মায়ের টানে ফিরে গিয়ে বন্দি হলেন যে সাহাবি

প্রতীকী ছবি
আজকের দিনে আমরা যেই ইসলামের গর্বিত দাবিদার তা এতো সহজে আমাদের কাছে আসেনি। এর পিছনে রয়েয়ে অনেক আত্মত্যাগ। মহানবী (সা.)-এর সাহাবীগণের মধ্যে এমন অনেকেই রয়েছেন, যাদের ত্যাগ, ধৈর্য ও ঈমানের দৃঢ়তা যুগে যুগে মুসলমানদের অনুপ্রেরণা জুগিয়েছে। তাদের কেউ সত্যের পথে জীবন উৎসর্গ করেছেন, কেউ সহ্য করেছেন নির্যাতন, আবার কেউ আপনজনের প্রতারণার শিকার হয়েও ঈমানের পথ থেকে বিচ্যুত হননি। আয়াশ ইবনে আবি রাবিআহ (রা.) ছিলেন তেমনই একজন সাহাবি। ইসলামের জন্য জন্মভূমি ছেড়ে মদিনায় হিজরত করেও তাকে ফিরে যেতে হয়েছিল মক্কার বন্দিত্বে। নিজেরই নিকটাত্মীয় আবু জাহেলের ষড়যন্ত্রে বন্দি হওয়ার এই ঘটনা ইসলামের প্রাথমিক যুগের এক বেদনাবিধুর অধ্যায়। তার জীবনকথায় ফুটে ওঠে ঈমানের টান, পারিবারিক মমতা এবং প্রতিকূলতার মুখে মানুষের সিদ্ধান্ত গ্রহণের জটিল বাস্তবতা।
আয়াশ ইবনে আবি রাবিআহ (রা.) ছিলেন কুরাইশ বংশের বনু মাখজুম গোত্রের একজন সাহাবি। তার পিতা আবু রাবিআহ আমর ইবনে মুগিরাহ এবং মাতা আসমা বিনতে মুখাররিবাহ। আবু জাহেল ছিল তার নিকটাত্মীয়। আত্মীয়তার এই সম্পর্ক পরবর্তী সময়ে আয়াশ (রা.)-এর জীবনে এক মর্মান্তিক ঘটনার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। ইসলামের প্রাথমিক যুগে যখন মক্কার প্রভাবশালী নেতারা মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর দাওয়াতের বিরোধিতায় নানা কৌশল অবলম্বন করছিলেন, তখন আয়াশ (রা.) সত্যের আহ্বানে সাড়া দিয়ে ইসলাম গ্রহণ করেন এবং ঈমানের পথে অবিচল থাকেন। [ইবনে আবদুল বার রচিত আল-ইস্তিআব ফি মারিফাতিল আসহাব এবং ইবনে হাজার আসকালানি রচিত আল-ইসাবা ফি তাময়িজিস সাহাবা গ্রন্থের ‘আয়াশ ইবনে আবি রাবিআহ’ শীর্ষক জীবনী-নিবন্ধ]
মক্কায় মুসলমানদের ওপর নির্যাতন যখন ক্রমেই তীব্র হয়ে উঠছিল, তখন আল্লাহর রাসুল (সা.)-এর নির্দেশনায় সাহাবিরা নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে মদিনায় হিজরত করতে থাকেন। আয়াশ (রা.) তাদেরই একজন। তিনি উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.)-এর সঙ্গে মদিনায় হিজরত করেন। জন্মভূমি, পরিবার ও পরিচিত পরিবেশ ছেড়ে অজানা ভবিষ্যতের পথে যাত্রা করা সহজ ছিল না। কিন্তু ঈমানের দাবি পূরণে তারা ব্যক্তিগত স্বাচ্ছন্দ্য ও পার্থিব সম্পর্কের ঊর্ধ্বে উঠেছিলেন। হিজরতের এই প্রেক্ষাপট এবং উমর (রা.)-এর সঙ্গে আয়াশ (রা.)-এর মদিনায় গমনের বিবরণ পাওয়া যায় ইবনে হিশামের আস-সিরাতুন নববিয়্যাহ গ্রন্থের হিজরত-সংক্রান্ত বর্ণনায়।
হিজরতের গুরুত্ব বোঝাতে পবিত্র কুরআনে মহান আল্লাহ তাআলা বলেছেন, ‘নিশ্চয় যারা নিজদের প্রতি জুলুমকারী, ফেরেশতারা তাদের জান কবজ করার সময় বলে, ‘তোমরা কী অবস্থায় ছিলে’? তারা বলে, ‘আমরা জমীনে দুর্বল ছিলাম’। ফেরেশতারা বলে, ‘আল্লাহর জমীন কি প্রশস্ত ছিল না যে, তোমরা তাতে হিজরত করতে’?’ (সুরা নিসা, আয়াত : ৯৭) আয়াতটি ঈমান রক্ষায় সাধ্যানুযায়ী নিরাপদ পরিবেশ অনুসন্ধানের গুরুত্ব তুলে ধরে। আয়াশ (রা.) সেই নির্দেশনা পালনেই হিজরত করছিলেন।
