পৃথিবীর প্রথম কোরবানি থেকে আজকের ঈদুল আজহা

ছবি: আগামীর সময়
মানবসভ্যতার ইতিহাসে কোরবানি শুধু একটি ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা নয়; বরং এটি মানুষের আত্মসমর্পণ, তাকওয়া ও ত্যাগের এক চিরন্তন প্রতীক। পৃথিবীর প্রথম মানব হজরত আদম (আ.)-এর যুগ থেকেই কোরবানির সূচনা। সময়ের প্রবাহে সভ্যতা বদলেছে, প্রযুক্তির বিস্তার ঘটেছে, জীবনযাত্রায় এসেছে বিপুল পরিবর্তন; কিন্তু কোরবানির মূল শিক্ষা আজও একই রয়েছে। আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য নিজের প্রিয় জিনিস উৎসর্গ করার যে মানসিকতা, সেটিই কোরবানির প্রাণ।
পবিত্র কোরআনে পৃথিবীর প্রথম কোরবানির ঘটনা অত্যন্ত তাৎপর্যের সঙ্গে উল্লেখ করা হয়েছে। মহান আল্লাহ তাআলা বলেছেন, ‘আপনি তাদেরকে আদমের দুই পুত্রের সত্য ঘটনা শুনিয়ে দিন। যখন তারা উভয়ে কোরবানি পেশ করেছিল, তখন একজনের কোরবানি কবুল করা হলো এবং অন্যজনেরটি কবুল করা হলো না।’ (সুরা মায়িদা, আয়াত: ২৭)
মুফাসসিরগণ উল্লেখ করেছেন, আদম ও হাওয়া (আ.)-এর মাধ্যমেই পৃথিবীতে বংশ বিস্তার আরম্ভ হয়। হাওয়া (আ.)-এর প্রতি গর্ভ থেকে একটি পুত্রসন্তান ও একটি কন্যাসন্তান যমজরূপে জন্মগ্রহণ করত। তখন শরিয়তের বিধান ছিল, একই গর্ভ থেকে যে যমজ পুত্র ও কন্যা জন্মগ্রহণ করবে, তারা পরস্পর সহোদর ভাই বোন। তাদের মধ্যে বৈবাহিক সম্পর্ক হারাম। কিন্তু পরবর্তী গর্ভের পুত্রের জন্য প্রথম গর্ভে জন্মগ্রহণকারিণী কন্যা সহোদরা বোন নয়। তাদের মধ্যে পরস্পর বিবাহবন্ধন বৈধ।
ঘটনাক্রমে কাবিলের সহোদরা বোন ছিল পরমাসুন্দরী এবং হাবিলের বোন ছিল অপেক্ষাকৃত কম সুন্দরী। বিয়ের সময় হলে নিয়মানুযায়ী হাবিলের সহজাত বোন কাবিলের ভাগে পড়ে। এতে কাবিল অসন্তুষ্ট হয়ে হাবিলের শত্রু হয়ে যায়। সে জিদ ধরে বলল, আমার সহজাত বোনকে আমার সঙ্গে বিবাহ দিতে হবে। আদম (আ.) তার শরিয়তের আইনের পরিপ্রেক্ষিতে কাবিলের আবদার প্রত্যাখ্যান করলেন। কিন্তু কাবিল তার সিদ্ধান্তে আটল রইল। সে তার বক্তব্য থেকে সরে আসতে নারাজ।
এতে উভয়ের মাঝে মতভেদ দেখা দেয়। তাদের এই দ্বন্দ্ব নিরসনে আদম আলাইহিস সালাম তাদের আল্লাহর উদ্দেশ্যে কোরবানি করার নির্দেশ দিলেন। আর সে সময় কোরবানি গৃহীত হওয়ার একটি সুস্পষ্ট নিদর্শন এই ছিল যে, খোলা জায়গায় কোরবানির জন্য নির্ধারিত বস্তু রেখে দেওয়া হতো। তখন আকাশ থেকে একটি অগ্নিশিখা এসে সে কোরবানিকে ভষ্মীভূত করে ফেলত। আর যার কোরবানি কবুল হতো না, তারটা পড়ে থাকত।
আদম আলাইহিস সালামের নির্দেশের পর তার দুই ছেলে কোরবানির প্রস্তুতি নিলেন। দুই ছেলের মধ্যে কাবিল চাষাবাদ করতো আর হাবিল পশুপালন করতো। কাবিল নিজের চাষ করা গমের শীষ থেকে ভালগুলো বের করে নিয়ে খারাপগুলোর একটি আটি কোরবানির জন্য পেশ করল। আর হাবিল তার পশুগুলোর মধ্য থেকে সবচেয়ে উৎকৃষ্ট একটি দুম্বা কোরবানির জন্য পেশ করল।
