অযোগ্য হাতে দায়িত্ব সমাজের নীরব বিপর্যয়

ছবি: আগামীর সময়
রাষ্ট্র, সমাজ, প্রতিষ্ঠান কিংবা পরিবারের সফলতা নির্ভর করে দায়িত্বশীল মানুষের ওপর। যেখানে যোগ্য, সৎ ও আমানতদার ব্যক্তির হাতে দায়িত্ব অর্পণ করা হয়, সেখানে উন্নতি, ন্যায়বিচার ও স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠিত হয়। আর যেখানে কোনোভাবে প্রভাভিত হয়ে অযোগ্য মানুষের হাতে দায়িত্ব তুলে দেওয়া হয়, সেখানে শুধু একটি প্রতিষ্ঠান নয়, পুরো সমাজই ক্ষতিগ্রস্ত হয়। প্রায় চৌদ্দশ বছর আগে মহানবী (সা.) এই বাস্তবতাকেই কিয়ামতের অন্যতম আলামত হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
আবু হুরাইরাহ (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ্ (সা.) বলেছেন,
إِذَا ضُيِّعَتِ الأَمَانَةُ فَانْتَظِرِ السَّاعَةَ قَالَ كَيْفَ إِضَاعَتُهَا يَا رَسُولَ اللَّهِ قَالَ إِذَا أُسْنِدَ الأَمْرُ إِلَى غَيْرِ أَهْلِهِ، فَانْتَظِرِ السَّاعَةَ
‘যখন আমানত নষ্ট হয়ে যাবে তখন কিয়ামতের অপেক্ষা করবে। সে বলল, হে আল্লাহর রাসুল! আমানাত কিভাবে নষ্ট হয়ে যাবে? তিনি বললেন, যখন কোনো দায়িত্ব অযোগ্য ব্যক্তির ওপর ন্যস্ত করা হবে তখনই কিয়ামতের অপেক্ষা করবে।’ (বুখারি, হাদিস : ৬৪৯৬)
এই হাদিসে ‘আমানত’ বলতে কেবল মানুষের জমা রাখা অর্থ বা সম্পদ বোঝানো হয়নি। বরং আল্লাহ প্রদত্ত সব দায়িত্ব, মানুষের অধিকার, নেতৃত্ব, বিচার, প্রশাসন, শিক্ষা, ব্যবসা এবং সমাজ পরিচালনার সব ক্ষেত্রই এর অন্তর্ভুক্ত। কোনো দায়িত্ব এমন ব্যক্তির হাতে তুলে দেওয়া, যা সে পালনের যোগ্য নয়, সেটিই আমানতের খিয়ানত।
দায়িত্ব এমন ব্যক্তির হাতে দিতে হবে, যে তার প্রকৃত হকদার, অর্থাৎ যার মধ্যে প্রয়োজনীয় যোগ্যতা, সততা ও দায়িত্ববোধ রয়েছে। ইসলামে আত্মীয়তা, রাজনৈতিক পরিচয় বা ব্যক্তিগত স্বার্থের চেয়ে যোগ্যতা ও আমানতদারিতার মূল্য অনেক বেশি।
পবিত্র কোরআনে বর্ণিত হয়েছে, ‘েনারীদ্বয়ের একজন বলল, হে আমার পিতা! আপনি একে মজুর নিযুক্ত করুন, কারণ আপনার মজুর হিসেবে উত্তম হবে সে ব্যক্তি, যে শক্তিশালী, বিশ্বস্ত’ (সুরা কাসাস, আয়াত : ২৬)
এখানে মাদইয়ানে পৌঁছানোর পর মুসা (আ.)-এর সঙ্গে দুই নারীর সাক্ষাতের ঘটনা বর্ণিত হয়েছে। মুসা (আ.) তাদের পশুকে পানি পান করাতে সাহায্য করেন। তার এই আচরণ দেখে দুই বোনের একজন তার পিতা নবী শুআইব (আ.)-কে এ কথঅগুলো বলেছিলেন।
এই আয়াতে কর্মী বা দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি নির্বাচনের দুটি মৌলিক যোগ্যতার কথা বলা হয়েছে: (১) শক্তিশালী: অর্থাৎ যে দায়িত্ব পালনের জন্য প্রয়োজনীয় দক্ষতা, সামর্থ্য ও যোগ্যতা রাখে। (২) বিশ্বস্ত : অর্থাৎ যে সৎ, আমানতদার, দায়িত্বশীল এবং বিশ্বাসভঙ্গ করে না।
মুসা (আ.)-এর শারীরিক শক্তি প্রকাশ পেয়েছিল কূপের ভারী পাথর সরিয়ে একাই পানি তুলে দেওয়ার মাধ্যমে। আর তার বিশ্বস্ততা প্রকাশ পেয়েছিল দৃষ্টি সংযম, ভদ্র আচরণ এবং কোনো প্রকার অসৎ উদ্দেশ্য ছাড়াই সাহায্য করার মাধ্যমে।