কিন্তু হিজরত করে মদিনায় পৌঁছানোর পরও আয়াশ (রা.)-এর বিপদ শেষ হয়নি। তাকে মক্কায় ফিরিয়ে আনার জন্য আবু জাহেল একটি কৌশল অবলম্বন করে। সে আয়াশের আরেক আত্মীয় হারিস ইবনে হিশামকে সঙ্গে নিয়ে মদিনায় যায়। সেখানে তারা আয়াশকে জানান, তার মা ছেলের বিচ্ছেদে গভীরভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। তিনি শপথ করেছেন, আয়াশ ফিরে না আসা পর্যন্ত চুল আঁচড়াবেন না এবং ছায়ায় আশ্রয় নেবেন না। মায়ের প্রতি ভালোবাসা ও কর্তব্যবোধ আয়াশ (রা.)-এর হৃদয়কে নাড়া দেয়। তিনি মায়ের কাছে ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।
উমর (রা.) তাকে সতর্ক করেছিলেন, আবু জাহেল ও হারিসের কথায় প্রতারণার আশঙ্কা রয়েছে। তিনি আয়াশকে মদিনা ছেড়ে না যাওয়ার পরামর্শ দেন। কিন্তু মায়ের প্রতি গভীর টানের কারণে আয়াশ (রা.) নিজের সিদ্ধান্তে অটল থাকেন। তখন উমর (রা.) তাকে একটি শক্তিশালী উট দিয়ে বলেন, বিপদের আশঙ্কা দেখা দিলে যেন সেটিতে চড়ে পালিয়ে আসতে পারেন। এই ঘটনা সাহাবিদের পারস্পরিক মমতা, দায়িত্ববোধ এবং বিপদের সময় একে অপরকে রক্ষার আন্তরিক প্রচেষ্টার অনন্য দৃষ্টান্ত। [হিজরত অধ্যায় ইবনে হিশামের আস-সিরাতুন নববিয়্যাহ এবং ইমাম তাবারির তারিখুর রাসুল ওয়াল মুলুক]
মক্কার পথে যাত্রাকালে আবু জাহেল কৌশলে আয়াশ (রা.)-কে নিজের উটের পেছনে বসতে অনুরোধ করেন। নিজের উট দুর্বল হয়ে পড়েছে, এমন অজুহাত দেখিয়ে তিনি আয়াশের সহযোগিতা চান। সরল বিশ্বাসে আয়াশ উট থেকে নামতেই আবু জাহেল ও হারিস তাকে বেঁধে ফেলেন। এরপর তাকে মক্কায় নিয়ে বন্দি করা হয়। যে আত্মীয়েরা মায়ের অসুস্থতার কথা বলে তার আবেগকে স্পর্শ করেছিলেন, তারাই তাকে প্রতারণার ফাঁদে ফেলেন।
আয়াশ (রা.)-এর বন্দিত্বকে বিচ্ছিন্ন কোনো ব্যক্তিগত দুর্ভাগ্য হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। মক্কায় ইসলাম গ্রহণকারী মুসলমানদের ওপর নির্যাতন, তাঁদের হিজরতে বাধা এবং পরিবার-পরিজনের মাধ্যমে তাঁদের ফিরিয়ে আনার চেষ্টা ছিল সে সময়ের বৃহত্তর বাস্তবতার অংশ।
আয়াশ ইবনে আবি রাবিআহ (রা.)-এর জীবন থেকে একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা পাওয়া যায়। ঈমানের পথে অবিচল থাকার অর্থ শুধু শত্রুর প্রকাশ্য বিরোধিতা মোকাবিলা করা নয়; কখনো আবেগ, আত্মীয়তার টান এবং বিশ্বাসের সুযোগ নেওয়া প্রতারণার মুখোমুখি হওয়াও এর অংশ। তার ঘটনা আমাদের সতর্ক করে দেয়, মানবিক মমতা মূল্যবান হলেও গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণের সময় প্রজ্ঞা ও বিচক্ষণতার প্রয়োজন রয়েছে। একই সঙ্গে উমর (রা.)-এর ভূমিকা মনে করিয়ে দেয়, প্রকৃত বন্ধুত্ব কেবল সঙ্গ দেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বিপদের আশঙ্কা বুঝতে পেরে প্রিয়জনকে সতর্ক করাও বন্ধুত্বের দায়িত্ব।



