ডিজিটাল ব্যস্ততায় হারিয়ে যাচ্ছে জুমার আধ্যাত্মিকতা

প্রতীকী ছবি
একসময় জুমা ছিল মুসলিম সমাজের হৃদস্পন্দনের দিন। পুরো সপ্তাহের ব্যস্ততা, ক্লান্তি আর দুশ্চিন্তার পর এই দিনটি এসে মানুষের অন্তরে তৈরি করত এক অন্যরকম প্রশান্তি। ঘরে ঘরে সকাল থেকেই থাকত পবিত্র এক আবহ। কেউ আগেভাগে গোসল করত, কেউ সাদা কাপড় বের করত, কেউ আতর ব্যবহার করত, কেউবা শিশুদের প্রস্তুত করত মসজিদে নেওয়ার জন্য। গ্রামের পথে পথে, শহরের অলিগলিতে, মসজিদমুখী মানুষের পদচারণায় তৈরি হতো এক অপার্থিব সৌন্দর্য। মনে হতো, আজকের দিনটি শুধু পৃথিবীর নয়; আসমানের সঙ্গেও এর এক বিশেষ সম্পর্ক আছে।
কিন্তু ডিজিটাল যুগের দ্রুতগতির জীবনধারা আমাদের সেই অনুভূতি থেকে অনেক দূরে সরিয়ে দিয়েছে। এখন অনেকের কাছে জুমা মানে কেবল ব্যস্ততার ফাঁকে দ্রুত নামাজ আদায় করে কাজে ফিরে যাওয়া। মসজিদে বসেও কারও চোখ থাকে মোবাইল স্ক্রিনে, কারও মন পড়ে থাকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের নোটিফিকেশনে। খুতবা চলাকালেও ফোনের আলো নিভে না। অথচ রাসুলুল্লাহ (সা.) খুতবার সময়টিতে অন্যকে “চুপ থাকো” বলাকেও অনর্থক কাজ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। সহিহ বুখারির বর্ণনায় এসেছে, তিনি বলেন, ‘যখন ইমাম খুতবা দিচ্ছেন, তখন তুমি যদি তোমার সঙ্গীকে বলো ‘চুপ থাকো’, তবে তুমিও অনর্থক কাজ করলে।’(বুখারি, হাদিস: ৯৩৪)
এ যেন এমন এক সময়, যেখানে মানুষ পৃথিবীর সঙ্গে সংযুক্ত হতে গিয়ে আকাশের সঙ্গে সম্পর্ক হারাতে বসেছে।
পবিত্র কুরআনে মহান আল্লাহ তাআলা বলেছেন,
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِذَا نُودِيَ لِلصَّلَاةِ مِن يَوْمِ الْجُمُعَةِ فَاسْعَوْا إِلَىٰ ذِكْرِ اللَّهِ وَذَرُوا الْبَيْعَ
‘হে মুমিনগণ! জুমার দিনে যখন নামাজের আহ্বান দেওয়া হয়, তখন তোমরা আল্লাহর স্মরণের দিকে ধাবিত হও এবং বেচাকেনা বন্ধ করো।’ (সুরা জুমুআ, আয়াত: ৯)
এই আয়াত শুধু ব্যবসা বন্ধ করার নির্দেশ দেয়নি; বরং মানুষের মনোযোগকে দুনিয়া থেকে সরিয়ে আখিরাতের দিকে ফিরিয়ে নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে। কিন্তু আজকের বাস্তবতায় বেচাকেনার জায়গা দখল করেছে ডিজিটাল ব্যস্ততা। হাতের মোবাইল যেন মানুষের অন্তরকে সবসময় বিচ্ছিন্ন করে রাখছে ধ্যান, মনোযোগ ও আধ্যাত্মিক অনুভূতি থেকে।
অথচ জুমা মুমিনের আত্মশুদ্ধির দিন। হাদিসে এসেছে, যে ব্যক্তি সুন্দরভাবে অজু করবে, জুমার জন্য গোসল করবে, মনোযোগ দিয়ে খুতবা শুনবে এবং অনর্থক কাজ থেকে বিরত থাকবে, তার এক জুমা থেকে আরেক জুমা পর্যন্ত গুনাহ ক্ষমা করে দেওয়া হবে। (মুসলিম, হাদিস: ৮৫৭)
ভাবা যায়, সপ্তাহের মাত্র একটি দিনকে আল্লাহ এমনভাবে সাজিয়েছেন, যাতে মানুষ আবার নতুনভাবে ফিরে আসতে পারে নিজ রবের দিকে। কিন্তু আমরা সেই দিনটিকেও পরিণত করেছি যান্ত্রিক রুটিনে।
একসময় জুমা মানেই ছিল আত্মীয়তার দিনও। নামাজ শেষে মানুষ কুশল বিনিময় করত, আত্মীয়ের খোঁজ নিত, অসুস্থ প্রতিবেশীর বাড়িতে যেত। সমাজে তৈরি হতো ভ্রাতৃত্বের বন্ধন। এখন নামাজ শেষ হওয়ার আগেই অনেকের হাতে ফোন চলে আসে। কেউ দ্রুত ছবি তুলছে, কেউ স্ট্যাটাস দিচ্ছে, কেউ আবার ভার্চুয়াল জগতে ডুবে যাচ্ছে। বাস্তবের মানুষগুলো ক্রমেই দূরে সরে যাচ্ছে।
সবচেয়ে বেদনাদায়ক বিষয় হলো, নতুন প্রজন্মের অনেক শিশু জুমার আধ্যাত্মিক সৌন্দর্য অনুভব করেই বড় হচ্ছে না। তারা জুমাকে দেখছে কেবল একটি সাপ্তাহিক ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা হিসেবে। অথচ ইসলামের দাবি হচ্ছে, এই দিনটি হবে ঈমান নবায়নের দিন, আত্মার প্রশান্তির দিন এবং উম্মাহর ঐক্যের দিন।
রাসুলুল্লাহ (সা.) জুমার দিনে বেশি
বেশি দরুদ পাঠ করতে উৎসাহ দিয়েছেন। তিনি বলেন
‘তোমাদের দিনগুলোর মধ্যে সর্বোত্তম দিন হলো জুমার
দিন। তাই এ দিনে তোমরা আমার প্রতি বেশি বেশি দরুদ পাঠ করো।’ (আবু দাউদ, হাদিস: ১০৪৭)
কিন্তু আজ মানুষের জিহ্বা দরুদের চেয়ে বেশি ব্যস্ত ট্রেন্ডিং আলোচনায়, আঙুল বেশি ব্যস্ত স্ক্রলিংয়ে।
ডিজিটাল প্রযুক্তি নিজে কোনো সমস্যা নয়। সমস্যা তখনই, যখন প্রযুক্তি মানুষের হৃদয়কে গ্রাস করে নেয় এবং ইবাদতের স্বাদ নষ্ট করে ফেলে। ইসলাম প্রযুক্তিবিরোধী নয়; বরং ইসলাম চায়; দাসে পরিণত না হয়ে মানুষ প্রযুক্তির নিয়ন্ত্রক হোক।
তাইআসুন অন্তত সপ্তাহে একটি দিন আমরা নিজের আত্মার সঙ্গে কথা লি, কোরআনের কাছে ফিরে আসি, খুতবা মনোযোগ দিয়ে শ্রবন করি, পরিবারকে সময় দেই এবং আল্লাহর স্মরণে অন্তর ভিজিয়ে নিতে চেষ্ঠা করি।
মহান আল্লাহ আমাদের সকলকে তাওফিক দান করুন।
লেখক: আলেম ও সাংবাদিক



