হজের সফরে ভুলভ্রান্তি
যেসব ভুলে অপূর্ণ থেকে যায় বহু সাধনার হজ (শেষ পর্ব)

সংগৃহীত ছবি
হজ এমন এক অনন্য ইবাদত, যার নিয়ত করার মুহূর্তেই বান্দা আল্লাহতায়ালার কাছে সহজতা ও কবুলিয়তের জন্য দোয়া করে। এ থেকেই বোঝা যায়, অন্যান্য ইবাদতের তুলনায় হজের আমল কতটা পরিশ্রমসাধ্য ও জটিল। তাই হজ আদায়ের জন্য শুধু মাসয়ালা জানা যথেষ্ট নয়; বরং এর সঠিক পদ্ধতি, সময়োপযোগী কৌশল এবং অভিজ্ঞদের পরামর্শও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
বাস্তবে দেখা যায়, হজে অনেক ভুল হয় জ্ঞানের অভাবে নয়; বরং অবহেলা ও অসচেতনতার কারণে। অথচ সামান্য সতর্কতা ও প্রস্তুতি নিলে এসব ভুল সহজেই এড়িয়ে চলা সম্ভব। এজন্য নিচে হজ পালনের সময় সাধারণত যে ভুলগুলো হয়ে থাকে, সেগুলো আমরা একে একে ধারাবাহিকভাবে আগামীর সময়ের পাতায় পাঠকদের সামনে তুলে ধরব ইনশাআল্লাহ, যাতে হজযাত্রীরা সচেতন থেকে সঠিকভাবে হজ আদায় করতে পারেন।
আজ আমরা তুলে ধরব; মুজদালিফায় অবস্থানসংক্রান্ত ভুলভ্রান্তি
মাগরিব ও এশা পড়া নিয়ে ভ্রান্তি-
মাগরিব ও এশা মুজদালিফায় গিয়ে একত্রে পড়া জরুরি। কিন্তু কখনো ভিড়ের কারণে গাড়ি ফজরের আগে মুজদালিফায় পৌঁছাতে পারে না। তখন অনেকে মুজদালিফায় পড়ার আশায় এ দুই ওয়াক্ত নামাজ কাজা করে ফেলে। অথচ মাসয়ালা হলো, এশার সময়ের মধ্যে মুজদালিফায় পৌঁছার ব্যাপারে আশঙ্কা থাকলে পথেই মাগরিব-এশা পড়ে নেওয়া জরুরি। অন্যথায় এ দুই ওয়াক্ত কাজা করার গুনাহ হবে। (মানাসিক মোল্লা আলী কারি পৃ. ২১৬; গুনইয়াতুন নাসিক পৃ. ১৬৪; আদ্দুররুল মুখতার ২/৫১০)
মুজদালিফার বাইরে অবস্থান
কোনো কোনো হাজিকে মুজদালিফার বাইরে অবস্থান করতে দেখা যায়। অথচ মুজদালিফায় রাত যাপন করা সুন্নতে মুয়াক্কাদা এবং সুবহে সাদিকের পর কিছু সময় ‘উকুফ’ করা ওয়াজিব। তাই মুজদালিফার সীমানা ভালোভাবে দেখে তার ভেতরেই অবস্থান করা জরুরি। (মুসান্নাফ ইবনে আবি শায়বা হাদিস: ১৪০৭১; মানাসিক মোল্লা আলী কারি পৃ. ২২০; গুনইয়াতুন নাসিক পৃ. ১৬৬-১৬৭; আলমুগনী ইবনে কুদামা ৫/২৮২; রদ্দুল মুহতার ২/৫১১)
মুজদালিফায় পাথর সংগ্রহকে জরুরি মনে করা
প্রথম দিনের সাতটি কংকর মুজদালিফা থেকে নেওয়া মুস্তাহাব। কিন্তু অনেক হাজি মুজদালিফা থেকে তিন দিনের সব পাথর সংগ্রহ করা জরুরি মনে করে থাকে। ফলে মুজদালিফায় পৌঁছাতে দেরি হয়ে গেলে সুবহে সাদিকের পরও অনেককে পাথর কুড়াতে দেখা যায়। অথচ সুবহে সাদিকের পর থেকে চারদিক ফর্সা হওয়া পর্যন্ত দোয়া-দরুদ ও জিকির-আজকারে মশগুল থাকা সুন্নত। এটিই উকুফে মুজদালিফার প্রধান সময়। আর এ সময় পাথর কুড়াতে ব্যস্ত থাকা অত্যন্ত ভুল কাজ। পাথর নেওয়ার উত্তম সময় হলো মুজদালিফা থেকে মিনায় যাওয়ার পথে কিংবা মুজদালিফায় রাতে পৌঁছে গেলে তখনো কুড়িয়ে নেওয়া যেতে পারে। (মুসান্নাফ ইবনে আবি শায়বা, হাদিস : ১৩৬২২, ১৩৬২৪; মানাসিক ২২২; গুনইয়াতুন নাসিক পৃ. ১৬৮; আলমুগনী ইবনে কুদামা ৫/২৮৮; রদ্দুল মুহতার ২/৫১৫)
রমী বা পাথর নিক্ষেপ সংক্রান্ত ভুলভ্রান্তি
আমরা জানি জামারায় সাতটি পাথর নিক্ষেপ করতে হয়। কিন্তু অনেকেই না জেনে বা আবেগে সাতের অধিক পাথর নিক্ষেপ করে থাকে। এটি শরিয়ত পরিপন্থি কাজ। এ থেকে বেঁচে থাকা জরুরি। (ফাতাওয়া হিন্দিয়া ১/২৭৫; মানাসিক ২৫০; রদ্দুল মুহতার ২/৫১৩)
সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও অন্যকে দিয়ে পাথর মারানো
কেউ কেউ সামান্য ওজর দেখা দিলেই অন্যকে দিয়ে পাথর নিক্ষেপ করায়। বিশেষত নারীদের পক্ষ থেকে বদলি হিসেবে অন্যকে দিয়ে পাথর মারানোর প্রবণতা বেশি পরিলক্ষিত হয়। অথচ শারীরিকভাবে দুর্বল ব্যক্তি ও নারীরাও একটু সচেতনবা অবলম্বন করলেই রাতের বেলা অনায়াসে পাথর মারতে পারেন। অথচ মাসায়ালা হচ্ছে, জামরা পর্যন্ত হেঁটে বা গাড়িতে গিয়ে মারার ব্যবস্থা এবং সামর্থ্য থাকলে অন্যকে দিয়ে পাথর মারানো জায়েয নয়। এতে কঙ্কর মারার হক আদায় হবে না। এ ক্ষেত্রে আবার কঙ্কর মারা ওয়াজিব। না মারলে দম ওয়াজিব হবে। (ইবনে আবি শায়বা, হাদিস : ১৫৩৯৪; মানাসিক ২৪৭; গুনইয়াতুন নাসিক পৃ. ১৮৭)
পাথর ছাড়া অন্য বস্তু নিক্ষেপ করা
অনেকে মনে করে ওই স্তম্ভগুলোই শয়তান। তাই সেখানে জুতা-স্যান্ডেলও মারতে দেখা যায়। এটা মূর্খতা। জুতা-স্যান্ডেল মারা জায়েয নেই। স্তম্ভগুলো তো পাথর নিক্ষেপের জায়গা নির্ধারণের আলামত মাত্র। এখানে নির্দিষ্ট পদ্ধতিতে নির্দিষ্টসংখ্যক পাথরই নিক্ষেপ করা জরুরি। ব্যতিক্রম করার অবকাশ নেই। (মানাসিক মোল্লা আলী কারি পৃ. ২৪৮; গুনইয়াতুন নাসিক পৃ. ১৮৮; আলমুগনী ইবনে কুদামা ৫/২৮৯; আদ্দুররুল মুখতার ২/৫১৪)
মাথা আংশিক হলক করা
কেউ কেউ মাথার অর্ধেক হলক করে বাকি অর্ধেকে চুল রেখে দেয়। এ ক্ষেত্রে তারা ধারণা করে যে, ‘যেহেতু পরে আরেকটি উমরা করব তাই অর্ধেক হলক করেছি। দ্বিতীয় উমরা করে বাকিটা হলক করব।’ এটাও ভুল। হজের সময় তো নয়ই অন্য সময়ও এভাবে অর্ধেক হলক করা নিষেধ। তাই পরে আরও উমরা করলেও প্রথমবারেই পূর্ণ মাথা হলক করে নেবে। পরে উমরা করলে ওই হলকের ওপর খুর বা ব্লেড ঘুরিয়ে নিলেই চলবে। এ ছাড়া মাথার চুল যদি আঙুলের করের চেয়ে বড় থাকে, তাহলে প্রথমবার চুল একেবারে ছোট ছোট করে কেটে নিতে পারে। আর পরে উমরা করে হলক করে নেবে। (মুসান্নাফ ইবনে আবি শায়বা, হাদিস ১৩৭৯৯, ১৪৭৮২; মানাসিক মোল্লা আলী কারি পৃ. ২২৯; গুনইয়াতুন নাসিক পৃ. ১৭৪; রদ্দুল মুহতার ২/৫১৬)
পারিশ্রমিকের বিনিময়ে উমরা করা বা করানো
অনেকে পারিশ্রমিকের বিনিময়ে অন্যের জন্য উমরা করে থাকে। এটা সম্পূর্ণ নাজায়েয। যে এমন করবে তার উমরা আদায় হবে না এবং যার পক্ষ থেকে করা হবে সেও কোনো সওয়াব পাবে না। (আলমুগনী ইবনে কুদামা ৫/২৩; রদ্দুল মুহতার ২/৬০১)
ইহতিয়াতি দম
হাজিদের মধ্যে এর ব্যাপক প্রচলন রয়েছে, হয়তো অজান্তেই কত ভুল হয়েছে, যে কারণে দমও ওয়াজিব হয়েছে। তাই সতর্কতামূলক অনেকেই দম দিয়ে থাকে। এটিও ভুল। শরিয়তে শুধু সন্দেহের ভিত্তিতে দম দেওয়ার কোনো বিধান নেই। এটি শরিয়তের হুকুমের মধ্যে নিজ থেকে সংযোজনের শামিল। তাই তা অবশ্যই পরিত্যাজ্য।
ভুল আমলের শেষ নেই। মাসয়ালা না জানা বা অসচেতনতার কারণে কত শত ভুলই হয়ে যেতে পারে। তাই শুদ্ধ আমলের জন্য সঠিকভাবে মাসয়ালা জানা জরুরি। এখানে কেবল ওই সব ভুলই আলোচনা করা হলো, যা ব্যাপকভাবে ঘটে থাকে। আল্লাহতাআলা সব হাজিকে সঠিকভাবে হজ আদায়ের তাওফিক দিন। আমিন।
উৎস : আল-কাউসার, নভেম্বর ২০০৯ সংখ্যায় প্রকাশিত মাওলানা মুহাম্মাদ ইয়াহইয়া রচিত হজবিষয়ক ভুলভ্রান্তি প্রবন্ধ

