বায়তুল হিকমা: যে জ্ঞানকেন্দ্র বদলে দিয়েছিল বিশ্বকে

মানবসভ্যতার ইতিহাসে এমন কিছু প্রতিষ্ঠান রয়েছে, যেগুলো বদলে দিয়েছিল মানুষের চিন্তা, জ্ঞানচর্চা ও বিশ্বকে জানার পদ্ধতি। বাগদাদের বায়তুল হিকমা তেমনই এক ঐতিহাসিক প্রতিষ্ঠান, যার সঙ্গে জড়িয়ে আছে মুসলিম সভ্যতার উত্থান, অনুবাদ আন্দোলন এবং জ্ঞান-বিজ্ঞান বিকাশের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। আব্বাসীয় খিলাফতের রাজধানী বাগদাদ একসময় বিশ্বের অন্যতম প্রধান জ্ঞানকেন্দ্রে পরিণত হয়েছিল। গ্রিক, ফারসি ও ভারতীয় জ্ঞানভান্ডারের সঙ্গে আরবি ভাষাভাষী পণ্ডিতদের পরিচয়, প্রাচীন তত্ত্বের বিশ্লেষণ এবং নতুন গবেষণার মধ্য দিয়ে সেখানে গড়ে উঠেছিল বহুমাত্রিক বুদ্ধিবৃত্তিক পরিবেশ।
ইসলামের জ্ঞানচর্চার প্রেরণা এর ধর্মীয় শিক্ষার মধ্যেই নিহিত। পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, ‘বলুন, যারা জানে আর যারা জানে না, তারা কি সমান?’ (সুরা যুমার, আয়াত : ৯)।
অন্য এক আয়াতে মহান আল্লাহ তাআলা জ্ঞানীদের মর্যাদা বৃদ্ধির কথা বলেছেন- ‘তোমাদের মধ্যে যারা ঈমান এনেছে এবং যাদেরকে জ্ঞান দান করা হয়েছে আল্লাহ তাদেরকে মর্যাদায় সমুন্নত করবেন’ (সুরা মুজাদালা, আয়াত : ১১)।
এসব আয়াত মুসলিম সমাজে জ্ঞানার্জনের গুরুত্ব তুলে ধরে। তবে বাগদাদের জ্ঞানবিপ্লবকে শুধু ধর্মীয় অনুপ্রেরণার ফল হিসেবে দেখলে এর পূর্ণাঙ্গ ইতিহাস বোঝা যাবে না। রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা, অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি, নগরায়ণ, বাণিজ্য, কাগজের সহজলভ্যতা এবং বিভিন্ন সভ্যতার সঙ্গে যোগাযোগও এ বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল।
৭৬২ খ্রিষ্টাব্দে আব্বাসীয় খলিফা আল-মানসুর বাগদাদ নগর প্রতিষ্ঠা করেন। পরবর্তী সময়ে নগরটি প্রশাসন, বাণিজ্য, সাহিত্য ও জ্ঞানচর্চার প্রাণকেন্দ্রে পরিণত হয়। বিশেষত খলিফা হারুনুর রশিদের (শাসনকাল ৭৮৬-৮০৯) সময় থেকে শুরু করে তার উত্তরসূরি আল-মামুনের (শাসনকাল ৮১৩-৮৩৩) আমলে জ্ঞানচর্চায় রাজকীয় পৃষ্ঠপোষকতা বিশেষ গুরুত্ব লাভ করে।
বায়তুল হিকমার সূচনা, সাংগঠনিক কাঠামো ও কার্যক্রম নিয়ে ইতিহাসবিদদের মধ্যে আলোচনা রয়েছে। ইতিহাসবিদ দিমিত্রি গুতাস তার গ্রিক থট, আরবি কালচার: দ্য গ্রিকো-অ্যারাবিক ট্রান্সলেশন মুভমেন্ট ইন বাগদাদ অ্যান্ড আর্লি আব্বাসিদ সোসাইটি (প্রকাশকাল ১৯৯৮) গ্রন্থে আব্বাসীয় যুগের অনুবাদ আন্দোলনকে একটি বিস্তৃত সামাজিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক প্রক্রিয়া হিসেবে বিশ্লেষণ করেছেন। তাই বায়তুল হিকমাকে আধুনিক বিশ্ববিদ্যালয় বা পূর্ণাঙ্গ গবেষণাগারের সরাসরি পূর্বসূরি হিসেবে উপস্থাপন না করে, আব্বাসীয় দরবারের জ্ঞানচর্চা ও পাণ্ডুলিপি সংগ্রহের বৃহত্তর পরিমণ্ডলের অংশ হিসেবে বিবেচনা করাই ইতিহাসসম্মত।
