
দলীল হিসেবে ফকিহগণ কোরআনের এ আয়াতও উল্লেখ করেছেন—
وَالْبُدْنَ جَعَلْنَاهَا لَكُم مِّن شَعَائِرِ اللَّهِ
‘কোরবানির উটগুলোকে আমি আল্লাহর নিদর্শনসমূহের অন্তর্ভুক্ত করেছি।’ (সুরা হজ, আয়াত : ৩৬)
অর্থাৎ আল্লাহর নামে নির্ধারিত পশুর একটি বিশেষ মর্যাদা সৃষ্টি হয়।
তবে একান্ত প্রয়োজনে পরিবর্তনের সুযোগ রয়েছে। যেমন— পশু অসুস্থ হয়ে গেলে, বড় ত্রুটি দেখা দিলে, হারিয়ে গেলে, উত্তম পশু দ্বারা পরিবর্তন করতে চাইলে। এসব ক্ষেত্রে পরিবর্তন বৈধ।
ফাতাওয়ায়ে
শামিতে এসেছে— ‘যদি উত্তম পশু দ্বারা পরিবর্তন করা হয়,
তবে তা অধিক উত্তম।’
(রদ্দুল মুহতার,
৬/৩২৬)
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাসআলা হলো, কেউ যদি নির্ধারিত পশু বিক্রি করে সেই টাকা অন্য কাজে ব্যয় করে ফেলে এবং পরে কোরবানি না করে, তাহলে গুনাহগার হবে। কারণ কোরবানির ওয়াজিব আদায় বাকি রয়ে গেছে।
মোট কথা হলো—
- * ধনী ব্যক্তি কোরবানির পশু পরিবর্তন করতে পারবেন, যদি অন্য উপযুক্ত পশু নেন।
- * উত্তম পশু দ্বারা পরিবর্তন করা জায়েজ এবং কখনো উত্তম।
- * গরিব ব্যক্তি কোরবানির নিয়তে পশু কিনলে সেটি অধিক নির্দিষ্ট হয়ে যায়।
- * মানত করা পশু বিনা প্রয়োজনে পরিবর্তন করা বৈধ নয়।
- * প্রয়োজনে বা শরয়ি কারণে পরিবর্তনের সুযোগ আছে।
তবে বাস্তবে মাসআলার সূক্ষ্মতা পরিস্থিতিভেদে ভিন্ন হতে পারে। বিশেষ করে মানত, শরিকানা পশু বা নির্দিষ্ট করার ভাষা নিয়ে জটিলতা থাকলে অভিজ্ঞ কোনো মুফতির সঙ্গে পরামর্শ করা উত্তম।






