পবিত্র হজ ২০২৬
মক্কা নগরীর মর্যাদা ও সেখানে অবস্থানের আদব
- মক্কা শুধু দেহের নয়, আত্মারও গন্তব্য

গ্রাফিক্স: আগামীর সময়
পৃথিবীর মানচিত্রে এমন কিছু স্থান রয়েছে, যেগুলো শুধু ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে নয়; বরং আসমানি রহমত, ইতিহাস ও আধ্যাত্মিকতার গভীরতায় অনন্য হয়ে উঠেছে। সেই পবিত্র স্থানগুলোর শীর্ষে রয়েছে মক্কা নগরী। যেখানে মানুষের হৃদয় বারবার ফিরে যেতে চায়, আর আত্মা খুঁজে পায় তার প্রকৃত আশ্রয়।
মুসলিম মাত্রই মক্কা শব্দটির সঙ্গে পরিচিত। মক্কা শব্দটি উচ্চারিত হতেই একজন মুসলিম হৃদয়ে এক গভীর ভালোবাসা অনুভব করেন। দুচোখ জুড়ে মক্কাকে দেখার এবং এখানে অবস্থিত আল্লাহর ঘর কাবা জিয়ারতের তীব্র বাসনা লালন করেন। আর যারা হজ বা ওমরাহ করতে চান, তাদের অবশ্যই এ পবিত্র ভূমিতে যেতে হয়। তাই সব মুসলিমের এ সম্মানিত শহর সম্পর্কে জানা আবশ্যক। নিম্নে পবিত্র কোরআন ও সুন্নাহর আলোকে এ মহান নগরীর কিছু বৈশিষ্ট্য তুলে ধরা হলো।
পবিত্র
কোরআনের ঘোষণায় মক্কার মর্যাদা
আল্লাহতায়ালা পবিত্র কোরআনে বলেছেন, ‘নিশ্চয়ই মানুষের জন্য প্রথম যে ঘরটি স্থাপিত হয়েছে, তা হচ্ছে মক্কায়; বরকতময় এবং সারা বিশ্বের জন্য হিদায়াত ‘ (সুরা আলে ইমরান, আয়াত: ৯৬)
এই আয়াত আমাদের জানিয়ে দেয়, মক্কা শুধু একটি শহর নয়; এটি মানবজাতির জন্য প্রথম ইবাদতের কেন্দ্র। এখানে অবস্থিত কাবা শরিফ, যার দিকে মুখ করে বিশ্বের কোটি কোটি মুসলমান প্রতিদিন নামাজ আদায় করেন।
মক্কা নগরীতে মহান আল্লাহর অনেক নিদর্শন রয়েছে। পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে- ‘তাতে (মক্কা নগরীতে) রয়েছে অনেক সুস্পষ্ট নিদর্শন, যেমন- মাকামে ইবরাহিম।’ (সুরা আলেইমরান, আয়াত : ৯৭) মুসলিম স্কলাররা মাকামে ইবরাহিমকে প্রকাশ্য নিদর্শনগুলোর অন্যতম একটি বলে নির্ণয় করেছেন। (তাফসিরে তাবারি : ৪/৮)
মক্কা নগরীকে মহান আল্লাহতায়ালা হারাম (সম্মানিত) ঘোষণা করেছেন। আসমান ও জমিন সৃষ্টির দিন থেকেই মক্কা ভূমিকে সম্মানিত করা হয়েছে। পবিত্র কোরআনুল কারিমে ইরশাদ হয়েছে, ‘আমিতো আদিষ্ট হয়েছি এ নগরীর মালিকের ইবাদাত করতে, যিনি একে সম্মানিত করেছেন।’ (সুরা আন-নামল, আয়াত : ৯১)
মক্কা নগরীকে মহান আল্লাহতায়ালা নিরাপদ শহর হিসেবে ঘোষণা করেছেন। পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, ‘কসম তিন ও জাইতুনের। কসম সিনাই পর্বতের। এবং কসম এ নিরাপদ শহরের।’ (সুরা তিন, আয়াত : ১-৩) এখানে ‘এই নিরাপদ শহর’ বলে মক্কা নগরীকে বোঝানো হয়েছে। অন্য এক আয়াতে আল্লাহতায়ালা বলেছেন, ‘আমি কসম করছি এ শহরের। আর আপনি এ শহরের অধিবাসী।’ (সুরা আল-বালাদ, আয়াত : ১-২) এখানেও শহর বলে মক্কা নগরীকে আর আপনি বলে রাসুলকে (সা.) বোঝানো হয়েছে।