এরপর নিয়মানুযায়ী আকাশ থেকে অগ্নিশিখা এসে হাবিলের কোরবানিটি ভষ্মীভুত করে দিলো। আর কাবিলের কোরবানি যথাস্থানেই পড়ে থাকল। মোট কথা হাবিলের কোরবানি গৃহীত হলো আর কাবিলেরটি হলো না। কিন্তু কাবিল এ আসমানি সিদ্ধান্তও মেনে নিতে পারল না। বরং এতে কাবিলের ক্ষোভ আরো বেড়ে গেল। সে আত্মসংবরণ করতে না পেরে প্রকাশ্যে তার ভাইকে বলল, ‘আমি অবশ্যই তোমাকে হত্যা করব।’ হাবিল তখন ক্রোধের জবাবে ক্রোধ প্রদর্শন না করে একটি মার্জিত ও নীতিগত বাক্য উচ্চারণ করে বলল ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ মুত্তাকিদের পক্ষ থেকেই গ্রহণ করেন।’ (সুরা মায়িদা, আয়াত: ২৭)
আল্লামা ইবনে কাসির (রহ.) তার বিখ্যাত তাফসিরগ্রন্থে লিখেছেন, ‘সুরা মায়িদার এ আয়াত প্রমাণ করে, আল্লাহর কাছে আমলের গ্রহণযোগ্যতা নির্ভর করে নিয়তের বিশুদ্ধতা ও তাকওয়ার ওপর।’ (তাফসির ইবনে কাসির, সুরা মায়িদা: ২৭)
অর্থাৎ কোরবানির মূল বিষয় পশু, রক্ত বা বাহ্যিক আয়োজন নয়; বরং অন্তরের ভয়, আনুগত্য ও আন্তরিকতা।
পরবর্তীকালে ইবরাহিম (আ.) ও তার পুত্র ইসমাইল (আ.)-এর ঐতিহাসিক আত্মত্যাগ কোরবানির শিক্ষাকে নতুন উচ্চতায় পৌঁছে দেয়। পবিত্র কোরআনে বর্ণিত হয়েছে, আল্লাহ তাআলা স্বপ্নের মাধ্যমে ইবরাহিম (আ.)-কে তার প্রিয় পুত্রকে কোরবানি করার নির্দেশ দেন। তিনি বিনা দ্বিধায় সেই আদেশ পালনের জন্য প্রস্তুত হন। ইসমাইল (আ.)-ও পিতাকে বলেন, ‘হে আমার পিতা, আপনাকে যা আদেশ করা হয়েছে তা-ই করুন। ইনশাআল্লাহ, আপনি আমাকে ধৈর্যশীলদের অন্তর্ভুক্ত পাবেন।’ (সুরা সাফফাত, আয়াত: ১০২)
ফতহুল কাদিরের বর্ণনায় পাওয়া যায় যে, হাবিলের পেশকৃত যে দুম্বাটি জান্নাতে উঠিয়ে নেওয়া হয় এবং তা জান্নাতে বিচরণ করতে ছিল। অবশেষে ইসমাঈল (আ.)-কে কোরবানি করার চেষ্ঠা করার সময় ওই দুম্বাটি পাঠিয়ে ইবরাহিম (আ.)-কে দিয়ে তা কোরবানি করানো হয়।
অবশেষে মহান আল্লাহ তাআলা তাদের আনুগত্য কবুল করেন এবং ইসমাইল (আ.)-এর পরিবর্তে একটি দুম্বা কোরবানির ব্যবস্থা করেন। সেই ঘটনার স্মৃতিচারণ হিসেবেই মুসলিম উম্মাহ প্রতিবছর ঈদুল আজহায় কোরবানি আদায় করে থাকে।
রাসুলুল্লাহ (সা.) কোরবানির গুরুত্ব সম্পর্কে বলেন, ‘আদমসন্তান কোরবানির দিনের কোনো আমল আল্লাহর কাছে রক্ত প্রবাহিত করার চেয়ে অধিক প্রিয় নয়।’ (তিরমিজি, হাদিস: ১৪৯৩; ইবনে মাজাহ, হাদিস: ৩১২৬)
অন্য হাদিসে এসেছে, ‘কোরবানির পশুর প্রতিটি পশমের বিনিময়ে একটি করে নেকি রয়েছে।’ (তিরমিজি, হাদিস: ১৪৯৮)
তবে ইসলাম কোরবানিকে নিছক আচার-অনুষ্ঠানে সীমাবদ্ধ রাখেনি। পবিত্র কোরআন স্পষ্টভাবে ঘোষণা করেছে, ‘আল্লাহর কাছে পৌঁছে না এগুলোর গোশত কিংবা রক্ত; বরং পৌঁছে তোমাদের তাকওয়া।’ (সুরা হজ, আয়াত: ৩৭)
এ কারণেই মুসলিম স্কলাররা কোরবানির আত্মিক দিকের ওপর সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়েছেন। ইমাম নববী (রহ.) বলেছেন, ‘কোরবানির প্রকৃত উদ্দেশ্য হলো আল্লাহর আনুগত্য প্রকাশ এবং তাঁর সন্তুষ্টি অর্জন।’ (আল-মাজমু, ৮/৩৮৩)
