মুসলিম সভ্যতায় গ্রন্থাগার ও পাণ্ডুলিপি সংরক্ষণের ঐতিহ্য

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
জ্ঞান সংরক্ষণ ও জ্ঞানচর্চার অন্যতম প্রধান অবলম্বন গ্রন্থাগার। বইয়ের পাতায় কেবল মানুষের চিন্তা ও আবিষ্কারের বিবরণই জমা থাকে না, সেখানে জমা থাকে একটি সভ্যতার স্মৃতি, বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশ ও ভবিষ্যৎ নির্মাণের উপাদানও। মুসলিম সভ্যতার ইতিহাসেও গ্রন্থাগার ও পাণ্ডুলিপি সংরক্ষণের রয়েছে সমৃদ্ধ ঐতিহ্য। পবিত্র কোরআনের জ্ঞানচর্চার আহ্বান, অনুবাদ আন্দোলন, গ্রন্থাগার প্রতিষ্ঠা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বই দান এবং ওয়াক্ফের মাধ্যমে জ্ঞানচর্চার স্থায়ী ব্যবস্থা গড়ে তোলার মধ্য দিয়ে মুসলিম সমাজ একসময় জ্ঞানচর্চার বিশ্বমঞ্চে গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হয়ে উঠেছিল।
ইসলামের প্রথম প্রত্যাদেশেই জ্ঞানচর্চার প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। পবিত্র কোরআনের প্রথম নাজিল হওয়া আয়াতগুলোর সূচনা ‘ইকরা’ বা ‘পড়ো’ শব্দ দিয়ে। মহান আল্লাহ তাআলা বলেছেন, ‘পড়ো তোমার প্রতিপালকের নামে, যিনি সৃষ্টি করেছেন’ (সুরা আলাক, আয়াত : ১) একই সুরার পরবর্তী আয়াতে কলমের মাধ্যমে শিক্ষা দেওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এই নির্দেশনা মুসলিম সমাজে জ্ঞানার্জন, লিখন ও জ্ঞান সংরক্ষণের ধর্মীয় প্রেরণা জোগায়। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর যুগে কোরআনের আয়াত লিখে সংরক্ষণের পাশাপাশি হাদিস ও ইসলামের শিক্ষা স্মরণ, লিপিবদ্ধকরণ এবং পরবর্তী প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়ার ধারাও ক্রমে বিকশিত হয়।
মুসলিম সভ্যতায় গ্রন্থাগার প্রতিষ্ঠা ও জ্ঞান সংরক্ষণের ইতিহাসে আব্বাসীয় যুগ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। অষ্টম থেকে ত্রয়োদশ শতাব্দীর মধ্যে বাগদাদ জ্ঞানচর্চা, অনুবাদ ও গবেষণার গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে পরিণত হয়। আব্বাসীয় খলিফাদের পৃষ্ঠপোষকতায় গ্রিক, সিরীয়, ফারসি ও ভারতীয় ভাষার বহু গ্রন্থ আরবিতে অনূদিত হয়। দর্শন, চিকিৎসাবিজ্ঞান, গণিত, জ্যোতির্বিজ্ঞান ও যুক্তিবিদ্যার বিভিন্ন গ্রন্থের অনুবাদ ও পর্যালোচনার মাধ্যমে মুসলিম পন্ডিতগণ পূর্ববর্তী সভ্যতার জ্ঞান আত্মস্থ করেন। সময়ের পরিক্রমায় তাতে নতুন অবদান যুক্ত করেন।