মক্কা নগরীর অধিবাসীদের জন্য ইবরাহিম (আ.) দোয়া করেছেন। যার ফলে মক্কা বিশ্বের সবচেয়ে নিরাপদ ও শান্তির স্থান। মহান আল্লাহতায়ালা পবিত্র কোরআনে ইরশাদ করেছেন: ‘আর (স্মরণ করুন) যখন ইবরাহিম (আ.) বলেছিলেন, হে আমার রব, এ শহরকে নিরাপদ করুন এবং আমাকে ও আমার পুত্রগণকে মূর্তি পূজা হতে দূরে রাখুন।’ (সুরা ইবরাহিম, আয়াত : ৩৫)
হাদিসের বর্ণনায় মক্কার মর্যাদা
মক্কা বিজয়ের দিন রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছিলেন, ‘এ শহরটিকে আল্লাহ জমিন ও আসমান সৃষ্টির দিন থেকেই সম্মানিত করেছেন। আল্লাহ কর্তৃক সম্মানিত এ শহরটি কিয়ামত পর্যন্ত সম্মানিত থাকবে। (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ১৩৫৩)
আরেক হাদিসে তিনি বলেছেন: ‘আল্লাহতায়ালা মক্কাকে হারাম (মহাসম্মানিত) করেছেন। কোনো মানুষ তাকে মহাসম্মানিত করেনি।’ (বুখারি, হাদিস : ১৮৩২)
এ দুটি হাদিস থেকে বোঝা যায়, মক্কার পবিত্রতা মানুষের তৈরি নয়; এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্ধারিত।
মক্কা ছিল মহানবী (সা.)-এর প্রিয় শহর। আবদুল্লাহ ইবন আব্বাস (সা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেছেন, হিজরতের সময় রাসুলুল্লাহ (সা.) মক্কা শরিফের উদ্দেশে বলেছিলেন, ‘কতই না পবিত্র শহর তুমি, আমার কাছে কতই না প্রিয় তুমি! যদি তোমার কওম আমাকে তোমার থেকে বের করে না দিত, তাহলে তুমি ছাড়া অন্য কোনো শহরে আমি বসবাস করতাম না।’ (আল-মু‘জামুল কাবির : ১০৪৭৭)
কিয়ামতের পূর্বলগ্নে পৃথিবীর প্রান্তে প্রান্তে দাজ্জাল সদম্ভ বিচরণ করবে। শুধু মক্কা ও মদিনায় সে প্রবেশ করতে পারবে না। আনাস ইবন মালেক (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘এমন কোনো ভূখণ্ড নেই, যা দাজ্জালের পদভারে মথিত হবে না। তবে মক্কা ও মদিনায় সে প্রবেশ করতে পারবে না। সেখানকার প্রতিটি গলিতে ফেরেশতারা সারিবদ্ধভাবে পাহারায় নিয়োজিত থাকবে। এরপর মদিনা তার অধিবাসীসহ তিনটি ঝাঁকুনি দেবে। যার ফলে আল্লাহ (মদিনা থেকে) সব কাফির ও মুনাফিককে বের করে দেবেন।’ (বুখারি, হাদিস : ১৮৮১)
কিয়ামতের আগে যখন মানুষ ইমান থেকে দূরে চলে যাবে। দুনিয়া থেকে ইমান ও ইমানদার উধাও হয়ে যাবে। তখন ইমান আর ইমানদারদের পাওয়া যাবে মক্কা ও মদিনায়। আবদুল্লাহ ইবনে উমর (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘ইসলামের সূচনা হয়েছিল অপরিচিত হিসেবে এবং সূচনাকালের মতোই আবার তা অপরিচিত অবস্থার দিকে ফিরে যাবে। আর তা পুনরায় দু’টি মসজিদে ফিরে আসবে, যেমন সাপ নিজ গর্তে ফিরে আসে।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ১৪৩) হাদিস বিশারদদের ভাষ্য, এখানে ‘দু’টি মসজিদ দ্বারা মক্কা ও মদিনার মসজিদকে বোঝানো হয়েছে।