এই জ্ঞানচর্চার অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল অনুবাদ আন্দোলন। গ্রিক ভাষায় রচিত দর্শন, চিকিৎসা, গণিত ও জ্যোতির্বিজ্ঞানের বহু গ্রন্থ সিরীয় ভাষা হয়ে কিংবা সরাসরি আরবিতে অনূদিত হয়। ফারসি ও ভারতীয় জ্ঞানধারার বিভিন্ন রচনাও আরবি ভাষার জগতে প্রবেশ করে। মুসলিম অনুবাদক ও স্কলাররা কেবল অন্য ভাষার বই আরবিতে রূপান্তর করেননি; তারা অনেক ক্ষেত্রে পাঠ যাচাই, পরিভাষা নির্মাণ, ব্যাখ্যা ও তুলনামূলক বিশ্লেষণের কাজও করেছেন। ফলে আরবি ভাষা আন্তর্জাতিক জ্ঞানচর্চার একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হয়ে ওঠে। এই আন্দোলনের পেছনে কাজ করেছিল শাসকদের পৃষ্ঠপোষকতা, পণ্ডিতদের পারস্পরিক সহযোগিতা এবং বিভিন্ন সভ্যতার জ্ঞানকে গ্রহণ ও পর্যালোচনা করার মানসিকতা। গুতাসের গবেষণায়ও এই অনুবাদ আন্দোলনের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপট বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে।
এই আন্দোলনের সঙ্গে জড়িত ছিলেন হুনাইন ইবনে ইসহাক (প্রায় ৮০৯-৮৭৩), যিনি গ্রিক চিকিৎসা ও দর্শনের বহু গ্রন্থ অনুবাদ ও পর্যালোচনার জন্য প্রসিদ্ধ। চিকিৎসাবিদ গ্যালেনের রচনাসহ বিভিন্ন গ্রন্থের আরবি অনুবাদে তার গুরুত্বপূর্ণ অবদান ছিল। তার কাজের তাৎপর্য কেবল অনুবাদের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না; পাণ্ডুলিপির বিভিন্ন পাঠ তুলনা, অনুবাদের নির্ভুলতা যাচাই এবং যথাযথ পরিভাষা ব্যবহারের ক্ষেত্রেও তিনি বিশেষ দক্ষতার স্বাক্ষর রেখেছিলেন। এ ধরনের কাজের মধ্য দিয়ে জ্ঞান সংরক্ষণের পাশাপাশি তার মানোন্নয়নের একটি ধারাও তৈরি হয়েছিল। তবে হুনাইনসহ আব্বাসীয় যুগের সব অনুবাদককে বায়তুল হিকমার সরাসরি কর্মী হিসেবে চিহ্নিত করার মতো পর্যাপ্ত প্রমাণ নেই। তাদের অবদানকে বৃহত্তর অনুবাদ আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে দেখাই অধিকতর যুক্তিযুক্ত।
বাগদাদ ও বৃহত্তর আব্বাসীয় জ্ঞানপরিমণ্ডলে গণিতের বিকাশও ছিল উল্লেখযোগ্য। মুহাম্মদ ইবনে মুসা আল-খাওয়ারিজমি (প্রায় ৭৮০-৮৫০) বীজগণিতের ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন। তার ‘আল-কিতাব আল-মুখতাসার ফি হিসাব আল-জাবর ওয়াল-মুকাবালা’ গ্রন্থের ‘আল-জাবর’ শব্দ থেকেই পরবর্তী সময়ে ‘অ্যালজেবরা’ শব্দটির উৎপত্তি। তার গাণিতিক রচনার লাতিন অনুবাদ মধ্যযুগীয় ইউরোপে ভারতীয় সংখ্যা-পদ্ধতি ও গণনাপদ্ধতির প্রসারে ভূমিকা রাখে। আল-খাওয়ারিজমির কাজের গুরুত্ব হলো, তিনি পূর্ববর্তী গাণিতিক জ্ঞানকে ব্যবহারিক সমস্যা সমাধানের উপযোগী পদ্ধতিতে বিন্যস্ত ও বিকশিত করেছিলেন। জ্যোতির্বিজ্ঞানেও পর্যবেক্ষণ, গণনা ও সারণি তৈরির কাজ মুসলিম জ্ঞানচর্চাকে সমৃদ্ধ করে।
