হজের সফরে ভুলভ্রান্তি
যেসব ভুলে অপূর্ণ থেকে যায় আপনার বহু সাধনার হজ (৩য় পর্ব)

সংগৃহীত ছবি
[তৃতীয় পর্ব]
হজ এমন এক অনন্য ইবাদত, যার নিয়ত করার মুহূর্তেই বান্দা আল্লাহতাআলার কাছে সহজতা ও কবুলিয়তের জন্য দোয়া করে। এ থেকেই বোঝা যায়, অন্যান্য ইবাদতের তুলনায় হজের আমল কতটা পরিশ্রমসাধ্য ও জটিল। তাই হজ আদায়ের জন্য শুধু মাসয়ালা জানা যথেষ্ট নয়; বরং এর সঠিক পদ্ধতি, সময়োপযোগী কৌশল এবং অভিজ্ঞদের পরামর্শও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
বাস্তবে দেখা যায়, হজের অনেক ভুল হয় জ্ঞানের অভাবে নয়, বরং অবহেলা ও অসচেতনতার কারণে। অথচ সামান্য সতর্কতা ও প্রস্তুতি নিলে এসব ভুল সহজেই এড়িয়ে চলা সম্ভব। এজন্য নিচে হজ পালনের সময় সাধারণত যে ভুলগুলো হয়ে থাকে, সেগুলো আমরা একে একে ধারাবাহিকভাবে আমাগীর সময় পাতায় পাঠকদের সামনে তুলে ধরব ইনশাআল্লাহ। যাতে হাজিরা সচেতন থেকে সঠিকভাবে হজ আদায় করতে পারেন।
আজ আমরা তুলে ধরব-
তাওয়াফ অবস্থায় কাবা শরীফের দিকে সীনা করা
তাওয়াফকারী পুরো তাওয়াফ অবস্থা্য় বাইতুল্লাহকে বাম পাশে রেখে চলবে। শুধু রুকনে ইয়ামানী ছোঁয়ার সময় (যদি ছোঁয়া সম্ভব হয়) তখন বাইতুল্লাহর দিকে সীনা ফিরানো যাবে। কিন্তু সীনা বাইতুল্লাহর দিকে করলে ওই স্থান থেকেই আবার বাইতুল্লাহ বাম দিকে রেখে তাওয়াফ শুরু করতে হবে। তারপর হাজরে আসওয়াদের নিকট গিয়ে আবার সেদিকে ফিরবে। কিন্তু অনেক তাওয়াফকারীকেই এর ব্যতিক্রম করতে দেখা যায়। যেমন-
· অনেকেই হাজরে আসওয়াদ এবং রুকনে ইয়ামানী ছাড়াও অন্য দুই কোণে বা ফাঁকা পেলেই বাইতুল্লাহর দেয়ালে চুম্বন বা আলিঙ্গন করে থাকেন। ফলে তাদের সীনা বাইতুল্লাহর দিকে ফিরে যায়। অথচ তাওয়াফের সময় অল্প সময়ও যদি কাবা ঘরের দিকে সীনা ফিরিয়ে রাখা হয় তবে তা শুদ্ধ হবে না। আমাদের মনে রাখতে হবে যে, তাওয়াফ অবস্থায় হাজরে আসওয়াদ এবং রুকনে ইয়ামানী ব্যতীত অন্য স্থানে বাইতুল্লাহর দিকে সীনা ফিরানো নিষিদ্ধ।
· দলবদ্ধভাবে চলতে গিয়ে বা দলের অন্যদের খবর নিতে গিয়ে কিংবা ভিড়ের কারণে বাইতুল্লাহর দিকে সীনা ঘুরে যায় এবং ওইভাবেই কিছু দূর চলতে থাকে এতে ঐ অংশের তাওয়াফ সহীহ হয় না। তাই কখনো এমন ঘটে গেলে যেখান থেকে ঘুরে গেছে সেখান থেকে যথানিয়মে পুনরায় তাওয়াফ করতে শুরু হবে। (সহীহ মুসলিম ১/৪০০; মানাসিক, মোল্লা আলী কারী পৃ. ১৫৩; গুনইয়াতুন নাসিক, পৃ. ১১৩; ফাতাওয়া হিন্দিয়া ১/২২৫; আলমুগনী ৫/২২৫; আদ্দুররুল মুখতার ২/৪৯৪)
নফল তাওয়াফের পর দুই রাকাত নামায না পড়া বা বিলম্বে পড়া