মক্কায় অবস্থিত মসজিদে হারামে নামাজ আদায়ের ব্যাপারে হাদিসে বর্ণিত হয়েছে- জাবের (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘আমার মসজিদে একবার সালাত আদায় মসজিদে হারাম ছাড়া অন্যান্য মসজিদে হাজারবার সালাত আদায়ের চেয়ে বেশি উত্তম। তবে মসজিদুল হারামে একবার সালাত আদায় অন্যান্য মসজিদের তুলনায় এক লাখ গুণ বেশি।’ (ইবনে মাজাহ : ১৪০৬)
ইসলামি স্কলারদের দৃষ্টিতে মক্কা নগরী
বিখ্যাত আলেম ইমাম ইবনে তাইমিয়া বলেছেন, ‘মক্কা এমন এক ভূমি, যেখানে প্রতিটি ইবাদতের সওয়াব বহুগুণে বৃদ্ধি পায়।’
আর ইমাম গাজ্জালি তার লেখায় উল্লেখ করেছেন, ‘মক্কায় অবস্থান মানে শুধু দেহের উপস্থিতি নয়; এটি হৃদয়ের সম্পূর্ণ আত্মসমর্পণ।’
মক্কা নগরীর ভৌগোলিক ও বৈজ্ঞানিক তাৎপর্য
মক্কা সৌদি আরবের পশ্চিমাংশে পাহাড়বেষ্টিত একটি উপত্যকায় অবস্থিত। আশ্চর্যের বিষয়, পৃথিবীর অনেক গবেষক মনে করেন যে কাবা পৃথিবীর কেন্দ্রবিন্দুর সঙ্গে একটি প্রতীকী সংযোগ বহন করে; যেখানে মানবজাতির আধ্যাত্মিক কেন্দ্র স্থাপিত।
এ ছাড়া জমজম কূপের পানি নিয়ে বৈজ্ঞানিক গবেষণায় দেখা গেছে, এতে বিশেষ খনিজ উপাদান রয়েছে এবং এটি দীর্ঘদিন সংরক্ষণ করলেও নষ্ট হয় না। মুসলিমদের বিশ্বাস, এটি আল্লাহর এক অলৌকিক নিদর্শন।
মক্কা নগরীতে অবস্থানের আদব
মক্কায় অবস্থান করা শুধু সৌভাগ্য নয়; এটি একধরনের দায়িত্বও। এখানে কিছু গুরুত্বপূর্ণ আদব :
১. হৃদয়ে খুশু ও বিনয় রাখা: মক্কায় প্রবেশ মানে নিজের অহংকারকে ভেঙে ফেলা, আল্লাহর সামনে সম্পূর্ণ নত হওয়া।
২. ইবাদতে অধিক মনোযোগ : এখানে এক রাকাত সালাতের সওয়াব অন্য জায়গার তুলনায় বহুগুণ বেশি। তাই সময় নষ্ট না করে ইবাদতে ব্যস্ত থাকা উচিত।
৩. অন্যের প্রতি সম্মান ও সহনশীলতা : হজ বা ওমরাহর সময় ভিড় ও কষ্ট থাকলেও ধৈর্য ধারণ করা গুরুত্বপূর্ণ।
৪. গুনাহ থেকে কঠোরভাবে বিরত থাকা : এই পবিত্র ভূমিতে গুনাহ করা আরও গুরুতর। কারণ এটি আল্লাহর সম্মানিত স্থান।
মক্কা নগরীতে অবস্থানের আধ্যাত্মিক অনুভূতি
মক্কায় দাঁড়িয়ে যখন একজন মানুষ কাবার দিকে তাকায়, তখন তার মনে হয়; সে যেন দুনিয়ার সব কোলাহল থেকে মুক্ত হয়ে আল্লাহর দরবারে এসে উপস্থিত হয়েছে। এখানে চোখের পানিও ইবাদত, আর নিঃশ্বাসও যেন হয়ে ওঠে দোয়া।
মক্কা এমন এক নগরী, যেখানে ইতিহাস, ইবাদত, বিজ্ঞান ও আত্মিকতা একত্র হয়েছে। এটি শুধু একটি গন্তব্য নয়; এটি একজন মুমিনের হৃদয়ের কেন্দ্র। এখানে অবস্থান করার আদব মানে শুধু নিয়ম পালন নয়; বরং নিজের আত্মাকে পরিশুদ্ধ করা, আল্লাহর নৈকট্য অর্জন করা।
মক্কার মাটি, বাতাস, আর প্রতিটি মুহূর্ত সাক্ষী দেয় যে, মানুষ যখন তার রবের দিকে ফিরে আসে, তখনই সে তার প্রকৃত মর্যাদা খুঁজে পায়।
লেখক : প্রাবন্ধিক, অনুবাদক ও মুহাদ্দিস
saifpas352@gmail.com