এই বুদ্ধিবৃত্তিক আন্দোলনের সঙ্গে বাগদাদের বায়তুল হিকমার নাম বিশেষভাবে জড়িয়ে আছে। এটি জ্ঞানসংগ্রহ, পাণ্ডুলিপি এবং অনুবাদচর্চার গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। তবে একে আধুনিক অর্থে পূর্ণাঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয় বা গবেষণাগারের মতো ছিল না। এর প্রকৃত সাংগঠনিক কাঠামো ও কার্যক্রম নিয়ে ইতিহাসবিদদের মধ্যে নানান আলোচনা রয়েছে। তা সত্ত্বেও আব্বাসীয় আমলে জ্ঞানচর্চায় রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা এবং বিভিন্ন সভ্যতার বৌদ্ধিক সম্পদ গ্রহণের যে প্রবণতা তৈরি হয়েছিল, বায়তুল হিকমা তার অন্যতম প্রতীক।
মুসলিম বিশ্বের গ্রন্থাগার-ঐতিহ্য শুধু বাগদাদে সীমাবদ্ধ ছিল না। মিসরের ফাতেমীয় শাসনামলে কায়রোর প্রাসাদ গ্রন্থাগারে বিপুলসংখ্যক বই ছিল। কর্ডোভা ও আন্দালুসের অন্যান্য নগরেও গ্রন্থাগার, শিক্ষাকেন্দ্র এবং পাণ্ডুলিপি সংগ্রহের ঐতিহ্য গড়ে ওঠেছিল। দশম শতাব্দীতে কর্ডোভা ইউরোপের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্ঞানকেন্দ্র হিসেবে পরিচিতি লাভ করে। সেখানে চিকিৎসাবিজ্ঞান, দর্শন, জ্যোতির্বিজ্ঞান, সাহিত্য ও ধর্মতত্ত্বের চর্চা হতো। মুসলিম আমলে স্পেনের গ্রন্থসংগ্রহ ও অনুবাদ-ঐতিহ্য পরবর্তী সময়ে ইউরোপে প্রাচীন জ্ঞান পুনরাবিষ্কারে বৃহত্তর প্রক্রিয়ায় ভূমিকা রাখে।
গ্রন্থাগারকে স্থায়ী প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি দেওয়ার ক্ষেত্রে মুসলিম সমাজে ওয়াক্ফের ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ওয়াক্ফ হলো জনকল্যাণমূলক বা ধর্মীয় উদ্দেশ্যে কোনো সম্পদ স্থায়ীভাবে উৎসর্গ করার ব্যবস্থা। সম্পত্তি, দোকান, কৃষিজমি কিংবা অন্য কোনো আয়-উৎপাদনকারী সম্পদ ওয়াক্ফ করে তার আয় দিয়ে মসজিদ, মাদ্রাসা, গ্রন্থাগার ও শিক্ষার্থীদের ব্যয় নির্বাহের ব্যবস্থা করা হতো। ফলে জ্ঞানচর্চা কেবল শাসক বা ধনীদের ব্যক্তিগত অনুগ্রহের ওপর নির্ভরশীল থাকত না। ওয়াক্ফ ব্যবস্থার ফলে অনেক ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানগুলোতে দীর্ঘস্থায়ী অর্থনৈতিক ভিত্তি তৈরি হওয়ারও অসংখ্য উপমা রয়েছে।
মধ্যযুগের বিভিন্ন মুসলিম শিক্ষাকেন্দ্রে পাঠাগার, শিক্ষক, শিক্ষার্থী এবং পাণ্ডুলিপি রক্ষণাবেক্ষণের জন্য ওয়াক্ফ সম্পদ ব্যবহারের বহু নজির পাওয়া যায়। উত্তর আফ্রিকার ফেজে অবস্থিত আল-কারাউইয়িন এবং মিসরের কায়রোর আল-আজহারকে ঘিরে গড়ে ওঠা শিক্ষা-ঐতিহ্যেও বই ও জ্ঞানচর্চার গুরুত্ব ছিল। এ ধরনের প্রতিষ্ঠানগুলোতে পাণ্ডুলিপি সংগ্রহ, পাঠদান, অনুলিপি তৈরি এবং জ্ঞান সংরক্ষণের ধারাবাহিকতা মুসলিম সমাজের বৌদ্ধিক জীবনে অনেক গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে।