অনেককে দেখা যায় যে, একের পর এক নফল তাওয়াফ করতেই থাকেন। একটি তওয়াফ শেষ হলে তাওয়াফের দুই রাকাত নামায পড়েন না। তাদের এ আমল দেখে মনে হয়, শুধু ফরয ও ওয়াজিব তাওয়াফের পরই এই দুই রাকাত নামায পড়তে হয়। এ ধারণা ভুল। ফরয ও ওয়াজিব তাওয়াফের মতো নফল তাওয়াফের পরও দুই রাকাত নামায পড়া ওয়াজিব এবং বিনা ওজরে একাধিক তাওয়াফের নামাযকে একত্রে পড়া মাকরূহ। (মুসান্নাফ ইবনে আবী শায়বা, হাদিস : ১৩৭০৩; ফাতাওয়া হিন্দিয়া ১/২২৭; রদ্দুল মুহতার ২/৪৯৯; মানাসিক মোল্লা আলী কারী, পৃ. ১৫৫; গুনইয়াতুন নাসিক, পৃ. ১১৭)
তাওয়াফ পরবর্তী দুই রাকাত পড়ার স্থান নিয়ে বিভ্রান্তি
ফরয ও ওয়াজিব তাওয়াফের পর দুই রাকাত নামায পড়া ওয়াজিব। এই দুই রাকাত নামায মাকামে ইবরাহীমীকে সামনে রেখে পড়া সুন্নত। কিন্তু অনেককে দেখা যায়, মাকামে ইবরাহীমকে পেছনে রেখে মাকামে ইবরাহীম ও বাইতুল্লাহর মাঝের ফাঁকা জায়গায় আদায় করেন। অথচ এই স্থানে নামায আদায় করলে তাওয়াফকারীদের চলাচলে সমস্যা সৃষ্টি হয়। এই দুই রাকাত নামায যে মাকামে ইবরাহীমের পেছনে পড়া সুন্নত সে সুন্নতটিও আদায় হয় না। (সুনানে নাসাঈ ২/৩১; মুসান্নাফ আবদুর রাযযাক, হাদিস : ৮৯৬০; মানাসিক, ১৫৬; গুনইয়াতুন নাসিক, পৃ. ১১৬; আলমুগনী, ৫/২৩১; রদ্দুল মুহতার ২/৪৯৯)
অনেকে মাকামে ইবরাহীম ও বাইতুল্লাহর মাঝের ফাঁকা জায়গায় নামায আদায় করাকে জরুরি মনে করে। আবার কেউ তো এই জায়গাকেই নামাযের একমাত্র জায়গা মনে করে। ফলে তারা জানবাজি রেখে সেখানে নামায আদায় করতে চেষ্ঠা করেন। কেউ কেউ দুই তিনজনের সহযোগিতা নিয়ে বেষ্টনী তৈরি করে হলেও নামাযে দাঁড়িয়ে যান। ফলে হাজার হাজার তাওয়াফকারী ভীষণ চাপের মুখে পড়ে। এগুলো হল মূর্খতা ও ইবাদতের নামে বাড়াবাড়ি। এতে ছওয়াব হওয়া তো দূরের কথা, উল্টো আরো গুনাহ হয়। তাওয়াফের পর দুই রাকাত নামায পড়া ওয়াজিব। কিন্তু মাকামে ইবরাহীমী সামনে রেখে পড়া সুন্নত। এ সুন্নত যেমন মাকামে ইবরাহীমীর নিকট পড়লে আদায় হয়, তেমনি মাকামে ইবরাহীমীকে সামনে রেখে দূরে দাঁড়িয়ে পড়লেও আদায় হয়। অবশ্য ওই বরাবর ভিড় থাকলে মসজিদে হারামের যে কোনো স্থানে পড়া যেতে পারে। এমনকি মসজিদে হারামের বাইরে হেরেমের এলাকায় পড়লেও কোনো অসুবিধা নেই। সুতরাং ওই স্থানে পড়ার সুন্নত আদায় করতে গিয়ে অন্যকে কষ্ট দিয়ে হারামে লিপ্ত হওয়া বোকামি। (ইবনে আবী শায়বা : হাদিস: ১৫২৬৭, ১৫২৬৮; সুনানে নাসাঈ ২/৩১; মানাসিক ১৫৬; হিন্দিয়া ১/২২৬; রদ্দুল মুহতার ২/৪৯৯)
উৎস : আল-কাউসার, নভেম্বর ২০০৯ সংখ্যায় প্রকাশিত মাওলানা মুহাম্মাদ ইয়াহইয়া রচিত হজবিষয়ক ভুলভ্রান্তি প্রবন্ধ।
(…. চলবে ইনশাআল্লাহ)