চিকিৎসাবিজ্ঞান, জ্যোতির্বিজ্ঞান ও দর্শনেও এই জ্ঞানচর্চার দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব পড়ে। পূর্ববর্তী সভ্যতার রচনা অনুবাদের মধ্য দিয়ে মুসলিম পণ্ডিতেরা প্রাচীন তত্ত্বের সঙ্গে পরিচিত হন, সেগুলো বিশ্লেষণ করেন এবং প্রয়োজন অনুযায়ী সংশোধন বা সম্প্রসারণ করেন। ইতিহাসবিদ জর্জ সালিবা তার ‘ইসলামিক সায়েন্স অ্যান্ড দ্য মেকিং অব দ্য ইউরোপিয়ান রেনেসাঁস’ (প্রকাশ কাল ২০০৭) গ্রন্থে মধ্যযুগীয় ইসলামি জ্যোতির্বিজ্ঞানের বিকাশ এবং ইউরোপীয় জ্ঞানচর্চার সঙ্গে তার সম্পর্ক বিশ্লেষণ করেছেন। তার গবেষণা দেখায়, মুসলিম বিজ্ঞানচর্চাকে শুধু প্রাচীন গ্রিক জ্ঞানের সংরক্ষণ হিসেবে দেখলে এর নিজস্ব উদ্ভাবনী অবদান আড়ালে পড়ে যায়। মুসলিম জ্যোতির্বিদেরা পর্যবেক্ষণ, গাণিতিক হিসাব ও তাত্ত্বিক পর্যালোচনার মাধ্যমে পূর্ববর্তী জ্ঞানের বিভিন্ন সীমাবদ্ধতা চিহ্নিত করেন এবং নতুন ধারণা বিকাশে ভূমিকা রাখেন।
জ্ঞান সংরক্ষণ ও বিস্তারে কাগজের ব্যবহারও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল। কাগজ উৎপাদন ও ব্যবহার মুসলিম বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে বিস্তৃত হওয়ার ফলে পাণ্ডুলিপি তৈরি, বই অনুলিপি এবং জ্ঞান বিনিময়ের সুযোগ বৃদ্ধি পায়। ইতিহাসবিদ জোনাথন এম. ব্লুম তার ‘পেপার বিফোর প্রিন্ট: দ্য হিস্ট্রি অ্যান্ড ইমপ্যাক্ট অব পেপার ইন দ্য ইসলামিক ওয়ার্ল্ড’ (প্রকাশকাল ২০০১) গ্রন্থে মুসলিম বিশ্বে কাগজের ইতিহাস এবং এর সাংস্কৃতিক প্রভাব বিশ্লেষণ করেছেন। হাতে লেখা বইয়ের যুগে কাগজের সহজলভ্যতা জ্ঞানচর্চার প্রসারে সহায়ক হয়েছিল। এর ফলে শুধু রাজদরবারের সংগ্রহ নয়, শিক্ষার্থী, পণ্ডিত, অনুলিপিকার ও বই ব্যবসায়ীদের মধ্যেও পাণ্ডুলিপির আদান-প্রদান বিস্তৃত হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়।
এই ঐতিহাসিক প্রক্রিয়ার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, জ্ঞান কোনো একটি সভ্যতার একক সম্পত্তি নয়। মুসলিম পণ্ডিতেরা গ্রিক, ভারতীয়, ফারসি ও সিরীয় জ্ঞানধারার বিভিন্ন উপাদান গ্রহণ করেছেন; পরবর্তী সময়ে আরবি ভাষায় সংরক্ষিত ও বিকশিত বহু জ্ঞান লাতিন অনুবাদের মাধ্যমে ইউরোপে প্রবেশ করেছে। তবে এই বিনিময়কে সরল একমুখী যাত্রা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বিভিন্ন সভ্যতার মধ্যে গ্রহণ, সমালোচনা, পুনর্ব্যাখ্যা ও নতুন উদ্ভাবনের ধারাবাহিক সম্পর্ক ছিল। বাগদাদের অনুবাদ আন্দোলন সেই আন্তঃসভ্যতাগত জ্ঞানবিনিময়ের এক উল্লেখযোগ্য দৃষ্টান্ত।
বর্তমান মুসলিম সমাজের জন্য অতীতের এই অধ্যায় শুধু গৌরব স্মরণের বিষয় নয়; বরং গবেষণায় বিনিয়োগ, গ্রন্থাগার সমৃদ্ধ করা, পাণ্ডুলিপি সংরক্ষণ, বিজ্ঞানমনস্ক শিক্ষা এবং মুক্ত বুদ্ধিবৃত্তিক পরিবেশ গড়ে তোলার অনুপ্রেরণা।
তাই বাগদাদের বায়তুল হিকমাকে একটি ঐতিহ্যবাহী ইতিহাস হিসেবে না দেখে একে দেখতে হবে; একটি এমন এক প্রতীক হিসেবে, যাতে জ্ঞানকে ভাষা, জাতি ও ভৌগোলিক সীমানার মধ্যে আটকে রাখা হয়নি। বায়তুল হিকমা প্রমাণ করেছিল যে, অতীতের অর্জনকে যথাযথভাবে বুঝে, তার সীমাবদ্ধতাও স্বীকার করে এবং নতুন গবেষণার পথ উন্মুক্ত করেই সেই ঐতিহ্যের প্রকৃত উত্তরাধিকার বহন করা সম্ভব।
মুসলিম সভ্যতার এই ইতিহাস আমাদের শেখায়, জ্ঞানকে মর্যাদা দেওয়া, ভিন্ন সভ্যতার অর্জন থেকে শেখা এবং নতুন প্রশ্নের উত্তর অনুসন্ধান করাই বুদ্ধিবৃত্তিক অগ্রগতির অন্যতম শর্ত।
লেখক : আলেম ও সাংবাদিক