পাণ্ডুলিপি সংরক্ষণ ছিল এই ঐতিহ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক। ছাপাখানার ব্যাপক প্রসারের আগে হাতে লেখা বই তৈরি করা হতো। দক্ষ লিপিকাররা পাণ্ডুলিপি অনুলিখন করতেন; পাঠক, শিক্ষক ও সংগ্রাহকেরা সেগুলো সংগ্রহ ও বিনিময় করতেন। কোরআনের পাণ্ডুলিপি, হাদিসের সংকলন, চিকিৎসাবিষয়ক গ্রন্থ, জ্যোতির্বিজ্ঞানের পর্যবেক্ষণ, ভ্রমণবৃত্তান্ত এবং ঐতিহাসিক বিবরণ এভাবেই এক প্রজন্ম থেকে অন্য প্রজন্মে পৌঁছেছে। আরবি ভাষার পাশাপাশি ফারসি, তুর্কি, উর্দু ও অন্যান্য ভাষায় রচিত বিপুলসংখ্যক পাণ্ডুলিপিও মুসলিম বিশ্বের জ্ঞানভান্ডারকে করেছে সমৃদ্ধ।
কষ্টকর ব্যাপার হচ্ছে, ইতিহাসের এই গৌরবময় অধ্যায়ের পাশাপাশি রয়েছে ক্ষতির বেদনাও। যুদ্ধ, রাজনৈতিক অস্থিরতা, অগ্নিকাণ্ড, লুটপাট ও অবহেলায় বহু গ্রন্থাগার ধ্বংস হয়েছে। হারিয়ে গেছে অসংখ্য মূল্যবান পাণ্ডুলিপি। ১২৫৮ সালে মঙ্গোলদের বাগদাদ দখল ও ধ্বংসযজ্ঞ মুসলিম বিশ্বের ইতিহাসে গভীর আঘাত হিসেবে স্মরণীয়। যদিও এ সময় ঠিক কত বই ধ্বংস হয়েছিল, সে বিষয়ে নির্ভরযোগ্য পরিসংখ্যান পাওয়া যায় না। তবে নগরটির সাংস্কৃতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষতির পরিমার ছিল ব্যাপক, এতো কোনো সন্দেহ নেই।
বর্তমান জমানায় জ্ঞান সংরক্ষণের পদ্ধতি বদলে গেছে। মুদ্রিত বইয়ের পাশাপাশি ডিজিটাল আর্কাইভ, উচ্চমানের স্ক্যান, অনলাইন ক্যাটালগ এবং আধুনিক সংরক্ষণপ্রযুক্তি পাণ্ডুলিপি রক্ষার নতুন সুযোগ তৈরি করেছে। মুসলিম বিশ্বের বহু প্রতিষ্ঠান এখন প্রাচীন পাণ্ডুলিপি ডিজিটাল পদ্ধতিতে সংরক্ষণ ও গবেষকদের জন্য উন্মুক্ত করার উদ্যোগ নিচ্ছে। সময়ের প্রয়োজনে আমাদের বাংলাদেশের ঐতিহাসিক মসজিদ, মাদ্রাসা, খানকাহ ও ব্যক্তিগত সংগ্রহেও ছড়িয়ে থাকা পুরোনো দলিল ও পাণ্ডুলিপি শনাক্ত, তালিকাভুক্ত এবং সংরক্ষণ করা খুবই জরুরি।
মুসলিম সভ্যতার গ্রন্থাগার-ঐতিহ্য আমাদের মনে করিয়ে দেয়, সভ্যতার শক্তি শুধু প্রাসাদ, দুর্গ কিংবা সামরিক বিজয়ে নিহিত ছিল না। তার গভীর ভিত্তি গড়ে ওঠেছিল জ্ঞান, চিন্তা ও স্মৃতি সংরক্ষণের মধ্য দিয়ে। তাই অতীতের এই ঐতিহ্যকে শুধু স্মৃতিচারণের মধ্যে আটকে না রেখে এখনি আমাদের জ্ঞানভান্ডারকে আধুনিক সংরক্ষণপ্রযুক্তিতে আলোকে সংরক্ষণ শুরু করা প্রয়োজন।
লেখক: আলেম ও সাংবাদিক



