একই পশুতে কোরবানি, আকিকা ও ওয়ালিমার শরয়ী বিধান

ছবি: এআই
ইসলামি শরিয়তে কোরবানি, আকিকা এবং ওয়ালিমা; প্রত্যেকটি ভিন্ন ভিন্ন ইবাদত। এগুলোর লক্ষ্য ও আদায়ের প্রেক্ষাপটও আলাদা।
ছাগল, ভেড়া বা দুম্বার মতো ছোট পশু একজনের পক্ষ থেকেই কোরবানি করতে হয়। সেখানে একাধিক শরিক হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। কিন্তু গরু, মহিষ ও উটের মতো বড় পশুর ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ সাতজনের পক্ষ থেকে কোরবানি করা যায়। তবে শর্ত হলো, শরিক হওয়া প্রত্যেক ব্যক্তির নিয়ত হতে হবে একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন।
জাবের (রা.) বলেছেন, ‘রাসুল (সা.) আমাদেরকে আদেশ করেছেন, আমরা যেন উট ও গরুর ক্ষেত্রে প্রতি সাতজন মিলে একটি করে পশুতে শরিক হই।’ (মুসলিম, হাদিস : ১৩১৮)
ফকিহদের সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত হলো, যেসব বড় পশুতে সাতজন শরিক হয়ে কোরবানি করা যায়, সেই পশুগুলো দিয়ে আকিকা করার ক্ষেত্রেও একইভাবে সাত অংশ পর্যন্ত শরিক করা বৈধ। (ফতোয়ায়ে হিন্দিয়া: ৫/৩৫১; সুনানু আবু দাউদ, হাদিস: ২৮০১; শরহুল মুহাজ্জাব: ৮/৪২৯)
যেহেতু কোরবানি, আকিকা ও ওয়ালিমা তিনটি পৃথক ইবাদত, তাই সামর্থ্য থাকলে প্রত্যেকটি নিজ নিজ সময়ে আলাদাভাবে সম্পন্ন করাই শরিয়তের মৌলিক পদ্ধতি এবং সবচেয়ে উত্তম পন্থা। তবে বর্তমানে অনেক মধ্যবিত্ত বা সাধারণ পরিবারের পক্ষে আলাদাভাবে বড় পশু দিয়ে অনুষ্ঠান করা সম্ভব হয় না। এই বাস্তবতায় প্রশ্ন জাগে, কোরবানির বড় পশুতে কোরবানির অংশের সঙ্গে আকিকা বা ওয়ালিমার জন্য এক বা একাধিক অংশ রাখা জায়েজ হবে কি না?
এ বিষয়ে নবিজী বা সাহাবায়ে কেরামের যুগ থেকে সরাসরি কোনো বিবরণ না পাওয়া গেলেও তাবেয়িদের যুগ থেকে হজরত হাসান বসরি ও আতা ইবনে আবি রাবাহ (রহ.)-এর মতামত পাওয়া যায়। তাছাড়া ইসলামের একটি মূলনীতি হলো, যে বিষয়ে কোরআন-হাদিসে সরাসরি কোনো বিবরণ পাওয়া যায় না, সে ক্ষেত্রে উম্মতের মুজতাহিদ ইমামগণের গবেষণা ও সিদ্ধান্তের ওপর আস্থা রেখে তা অনুসরণ করতে হয়। এজন্য আমাদের হানাফি মাজহাবের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হলো, একই বড় পশুতে কোরবানি, আকিকা ও ওয়ালিমার অংশ রাখা জায়েজ। (তাবয়িনুল হাকায়িক: ৬/৪৮৪)
কোরবানি ও আকিকা যেমন ইবাদত, তেমনি ওয়ালিমাও বিয়ের নিয়ামতের ওপর আল্লাহর শুকরিয়া ও সুন্নতের অনুসরণ। সবার উদ্দেশ্য যেহেতু পুণ্য ও নৈকট্য লাভ, তাই একই পশুতে এই তিন নিয়ত একত্র করা জায়েজ (তাবয়িনুল হাকায়িক: ৬/৪৮৪; রাদ্দুল মুহতার: ৯/৫৪০)।
হাসান বসরি (রহ.) বলেছেন, ‘যদি কেউ কোনো ছেলের পক্ষ থেকে কোরবানি করে এবং সেই পশুর অংশে তার আকিকার নিয়ত করে, তবে তা আকিকা হিসেবেও যথেষ্ট ও বৈধ হবে।’ ইমাম ইবনে সিরিন (রহ.) থেকেও অনুরূপ মত বর্ণিত হয়েছে। (মুসান্নাফে ইবনে আবি শাইবা, হাদিস: ২৪৭৫০, ২৪৭৫১)
যদি কোনো শরিক কোরবানির নিয়ত করে, কেউ তামাত্তু বা কিরান হজের দমের নিয়ত করে এবং কেউ তার সদ্যজাত সন্তানের আকিকার নিয়ত করে, তবে নির্ভরযোগ্য মত অনুযায়ী সবার পক্ষ থেকেই তা সহিহ ও জায়েজ হবে। ওয়ালিমার ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য; যেহেতু এটি বিয়ের নিয়ামতের ওপর আল্লাহর এক প্রকার শুকরিয়া এবং সুন্নতের আমল, তাই এর দ্বারাও আল্লাহর নৈকট্য লাভ হয়। (ফতোয়ায়ে তাতারখানিয়া: ১৭/পৃষ্ঠা ৪৫২; রাদ্দুল মুহতার: ৯/৫৪০)
মোটকথা, কোরবানি, আকিকা ও ওলিমা আলাদা আলাদাভাবে পৃথক পশুর মাধ্যমে সম্পন্ন করাটাই সবচেয়ে উত্তম এবং ইসলামের মৌলিক পদ্ধতি। তবে পারিবারিক কোনো প্রয়োজন, অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতা বা অন্য কোনো যুক্তিসংগত কারণে কেউ যদি কোরবানির পশুর সাত অংশের মধ্যে আকিকা কিংবা ওয়ালিমার নিয়তে অংশ বা নাম অন্তর্ভুক্ত করেন, তবে শরিয়তের দৃষ্টিতে তা সম্পূর্ণ জায়েজ। এর ফলে কোরবানি এবং আকিকা-ওয়ালিমা উভয় ইবাদতই একই সঙ্গে আদায় হয়ে যাবে।
লেখক: আলেম ও অনুবাদক






