হাদিসের আলোকে জুমার দিনের ফযিলতপূর্ণ আমল

সংগৃহীত ছবি
শুক্রবার জুমার দিন। এটি মুসলমানদের জন্য অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ ও সাপ্তাহিক উৎসবের দিন। কারণ এটি এমন একটি দিন; যে দিনে সময় যেন আলাদা করে মুমিনের দিকে ফিরে তাকায়। মহান আল্লাহ তাআলা নিজেই দিনকে সম্মানিত করেছেন। এই দিনের প্রতিটি মুহূর্তে ছড়িয়ে আছে রহমত, মাগফিরাত ও নৈকট্যের আহ্বান। তাই জুমা কেবল একটি নামাজের দিন নয়; বরং এটি আত্মশুদ্ধি, প্রস্তুতি ও আল্লাহর দিকে প্রত্যাবর্তনের এক অনন্য সুযোগ বয়ে নিয়ে আসা একটি দিন।
পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ বলেছেন, ‘হে মুমিনগণ! জুমার দিনে যখন নামাজের জন্য আহ্বান করা হয়, তখন তোমরা আল্লাহর স্মরণের দিকে ধাবিত হও এবং বেচা-কেনা ছেড়ে দাও। এটাই তোমাদের জন্য উত্তম, যদি তোমরা জানতে।’ (সুরা জুমু‘আহ, আয়াত : ৯)
এই আয়াত স্পষ্ট করে দেয় যে, জুমা শুধু একটি আনুষ্ঠানিক ইবাদত নয়; বরং দুনিয়াবি ব্যস্ততার মাঝখানে আল্লাহর দিকে ফিরে আসার এক শক্তিশালী ডাক।
জুমার দিনের প্রথম প্রস্তুতি শুরু হয় পবিত্রতা অর্জনের মাধ্যমে। মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘তোমাদের মধ্যে কেউ জুমার নামাজে আসলে সে যেন গোসল করে।’ (বুখারি, হাদিস: ৮৭৭) আরেক বর্ণনায় এসেছে, ‘যে ব্যক্তি জুমার দিন গোসল করে, মিসওয়াক ব্যবহার করে এবং সুগন্ধি প্রয়োগ করে, তারপর নামাজ আদায় করে এবং ইমামের খুতবা মনোযোগ দিয়ে শোনে, তার এ জুমা থেকে পরবর্তী জুমা পর্যন্ত গুনাহ মাফ করে দেওয়া হয়। (বুখারি, হাদিস: ৮৮৩)
হাদিসটিতে বর্ণিত এই পবিত্রতা কেবল শরীরের নয়; এটি অন্তরেরও জন্য আবশ্যক। নখ কাটা, অপ্রয়োজনীয় লোম পরিষ্কার করা, পরিপাটি পোশাক পরা; এসব সুন্নাতের পাশাপাশি বিগলিত হৃদয় নিয়ে মুমিন নিজেকে এমনভাবে প্রস্তুত করে, যেন সে আল্লাহর দরবারে হাজির হতে যাচ্ছে।
জুমার দিনে আগেভাগে মসজিদে যাওয়ার গুরুত্ব অপরিসীম। মহানবী বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি জুমার দিনে প্রথম সময়ে মসজিদে যায়, সে যেন একটি উট কুরবানি করল; যে দ্বিতীয় পর্যায়ে মসজিদে যায়, সে যেন একটি গরু কুরবানি করল, যে তৃতীয় পর্যায়ে মসজিদে যায় সে যেন একটি শিং বিশিষ্ট দুম্বা কুরবানী করল, যে চতুর্থ পর্যায়ে মসজিদে যায় সে যেন একটি মুরগী কুরবানী করল। যে পঞ্চম পর্যায়ে মসজিদে যায় সে যেন একটি ডিম কুরবানী করল।’ (মুসলিম, হাদিস: ৮৫০)