শাহ ওয়ালিউল্লাহ দেহলভী (রহ.) কোরবানির সামাজিক তাৎপর্য ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেছেন,
‘কোরবানি মানুষের হৃদয় থেকে কৃপণতা দূর করে এবং সমাজে উদারতা ও সহমর্মিতা সৃষ্টি করে।’ (হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগাহ, ২/৭৩)
আজকের আধুনিক বিশ্বে কোরবানির ধরনে এসেছে নানা পরিবর্তন। একসময় কোরবানির পশু কিনতে মানুষকে কাদা-মাটি পেরিয়ে হাটে যেতে হতো। এখন অনলাইন হাট, লাইভ ভিডিও ও ডিজিটাল পেমেন্টের মাধ্যমে ঘরে বসেও পশু কেনা সম্ভব হচ্ছে। বড় শহরগুলোতে ‘ফুল সার্ভিস কোরবানি’ চালু হয়েছে, যেখানে পশু কেনা থেকে শুরু করে জবাই, মাংস কাটা ও প্যাকেটজাত করে বাসায় পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থাও করা হয়।
তবে আধুনিকতার এ প্রবাহের মাঝেও নতুন কিছু প্রশ্ন সামনে এসেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কোরবানির পশু নিয়ে প্রদর্শনী, অতিরিক্ত বিলাসিতা কিংবা প্রতিযোগিতামূলক মনোভাব অনেক সময় কোরবানির মূল চেতনাকে আড়াল করে দিচ্ছে। অনেক আলেম এ বিষয়ে সতর্ক করেছেন যে, কোরবানি যেন তাকওয়ার পরিবর্তে অহংকার ও লোকদেখানো সংস্কৃতিতে পরিণত না হয়।
একই সঙ্গে পরিবেশ ও স্বাস্থ্য সচেতনতাও এখন গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য বিষয়। নগরজীবনে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, পরিচ্ছন্নতা এবং স্বাস্থ্যসম্মত জবাইয়ের বিষয়গুলো কোরবানির সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। অনেক মুসলিম দেশে এখন নির্ধারিত কসাইখানায় কোরবানি দেওয়ার নিয়ম চালু হয়েছে, যাতে জনদুর্ভোগ ও পরিবেশদূষণ কমানো যায়।
কোরবানির আরেকটি বড় দিক হলো সামাজিক সাম্য প্রতিষ্ঠা। ইসলাম কোরবানির গোশত আত্মীয়স্বজন, প্রতিবেশী ও দরিদ্র মানুষের মধ্যে বণ্টনের নির্দেশ দিয়েছে। এর মাধ্যমে সমাজের ধনী-গরিবের ব্যবধান কিছুটা হলেও কমে আসে এবং ভ্রাতৃত্ববোধ জোরদার হয়।
মূলত পৃথিবীর প্রথম কোরবানির ঘটনা আমাদের যে শিক্ষা দেয়, তা আজও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক। হাবিলের কোরবানি কবুল হয়েছিল তার আন্তরিকতা ও তাকওয়ার কারণে। আজও আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্য হবে সেই কোরবানি, যা অহংকার, প্রদর্শনী ও স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে একান্তভাবে তাঁর সন্তুষ্টির জন্য নিবেদিত হবে।
তাই কোরবানির বাহ্যিক চাকচিক্যের চেয়ে এর আত্মিক শিক্ষা অনুধাবন করাই সবচেয়ে জরুরি। পৃথিবীর প্রথম কোরবানির ইতিহাস থেকে শুরু করে আজকের ডিজিটাল যুগ পর্যন্ত কোরবানির মূল আহ্বান একটাই, মানুষ যেন নিজের ভেতরের লোভ, অহংকার ও পশুত্বকে বিসর্জন দিয়ে আল্লাহর আনুগত্যে আত্মসমর্পণ করে।