এই আয়াত থেকে শিক্ষা পাওয়া যায় যে, কোনো কাজ, পদ বা দায়িত্বে লোক নিয়োগের ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত সম্পর্ক, সুপারিশ বা পক্ষপাত নয়, বরং যোগ্যতা ও সততাকে প্রধান মানদণ্ড করা উচিত। ব্যক্তি যদি দক্ষ হয় কিন্তু বিশ্বস্ত না হয়, অথবা বিশ্বস্ত হয় কিন্তু দায়িত্ব পালনের সক্ষমতা না থাকে, তাহলে দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করা কঠিন হয়ে পড়ে। তাই ইসলামের দৃষ্টিতে সফল নেতৃত্ব ও সুশাসনের অন্যতম ভিত্তি হলো যোগ্যতা (শক্তি) ও আমানতদারিতা (বিশ্বস্ততা)।
খলিফা উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) দায়িত্ব বণ্টনের ক্ষেত্রে অত্যন্ত সতর্ক ছিলেন। তিনি গভর্নর ও কর্মকর্তাদের নিয়োগের আগে তাদের চরিত্র, দক্ষতা ও জনকল্যাণে আন্তরিকতা যাচাই করতেন। কারণ তিনি জানতেন, একজন অযোগ্য কর্মকর্তার ভুল সিদ্ধান্ত হাজারো মানুষের জীবনকে দুর্ভোগে ফেলতে পারে।
আজকের সমাজে এই হাদিসের প্রাসঙ্গিকতা অত্যন্ত গভীর। অনেক সময় দেখা যায়, যোগ্য ব্যক্তিকে উপেক্ষা করে পরিচিতজন, আত্মীয়স্বজন কিংবা প্রভাবশালী কাউকে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেওয়া হয়। ফলে প্রশাসনে দুর্নীতি বাড়ে, প্রতিষ্ঠানে অদক্ষতা তৈরি হয়, বিচারব্যবস্থায় মানুষের আস্থা কমে যায়, শিক্ষার মান ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং জনসেবার পরিবর্তে ব্যক্তিস্বার্থ প্রাধান্য পায়। এসব সংকটের শিকড় খুঁজতে গেলে দেখা যায়, অনেক ক্ষেত্রেই দায়িত্ব সঠিক মানুষের হাতে ছিল না।
পরিবারও এই শিক্ষার বাইরে নয়। সন্তানের লালন-পালন, সম্পদের তত্ত্বাবধান কিংবা পারিবারিক সিদ্ধান্ত গ্রহণেও যোগ্যতার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। যে ব্যক্তি দায়িত্ব বুঝে না, তার হাতে দায়িত্ব তুলে দিলে ক্ষতির সম্ভাবনাই বেশি।
তবে এই হাদিস কেবল দায়িত্ব প্রদানকারীদের জন্য নয়, দায়িত্ব গ্রহণকারীদের জন্যও সতর্কবার্তা। যে ব্যক্তি নিজের অযোগ্যতা জেনেও লোভ, ক্ষমতার আকাঙ্ক্ষা বা ব্যক্তিগত লাভের জন্য দায়িত্ব গ্রহণ করে, সেও আমানতের খিয়ানত করে। মহানবী (সা.) নেতৃত্ব বা পদ লাভের জন্য আগ্রহ প্রকাশ করতে নিরুৎসাহিত করেছেন। কারণ নেতৃত্ব সম্মানের বিষয় হওয়ার আগে এটি একটি বড় দায়বদ্ধতা।
সমাজের প্রতিটি স্তরে যদি নিয়োগ, নির্বাচন ও দায়িত্ব বণ্টনে ইসলামের এই নীতি অনুসরণ করা হয়, তাহলে দুর্নীতি কমবে, জবাবদিহি বাড়বে এবং মানুষের অধিকার অধিকতর সুরক্ষিত হবে। রাষ্ট্র, শিক্ষা, চিকিৎসা, বিচার, ব্যবসা কিংবা ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে যোগ্য ও আমানতদার মানুষকে দায়িত্ব দেওয়াই টেকসই উন্নয়ন ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠার অন্যতম শর্ত।
রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর এই হাদিস মূলত কিয়ামতের সময় নির্ধারণের আলোচনা নয়; বরং সমাজকে আত্মসমালোচনার আহ্বান। আমরা যদি দায়িত্বকে ব্যক্তিগত লাভের উপায় না ভেবে আল্লাহর দেওয়া আমানত হিসেবে দেখি এবং যোগ্য ব্যক্তির হাতে সেই আমানত তুলে দিতে পারি, তবেই ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্রে কল্যাণ প্রতিষ্ঠা সহজ হবে। আর যদি অযোগ্যতার কাছে যোগ্যতা পরাজিত হতে থাকে, তাহলে সেটি কোনো এক সময় পুরো সমাজের নৈতিক অবক্ষয়ের কারণ হিসেবও দৃশ্যমান হতে পারে।
লেখক: আলেম ও সাংবাদিক
saifpas352@gmail.com