এখানে প্রতিটি ধাপে আগেভাগে যাওয়ার মর্যাদা এমনভাবে বর্ণনা করা হয়েছে, যা মুমিনের অন্তরে প্রতিযোগিতার এক নীরব তাগিদ সৃষ্টি করে। কিন্তু এই আগ্রহ যেন শিষ্টাচার ভঙ্গ না করে। কারও ঘাড় টপকে সামনে যাওয়া বা বিশৃংখল পরিবেশ সৃষ্টি করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ।
জুমার নামাজের খুতবা চলাকালীন নীরব থাকা অপরিহার্য। মহানবী (সা.) বলেছেন; ‘তুমি যদি জুমার দিন তোমার সঙ্গীকে বলো ‘চুপ থাকো’, তখন ইমাম খুতবা দিচ্ছেন। তাহলে তুমিও অনর্থক কাজ করলে।’ (বুখারি, হাদিস: ৯৩৪)
জুমার দিনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ আমল হলো সূরা কাহফ তিলাওয়াত। মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি জুমার দিনে সূরা কাহফ তিলাওয়াত করবে, তার জন্য এ জুমা থেকে পরবর্তী জুমা পর্যন্ত একটি নূর আলোকিত হবে।’ (সুনান আল-বাইহাকি, হাদিস: ৬০৬৬)
জুমার দিনে বেশি বেশি দরুদ শরিফ পাঠ
করারও বিশেষ তাগিদ রয়েছে। মহানবী (সা.) বলেছেন,
‘তোমরা জুমার দিনে আমার ওপর বেশি বেশি দরুদ পাঠ
করো,
কারণ তোমাদের দরুদ আমার কাছে পেশ করা হয়।’ (আবু দাউদ, হাদিস: ১০৪৭)
এ ছাড়া এই দিনে এমন একটি মুহূর্ত
রয়েছে,
যখন বান্দার দোয়া প্রত্যাখ্যাত হয় না। মহানবী (সা.) বলেছেন,
‘জুমার দিনে এমন একটি সময় আছে, যখন কোনো মুসলিম
বান্দা দাঁড়িয়ে নামাজ আদায়রত অবস্থায় আল্লাহর কাছে কিছু চাইলে তিনি তাকে তা প্রদান
করেন।’
(সহিহ বুখারি, হাদিস: ৯৩৫; সহিহ মুসলিম, হাদিস: ৮৫২)
অধিকাংশ আলেমের মতে, এই সময়টি আসরের পর থেকে মাগরিবের পূর্ব পর্যন্ত বিস্তৃত।
জুমার দিনে দান-সদকা করাও অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ।
জুমার দিন আমাদের জন্য একটি আত্মসমালোচনার দিন। এক সপ্তাহে আমরা কী হারিয়েছি, কী অর্জন করেছি; তার হিসাব নেওয়ার দিন।
জুমা আমাদের জীবনে প্রতি সপ্তাহে ফিরে আসে, কিন্তু আমরা কি প্রতিবার তাকে গ্রহণ করতে পারি সেই আগ্রহ, সেই প্রস্তুতি, সেই ভালোবাসা নিয়ে? কত জুমা পেরিয়ে গেছে, অথচ আমাদের অন্তর একই রয়ে গেছে; এ প্রশ্নটিই হয়তো সবচেয়ে জরুরি।
আজকের এই জুমা হয়তো আমাদের জীবনের শেষ জুমা নয়, কিন্তু তা নিশ্চিতও নয় যে আরও একটি জুমা আমরা পাব। কাজেই যখনই আজানের ধ্বনি বাতাসে ভেসে উঠবে; তখন যেন আমরা দুনিয়াবি সকল কাজ থেকে মুক্ত হয়ে বিগলিত হৃদয়ে আল্লাহর দিকে ফিরে যাই।
হয়তো এই একটি জুমাই হতে পারে আমাদের গুনাহ মাফের সূচনা, ভাঙা সম্পর্ক জোড়া লাগার শুরু, কিংবা আল্লাহর সঙ্গে হারানো সংযোগ ফিরে পাওয়ার মুহূর্ত।
আসুন, আমরা জুমাকে কেবল একটি রুটিন না বানিয়ে; একটি পরিবর্তনের দিন বানাই। হয়তো এই দিনটিই আমাদের জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারে।
লেখক: প্রাবন্ধিক ও অনুবাদক
saifpas352@gmail.com



